ঢাকা বুধবার, ০২ সেপ্টেম্বর ২০২৬

বদলে যাওয়া সময়ে পড়ার বিষয় নির্বাচন

বদলে যাওয়া সময়ে পড়ার বিষয় নির্বাচন
×

 তমাল আদনান

প্রকাশ: ২৪ আগস্ট ২০২৬ | ১১:৪৮

কী পড়ব– এই প্রশ্নটি প্রতিটি শিক্ষার্থীর জীবনেই এক সময় দুর্বিষহ হয়ে ওঠে। নবম-দশম শ্রেণির পর বিজ্ঞান, কমার্স নাকি আর্টস– এই দ্বন্দ্ব যেমন রয়েছে, তেমনি বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার সময়ও বিভ্রান্তি তৈরি হয়। এমনকি চাকরিজীবীদের কাছেও মনে হয়, ‘যদি আমি আরেকটি নতুন বিষয়ে পড়াশোনা করতাম, তাহলে হয়তো আমার ক্যারিয়ার আরও দ্রুত এগোত।’ অনেক শিক্ষার্থী প্যাশনকে গুরুত্ব দেয়, আবার কেউ কেউ শুধু চাকরির বাজার দেখে কমার্স বা ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে ভর্তি হয়। বাস্তবতা হলো, সবচেয়ে সুখী মানুষ তারা, যারা প্যাশন এবং বাজারের চাহিদার মধ্যে একটি ‘ক্রস-পয়েন্ট’ খুঁজে বের করতে পারে। ২০২৬ সালে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এবং ডেটা সায়েন্স যেমন দাপট দেখাচ্ছে, তেমনি মনোবিজ্ঞান এবং ক্রিয়েটিভ শিল্পও তাল মিলিয়ে চলছে। কোনো বিষয় বেছে নেওয়ার আগে দেখুন, সেই সেক্টরে আগামী ৫ বছরে কী ধরনের চাকরি তৈরি হচ্ছে। এটি আবহাওয়ার পূর্বাভাসের মতো– আপনি যদি পুরোনো আবহাওয়ার দিকে তাকিয়ে থাকেন, তবে নতুন বৃষ্টিতে ভিজবেন।

বর্তমান সময়ে পড়াশোনা মানে শুধু বইয়ের নির্দিষ্ট অধ্যায় পড়ে পরীক্ষা দেওয়া নয়। তথ্যপ্রযুক্তির দ্রুত পরিবর্তন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার  বিস্তার, নতুন নতুন কর্মক্ষেত্র এবং প্রতিযোগিতামূলক চাকরির বাজার শিক্ষার্থীদের সামনে নতুন বাস্তবতা তৈরি করেছে। এখন কোন বিষয় পড়ব, কোন দক্ষতা অর্জন করব এবং ভবিষ্যতের জন্য কীভাবে নিজেকে প্রস্তুত করব–এসব সিদ্ধান্ত অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ। তাই পড়ার বিষয় বেছে নেওয়ার ক্ষেত্রে শুধু অন্যের পছন্দ অনুসরণ না করে নিজের আগ্রহ, সক্ষমতা ও ভবিষ্যৎ লক্ষ্যকে গুরুত্ব দেওয়া জরুরি। প্রথমেই নিজের আগ্রহ বোঝার চেষ্টা করতে হবে। কোন বিষয় পড়তে গেলে সময়ের কথা মনে থাকে না, কোন বিষয়ের নতুন তথ্য জানতে ভালো লাগে এবং কোন কাজ করতে স্বতঃস্ফূর্তভাবে আগ্রহ তৈরি হয়– এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হবে। কারণ দীর্ঘমেয়াদে এমন একটি বিষয় নিয়ে পড়াশোনা করা কঠিন, যার প্রতি নিজের কোনো আগ্রহ নেই। অন্যদিকে পছন্দের বিষয় হলে কঠিন অধ্যায়ও ধৈর্য নিয়ে শেখার মানসিকতা তৈরি হয়।

তবে শুধু আগ্রহ থাকলেই হবে না, নিজের সক্ষমতাও বিবেচনা করতে হবে। কোনো বিষয় ভালো লাগতে পারে, কিন্তু সেটিতে ভালো ফল করার জন্য প্রয়োজনীয় দক্ষতা নিজের আছে কিনা, সেটিও দেখতে হবে। যেমন গণিত ও বিজ্ঞানে আগ্রহ থাকলে সংশ্লিষ্ট বিষয়ের মৌলিক ধারণা, সমস্যা সমাধানের দক্ষতা এবং বিশ্লেষণী ক্ষমতা যাচাই করা দরকার। একইভাবে সাহিত্য, ভাষা বা সামাজিক বিজ্ঞানে আগ্রহ থাকলে পড়া, লেখা, যুক্তি উপস্থাপন ও বিশ্লেষণের দক্ষতা বিবেচনা করা উচিত। বর্তমান সময়ের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো ভবিষ্যতের কর্মসংস্থানের সুযোগ। প্রযুক্তির পরিবর্তনের কারণে অনেক প্রচলিত কাজের ধরন বদলে যাচ্ছে, আবার নতুন অনেক পেশারও সৃষ্টি হচ্ছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, ডেটা বিশ্লেষণ, সাইবার নিরাপত্তা, সফটওয়্যার, স্বাস্থ্যসেবা, পরিবেশবিজ্ঞান, নবায়নযোগ্য জ্বালানি ও আধুনিক ব্যবসা ব্যবস্থাপনার মতো ক্ষেত্রগুলো বিশ্বজুড়ে গুরুত্ব পাচ্ছে। তাই বিষয় বাছাইয়ের সময় আগামী পাঁচ বা দশ বছরে সেই বিষয়ের সম্ভাব্য চাহিদা সম্পর্কে ধারণা নেওয়া ভালো।

তবে শুধু চাকরির বাজার দেখে বিষয় নির্বাচন করাও ঠিক নয়। কারণ আজ যে পেশার চাহিদা বেশি, ভবিষ্যতে তার ধরন পরিবর্তিত হতে পারে। তাই এমন বিষয় বেছে নেওয়া বেশি বুদ্ধিমানের কাজ, যার মাধ্যমে মৌলিক জ্ঞান, বিশ্লেষণী ক্ষমতা, যোগাযোগ দক্ষতা ও নতুন কিছু শেখার সক্ষমতা তৈরি হয়। অর্থাৎ বিষয়ের পাশাপাশি বিভিন্ন ক্ষেত্রে কাজে লাগে এমন দক্ষতাও অর্জন করতে হবে। অভিভাবক ও শিক্ষকদের পরামর্শ অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে শিক্ষার্থীর নিজের মতামতকে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিতে হবে। শুধু বন্ধুরা যে বিষয় নিচ্ছে, পরিচিত কেউ যে পেশায় সফল হয়েছে অথবা সমাজে কোনো বিষয়কে বেশি মর্যাদা দেওয়া হয়– এসব কারণে নিজের পছন্দের বাইরে গিয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত নয়। কারণ শেষ পর্যন্ত পড়াশোনা ও পেশাজীবনের দীর্ঘ পথটি শিক্ষার্থীকেই পাড়ি দিতে হবে।

বিষয় বাছাইয়ের আগে বাস্তব অভিজ্ঞতা নেওয়াও কার্যকর। সংশ্লিষ্ট বিষয়ে পড়াশোনা করা শিক্ষার্থী বা পেশাজীবীদের সঙ্গে কথা বলা, বিশ্ববিদ্যালয়ের কোর্স সম্পর্কে জানা, অনলাইন কোর্স বা প্রাথমিক শিক্ষামূলক উপকরণ ব্যবহার করে বিষয়টি সম্পর্কে ধারণা নেওয়া যেতে পারে। এতে নিজের আগ্রহ ও সক্ষমতা সম্পর্কে বাস্তব ধারণা তৈরি হবে।  সবশেষে মনে রাখতে হবে, একটি বিষয় নির্বাচন করাই জীবনের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নয়। বর্তমান বিশ্বে মানুষ একাধিকবার নিজের দক্ষতা ও পেশার ক্ষেত্র পরিবর্তন করছে। তাই পড়ার বিষয় বেছে নেওয়ার সময় নিজের আগ্রহ, যোগ্যতা, ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা এবং শেখার সক্ষমতাকে একসঙ্গে বিবেচনা করতে হবে। সঠিক বিষয় নির্বাচন মানে শুধু ভালো ফল করার পথ তৈরি করা নয়; বরং ভবিষ্যতের পরিবর্তনশীল পৃথিবীতে নিজেকে মানিয়ে নেওয়ার জন্য একটি শক্ত ভিত্তি তৈরি করা। 

আরও পড়ুন

×