ইডেন মহিলা কলেজ
আনন্দের শিক্ষা সফর
আনন্দের শিক্ষা সফর থেকে শিক্ষার্থীরা জানতে পেরেছে অনেক কিছু
জান্নাতুল মাওয়া রিফাত
প্রকাশ: ৩১ আগস্ট ২০২৬ | ১১:৪৫
ইডেন মহিলা কলেজ– ইতিহাসের এক গৌরবময় প্রাচীন বিদ্যাপীঠ। শতশত স্বপ্নবাজ নারী এখানে আসেন নিজেদের স্বপ্ন বুনতে, ভাগ্য বদলাতে এবং সমাজের প্রচলিত ধারণাকে চ্যালেঞ্জ জানাতে। সেই স্বপ্নের আঙিনার ইংরেজি বিভাগ এবার চার দেয়ালের গণ্ডি পেরিয়ে পা রাখল ইতিহাসের আবহে। বইয়ের পাতার ইতিহাস আর তার সামনে দাঁড়িয়ে হাজার বছর আগের সেই আবহকে উপলব্ধি করার উদ্দেশে ইডেনকন্যাদের নিয়ে এবার এক আনন্দযাত্রার শুরু হলো কুমিল্লার প্রান্তরে।
ভোরের শীতল বাতাস আর কোমল আলোয় রজনীগন্ধা, রক্তকরবী ও দোলনচাঁপা বাসের চাকা যখন ইডেন প্রাঙ্গণ ছাড়ল, তখন সবার চোখে-মুখে ছিল বাঁধভাঙা উল্লাস। বাসের ভেতর বন্ধুদের আড্ডা, গান আর সকালের নাশতায় জমে ওঠে পুরো পরিবেশ। আর কিছুক্ষণের মধ্যেই বাস এসে পৌঁছায় প্রথম গন্তব্য– ময়নামতি ওয়ার সিমেট্রিতে।
প্রবেশদ্বার পেরোতেই চোখে পড়ে সারিবদ্ধ সমাধিফলক। এটি মূলত দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে নিহত সৈনিকদের চিরনিদ্রার স্থান। প্রতিটি পাথরে খোদাই করা নাম, পদবি, সেনাবাহিনীর প্রতীক আর মৃত্যুর তারিখ যেন এক দীর্ঘশ্বাস হয়ে বেজে ওঠে। ২২-২৩ বছরের তরুণদের থেমে যাওয়া জীবনের এই করুণ ইতিহাস বইয়ের পাতা থেকে নেমে এসে শিক্ষার্থীদের নিমেষেই এক অন্য ভুবনে নিয়ে যায়।
যাত্রাপথের দ্বিতীয় গন্তব্য ছিল কুমিল্লার কোটবাড়ির পল্লি উন্নয়নের আন্তর্জাতিক প্রশিক্ষণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠান ‘বার্ড’। শান্ত ও সবুজে ঘেরা এই প্রাঙ্গণ যেন এক চিলতে প্রশান্তির নীড়। দুপাশের সবুজ সমারোহ ভেদ করে চলা পথ এবং দূরে নীলাচল পাহাড়ের সৌন্দর্য ইডেনকন্যাদের সব ক্লান্তি নিমেষে দূর করে দেয়। পাহাড়ের এই অপরূপ সৌন্দর্য ক্যামেরাবন্দি করতে ভোলেননি কেউই। এরপর লালমাটির পাহাড় ও ঘন অরণ্যে ঘেরা কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য উপভোগ করে দলটি এগিয়ে চলে তাদের পরবর্তী গন্তব্যের দিকে। পাহাড়ের চূড়ায় অবস্থিত ‘স্বপ্নচূড়া রিসোর্ট’-এর প্রবেশদ্বারটি যেন কৃত্রিম পাথর ও গাছের গুঁড়িতে তৈরি কোনো জাদুকরী বনের গুহা। রিসোর্টে দুপুরের খাবার শেষে শুরু হয় কাঙ্ক্ষিত সাংস্কৃতিক পর্ব। মিরাজুল ইসলাম ও চরু হকের সাবলীল সঞ্চালনায় অনুষ্ঠানটি প্রাণবন্ত হয়ে ওঠে।
অনুষ্ঠানের শুরুতে ইংরেজি বিভাগের বিভাগীয় প্রধান ড. অমল কুমার চক্রবর্তীসহ অন্যান্য শিক্ষক ও অতিথিরা সংক্ষিপ্ত বক্তব্য দেন। এরপর অতিথি লিসান আনিসের কণ্ঠে ‘তুমি বরুণা হলে হবো সুনীল’ গানটি পুরো পরিবেশকে মাতিয়ে তোলে। তৃতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী অরিনের চমৎকার আবৃত্তি এবং সহযোগী অধ্যাপক সোনিয়া চৌধুরী ও প্রধান অতিথি অপর্ণা চক্রবর্তীর সুমধুর গান উপস্থিত সবার হৃদয় ছুঁয়ে যায়। এরপর র্যাফেল ড্রর টানটান উত্তেজনা এবং শিক্ষকদের নিয়ে আয়োজিত আনন্দদায়ক হাঁড়িভাঙা প্রতিযোগিতার মধ্য দিয়ে সাংস্কৃতিক পর্বের সমাপ্তি ঘটে।
সফরের শেষ আকর্ষণ ছিল ঐতিহাসিক শালবন বিহার। এর প্রবেশপথে সারি সারি পসরা সাজিয়ে বসা দোকানগুলো থেকে শিক্ষার্থীরা মাটির শোপিস, বাঁশ-বেতের ঝুড়ি, হাতিম ও বার্মিজ আচার কিনতে ব্যস্ত হয়ে পড়েন। এরপর প্রাচীন প্রত্নস্থল শালবন বিহারে প্রবেশ করে শিক্ষার্থীরা দেড় হাজার বছরের বৌদ্ধ সভ্যতার পোড়ামাটির দেয়াল আর প্রাচীন সংস্কৃতির রূপ দেখে মুগ্ধ হন।
সন্ধ্যা নামতেই একরাশ সোনালি স্মৃতি আর আনন্দঘন মুহূর্তের পসরা সাজিয়ে শুরু হয় ঢাকার ফিরতি পথ। ইডেনকন্যাদের এই শিক্ষা সফরের হাসি-আনন্দ আর অজস্র স্মৃতির গল্প তাদের জীবনের পাতায় এক জীবন্ত পাঠ হয়ে চিরকাল ফ্রেমে বন্দি থাকবে।
- বিষয় :
- ইডেন মহিলা কলেজ