সাত মিনিট তর্কেও জড়ান ঢাবি ছাত্রী
সাহাদাত হোসেন পরশ
প্রকাশ: ০৩ সেপ্টেম্বর ২০২২ | ১২:০০ | আপডেট: ০৩ সেপ্টেম্বর ২০২২ | ১৪:৩২
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) তৃতীয় বর্ষের এক ছাত্রীকে রাজধানীর কল্যাণপুর থেকে পুলিশ পরিচয়ে তুলে নেওয়ার ঘটনায় আরও কিছু তথ্য বেরিয়ে এসেছে। সিসিটিভির ফুটেজ বিশ্নেষণ করে দেখা গেছে, অপহরণকারী লাল হেলমেট ও খয়েরি রঙের জামা পরা ছিলেন। ঘটনার দিন বিশ্ববিদ্যালয়ের বাস থেকে কল্যাণপুরে নামার পরই একটি মোবাইল ফোন রিচার্জের দোকানে ঢোকেন ওই ছাত্রী। রিচার্জ করার পর তিনি বের হয়ে যান। ওই দোকান থেকেই তাঁকে অনুসরণ করছিলেন অপহরণকারী। রিকশা নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রী বাসার উদ্দেশে যাওয়ার সময় তাঁর গতিরোধ করেন পুলিশ পরিচয়ধারী। এ সময় তরুণীর হাতে ছিল একাধিক ব্যাগ ও একটি পুতুল। নিজের জন্মদিন উপলক্ষে এসব উপহার বন্ধুরা তাঁকে দিয়েছিলেন।
ফুটেজ বিশ্নেষণ ও তদন্তে উঠে আসে- হাতে থাকা ব্যাগ দেখিয়ে তার ভেতরে অবৈধ জিনিসপত্র আছে বলে ফাঁদ পাতেন পুলিশ পরিচয় দেওয়া ওই দুর্বৃত্ত। তখন তাঁর সঙ্গে ওই ছাত্রী সাত মিনিট তর্কে জড়ান। এক পর্যায়ে ওই ছাত্রীকে ভয়ভীতি দেখিয়ে বলা হয়, 'থানায় গিয়ে মুচলেকা দিতে হবে। সেখানে আপনার ব্যাগ খোলা হবে। বন্ধুরা আপনাকে অবৈধ জিনিসপত্র দিয়েছেন।' তখন মেয়েটি বলছিলেন- এসব জন্মদিনের উপহার। তখন অপহরণকারী বলছিলেন, 'আপনার হাতে থাকা ক্যাডিবিয়ারের ভেতরে অবৈধ জিনিস আছে। থানায় নেওয়ার পর ক্যাডিবিয়ার কেটে আপনার সামনেই ওই অবৈধ জিনিস বের করা হবে।' তখন রিকশাচালক বলছিলেন, 'পুলিশের সঙ্গে ঝামেলা মেটান আপা। আমাকে ছেড়ে দেন।' এরপরই ঢাবি ছাত্রী পুলিশের স্টিকার লাগানো মোটরসাইকেলে উঠে বসেন।
তদন্ত-সংশ্নিষ্ট এক কর্মকর্তা জানান, ক্যাডিবিয়ারের ভেতরে অবৈধ জিনিসপত্র রয়েছে এটা বলার পর একটু ভড়কে যান ওই ছাত্রী। আর পোশাক-পরিচ্ছদ পুলিশের মতো, কোমরে পিস্তল ও পুলিশ লেখা গাড়ি দেখে তিনি বিশ্বাসও করেছিলেন ওই ব্যক্তি সত্যি সত্যি পুলিশ। ঘটনার সময় অপহরণকারীর পরনে ছিল শার্ট-প্যান্ট। তদন্তে পাওয়া তথ্যে দেখা যায়, অপহরণকারী পেশাদার অপরাধী। পুলিশ পরিচয় দিয়ে ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে একই ধরনের ঘটনা আরও ঘটিয়েছেন তিনি। কল্যাণপুরের আগে বরিশালেও একই কায়দায় একটি ঘটনা ঘটান। তিনি যেসব মোটরসাইকেল ব্যবহার করেন সেগুলোর নম্বর প্লেটও ভুয়া। ওই অপহরণকারীর বিরুদ্ধে একাধিক মামলা ও বিভিন্ন সময় কারাভোগের তথ্য পাওয়া যাচ্ছে। তাঁর কোনো সহযোগী রয়েছে কিনা তা জানারও চেষ্টা করছেন গোয়েন্দারা।
পুলিশের এক উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা বলেন, নিজের মোটরসাইকেল ছাড়াও কখনও আবার ভাড়া মোটরসাইকেল নিয়ে নারীদের অপহরণ করে আসছেন তিনি। প্রায় প্রতিটি ঘটনায় তিনি অপহরণের পাশাপাশি নারীকে হেনস্তা করেন। অপহরণকারী এক ধরনের বিকৃত মানসিকতার দুর্ধর্ষ অপরাধী।
২৫ আগস্ট দুপুর দেড়টার দিকে পুলিশ পরিচয় দিয়ে কল্যাণপুর থেকে অপহরণ করে ৭-৮ কিলোমিটার দূরে তুরাগের দিয়াবাড়ীর নির্জন এলাকায় নেওয়া হয়। এরপর স্বর্ণালংকার, ব্যাগ ছিনিয়ে নেওয়ার পাশাপাশি শারীরিকভাবে হেনস্তার শিকার হন তিনি। এরপর স্থানীয় আল-মামুন নামে এক ব্যক্তি ওই ছাত্রীকে উদ্ধার করে পুলিশে খবর দেন। তুরাগ থানা পুলিশের একটি দল ঘটনাস্থলে গিয়ে তাঁকে থানায় নেয়। খবর পেয়ে বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রীর স্বজনরাও থানায় যান। ওই দিন তাঁরা মামলাও করেন। তবে মামলায় অনেক আলামত ও ঘটনার মূল বিষয় গোপন করে শুধু ছিনতাইয়ের ঘটনা উল্লেখ করা হয়। ১ সেপ্টেম্বর সমকালে প্রথম পাতায় 'পুলিশ পরিচয়ে ঢাবি ছাত্রীকে তুলে নিল কে'- শিরোনামে প্রতিবেদন প্রকাশের পর তোলপাড় শুরু হয়। ছয় দিন পুরোপুরি আড়ালে থাকা ঘটনাটি এরপর সবার সামনে আসে।
ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের প্রধান ডিআইজি হারুন অর রশিদ বলেন, অপহরণকারীকে ধরতে একাধিক জাল পাতা হয়েছে। তাঁকে আমরা শনাক্তও করতে পেরেছি। অল্প সময়ের মধ্যে আমরা আইনের আওতায় আনতে পারব। সিসিটিভির ফুটেজও পর্যালোচনা করেছি।
