কোটা আন্দোলনের সমন্বয়ক নাহিদের মা
সন্তান নিরাপদ মা-বাবার কাছে, ডিবিতে কীসের নিরাপত্তা
রাজধানীর মিন্টো রোডে ডিবি কার্যালয়ে কোটা সংস্কার আন্দোলনের অন্যতম সমন্বয়ক নাহিদ ইসলামের মা মমতাজ নাহার। ছবি: সংগৃহীত
সমকাল প্রতিবেদক
প্রকাশ: ২৯ জুলাই ২০২৪ | ১০:৪০ | আপডেট: ২৯ জুলাই ২০২৪ | ১১:১৫
‘সন্তান মা-বাবার কাছে নিরাপদ। ডিবি অফিসে কীসের নিরাপত্তা? আমার সন্তানকে ফিরিয়ে দিন।’ এসব কথা বলছিলেন কোটা সংস্কার আন্দোলনের সমন্বয়ক নাহিদ ইসলামের মা মমতাজ নাহার। নিরাপত্তার কারণে নাহিদসহ চিকিৎসাধীন তিন সমন্বয়ককে হাসপাতাল থেকে হেফাজতে নেওয়া হয়েছে– ডিবি পুলিশের এমন বক্তব্যের জবাবে মমতাজ নাহার এসব কথা বলেন। ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা (ডিবি) কার্যালয়ে নাহিদকে আবারও নির্যাতন করা হতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন তিনি।
এদিকে ডিবি পুলিশের হেফাজতে থাকা বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের ছয় সমন্বয়ক আন্দোলন প্রত্যাহারের ঘোষণা দিয়েছেন– এমন একটি ভিডিওবার্তা গতকাল রোববার রাত সাড়ে ৯টার দিকে সংবাদমাধ্যমে আসে। তবে আত্মগোপনে থাকা অন্য সমন্বয়করা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে জানিয়েছেন, ডিবি কার্যালয়ে থাকা নেতাদের অস্ত্রের মুখে জিম্মি করে আন্দোলন প্রত্যাহারের ঘোষণা দেওয়ানো হয়েছে।
গতকাল রোববার নাহিদের মা, খালা ও ফুফুসহ পরিবারের পাঁচজন রাজধানীর মিন্টো রোডে ডিবি কার্যালয়ে নাহিদের সঙ্গে দেখা করার উদ্দেশে যেতে চেয়েছিলেন। তাদের অভিযোগ, মিন্টো রোডের মুখে থাকা পুলিশ সদস্যরা তাদের আটকে দেন। এরপর তারা রাস্তার পাশে ফুটপাতে দাঁড়িয়ে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেন।
মমতাজ নাহার বলেন, ‘ডিবি বলেছে– নিরাপত্তার কারণে নাহিদকে হেফাজতে নেওয়া হয়েছে। ডিবি অফিসে তারা নিরাপদ এমনটি কেউ মনে করে না। সন্তান সবচেয়ে নিরাপদে থাকে পরিবারের কাছে। আমার সন্তানকে যেন সরকার ফেরত দিয়ে দেয়। নাহিদের মতো প্রতিটি শিক্ষার্থীকে যেন মা-বাবার কাছে ফিরিয়ে দেওয়া হয়। এর আগেও নাহিদকে তুলে নিয়ে গিয়ে নির্যাতন করা হয়েছিল। সবাই তার শরীর দেখেছে, কীভাবে তাকে নির্যাতন করা হয়েছিল।’
কোটা সংস্কার আন্দোলনের তিন সমন্বয়ক নাহিদ ইসলাম, আসিফ মাহমুদ ও আবু বাকের ধানমন্ডির গণস্বাস্থ্য নগর হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ছিলেন। সেখান থেকে গত শুক্রবার ডিবি তাদের নিয়ে যায়। এর আগে দুই সমন্বয়ক সারজিস আলম ও হাসনাত আবদুল্লাহকে শনিবার সন্ধ্যায় ডিবি অফিসে নেওয়া হয়।
এদিকে আরও এক সমন্বয়ককে ডিবি হেফাজতে নেওয়া হয়েছে। তিনি হলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী নুসরাত তাবাসসুম। এ ছাড়া জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের আরিফ সোহেল ও ব্র্যাক ইউনিভার্সিটির প্রাক্তন শিক্ষক আসিফ মাহতাবকে ডিবি পরিচয়ে তুলে নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। তবে বিষয়টি নিশ্চিত করেনি ডিবি।
গতকাল ডিবি কার্যালয়ে সংবাদ সম্মেলনে ঢাকা মহানগর পুলিশের অতিরিক্ত কমিশনার (ডিবি) মোহাম্মদ হারুন অর রশীদ বলেন, ‘নিরাপত্তার স্বার্থে সমন্বয়কারীদের হেফাজতে আনা হয়েছে। কোটা আন্দোলনকে কেন্দ্র করে যারা ধ্বংসলীলা চালিয়েছে, বিভিন্ন স্থাপনায় আগুন লাগিয়েছে, এসব দুর্বৃত্ত, এসব জামায়াত-শিবির চক্রদের ধরার দায়িত্ব আমাদের। কেউ যদি নিরাপত্তাহীনতায় ভোগে, এটা জানার পর আমাদের নৈতিক দায়িত্ব তাদের নিরাপদে নিয়ে আসা।’
নিরাপত্তা দেওয়ার পাশাপাশি সমন্বয়কদের জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে কিনা– এ প্রশ্নের জবাবে ডিবিপ্রধান বলেন, তারা নিরাপত্তার স্বার্থে আমাদের কাছে আছে। তাদের সঙ্গে আমাদের বিভিন্ন বিষয়ে কথাবার্তা হচ্ছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে তাদের সুন্দর একটা আন্দোলন ছিল, এই আন্দোলনের সময় তাদের সঙ্গে কারা কারা যোগাযোগ করার চেষ্টা করেছে, কারা কারা তাদের উস্কানি দিয়েছিল– এসব বিষয়ে জানতে চেয়েছি। তারা কিছু নাম ও নম্বর আমাদের দিয়েছে। তিনি বলেন, যাদের নিরাপত্তার স্বার্থে আনা হয়েছে, তাদের পরিবারের কাছে অনুরোধ করব, দুশ্চিন্তা করার কোনো কারণ নেই।
ইইউ রাষ্ট্রদূতের সঙ্গে দেখা করার কথা ছিল তাদের
ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) রাষ্ট্রদূত চার্লস হোয়াইটলির সঙ্গে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের দুই সমন্বয়ক নুসরাত তাবাসসুম ও আরিফ সোহেলের গতকাল দেখা করার কথা ছিল। দেশের সার্বিক পরিস্থিতি জানতে রাষ্ট্রদূত তাদের আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন। তাই তাদের তুলে নিয়ে যাওয়া হয়েছে বলে দাবি করেছেন বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সমন্বয়ক মো. আব্দুল হান্নান মাসউদ। গতকাল দুপুরে ফোনে তিনি এই অভিযোগ করেন। এর আগে শনিবার রাত সাড়ে ৩টার দিকে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের (জাবি) শিক্ষার্থী ও বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন জাবি শাখার অন্যতম সমন্বয়ক আরিফ সোহেলকে জাবি বিশ্ববিদ্যালয় এলাকা থেকে ডিবি নিয়ে যায়।
গতকাল রোববারের কর্মসূচি সম্পর্কে মাসউদ বলেন, সারাদেশে গ্রেপ্তার আতঙ্ক এবং পুলিশ ও ছাত্রলীগের চোখ ফাঁকি দিয়ে শিক্ষার্থীরা দেয়াল লিখন ও গ্রাফিতি আঁকছেন। অনলাইন-অফলাইনে প্রচারণা চলছে। এ ছাড়া হত্যাকাণ্ডের শিকারদের তথ্য সংগ্রহের কাজও চলছে।
হাসনাত আব্দুল্লাহর মুক্তি চাইলেন ঢাবির শিক্ষকরা
কোটা সংস্কার আন্দোলনকে কেন্দ্র করে সারাদেশে শিক্ষার্থী ও সাধারণ মানুষের প্রাণহানি, গ্রেপ্তার এবং হয়রানির ঘটনায় উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের শিক্ষকরা। তারা বিশেষ করে কোটা আন্দোলনের সমন্বয়ক ও ইংরেজি বিভাগের ছাত্র হাসনাত আব্দুল্লাহসহ সব শিক্ষার্থীকে মুক্তি দেওয়ার দাবি জানিয়েছেন।
গতকাল ইংরেজি বিভাগের চেয়ারপারসন অধ্যাপক জেরিন আলম স্বাক্ষরিত এক বিজ্ঞপ্তিতে এসব তথ্য জানানো হয়। এতে শিক্ষার্থীদের ‘ন্যায্য দাবি’ উল্লেখ করে এর প্রতি সমর্থন জ্ঞাপন করেছেন তারা।
বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, আমরা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের শিক্ষকরা বৈষম্যপূর্ণ নিয়োগ পদ্ধতিকে কেন্দ্র করে সাম্প্রতিক ছাত্র আন্দোলনকে ঘিরে প্রাণহানির মতো অপূরণীয় ক্ষতি, শিক্ষার্থী ও সাধারণ মানুষকে নির্বিচারে গ্রেপ্তার এবং হয়রানির ঘটনায় গভীর উদ্বেগ জানাই।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী যা বললেন
সমন্বয়কদের গ্রেপ্তার করা হয়নি জানিয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান বলেছেন, ‘তারা ঝুঁকিমুক্ত, পুলিশ এটা মনে করলে তাদের ছেড়ে দেওয়া হবে।’ গতকাল সচিবালয়ে এক প্রেস ব্রিফিংয়ে মন্ত্রী এ কথা জানিয়েছেন। সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে মন্ত্রী বলেন, তারা নিজেরাই বলছিল যে, তারা ঝুঁকিতে আছে। সে জন্য আমরা তাদের নিরাপত্তার জন্য নিয়ে এসেছি। তাদের জিজ্ঞেস করা হচ্ছে, কোন কোন রাজনৈতিক দল কিংবা কারা তাদের প্ররোচনা দিয়েছে। পরে যে আন্দোলন সহিংস রূপ নিল, সে ব্যাপারে আমরা তাদের জিজ্ঞেস করছি। এগুলোর উত্তরও তারা দিচ্ছে।
- বিষয় :
- ডিবি
- পুলিশ
- কোটা সংস্কারের দাবি
