ঢাকা শনিবার, ১১ জুলাই ২০২৬

সামাজিক দূরত্ব আছে, নেই সচেতনতা

করোনার ভয়ে যাত্রী নেই বাসে

করোনার ভয়ে যাত্রী নেই বাসে
×

ফাইল ছবি

সমকাল প্রতিবেদক

প্রকাশ: ০২ জুন ২০২০ | ০৯:৩১ | আপডেট: ৩০ নভেম্বর -০০০১ | ০০:০০

তিল ধারণের জায়গা নেই, বাদুড়ের মতো যাত্রী ঝুলছে জরাজীর্ণ ভাঙাচোরা বাসের দরজায় হাতলে- ‘ঢাকার গণপরিবহন’ লিখে গুগলে তল্লাশি দিলে এ ছবিগুলো আসে। লোকাল বাস মানে- ‘উপচে পড়া ভিড়।’ তবে দুনিয়াকে উল্টেপাল্টে দেওয়া করোনাভাইরাস এ চিত্র বদলে দিয়েছে। এ মহামারি রোধে দীর্ঘ দুই মাস বন্ধ থাকার পর সোমবার যাত্রীবাহী বাস চালু হলেও ছিল না যাত্রীর ভিড়।

অতীত অভিজ্ঞতায় শঙ্কা ছিল- সামাজিক দূরত্ব রক্ষা হবে তো? কিন্তু করোনার ভয়ে প্রথম দিনে অধিকাংশ বাস ছিল প্রায় যাত্রী শূন্য। অর্ধেক সিট খালি রাখার শর্তে ৬০ শতাংশ ভাড়া বাড়িয়ে বাস চালানোর অনুমতি দিয়েছে সরকার। তবে প্রথম দিনে সরেজমিনে দেখা গেলো, যাত্রী সঙ্কটে অধিকাংশ বাসে বাকি অর্ধেক আসনও ভরেনি।

এতে সামাজিক দূরত্ব রক্ষা হলেও স্বাস্থ্যবিধি রক্ষার বাকি শর্তগুলো মানা হচ্ছে না। বাসে স্যানিটাইজার রাখা, যত্রতত্র যাত্রী না তোলা, যাত্রী উঠনামার সময় তিন ফুট দূরত্ব রক্ষা, প্রতি যাত্রার আগে বাস জীবাণুমুক্ত করার শর্ত মানা হচ্ছে না।

লোকসান পোষাতে ভাড়া ৬০ ভাগ বাড়লেও, প্রথম দিনে কোনো কোনো বাসে ভাড়া দ্বিগুণেরও বেশি নেওয়ার অভিযোগ পাওয়া গেছে। আবার  যাত্রী না থাকায় অধিকাংশ বাস প্রথম দিন সড়কে নামেনি।  মালিকরা বলছেন, যাত্রী নেই বাস নামিয়ে লাভ কি? আবার যাত্রীরা বলছেন, করোনার ভয়ে বাসে উঠতে ভয় হয়। একেবারে অপরাগ না বাসে উঠছেন না তারা।

যাত্রীদের বাদুড়ঝোলা করে বহনের ‘খ্যাতি’ রয়েছে গাবতলী-সদরঘাট রুটের বাসগুলোর। কিন্তু মঙ্গলবার দেখা গেলো ভিন্ন দৃশ্য। সরেজমিনে সেন্ট্রাল পরিবহনের বাসে (ঢাকা মেট্রো-জ-১১-৩০২৩) ভ্রমণ করে দেখা গেলো, ১০টি বাড়তি আসন বসানো হয়েছে। ৩২ সিটের বাসকে অবৈধভাবে ৪২ সিটে রুপান্তরিত করা হয়েছে। করোনাকালে বাসটিতে সর্বোচ্চ ১৬ জন যাত্র পরিবহনের অনুমতি রয়েছে। অবৈধভাবে যোগ করা বাড়তি আসন হিসাবে ধরলে ২১ জন যাত্রী পরিবহনের সুযোগ রয়েছে। বাসটিতে সিকদার মেডিকেল থেকে গাবতলী ভ্রমণ করে দেখা যায়, কখনোই ১৬ জন যাত্রী পায়নি। সিকদার মেডিকেল থেকে গাবতলীর সরকার নির্ধারিত ভাড়া ১০ টাকা। আগে নেওয়া হতো ১৫ টাকা। মঙ্গলবার নেওয়া হয় ২৫ টাকা।

কোনো বাসে নেই বর্ধিত ভাড়ার তালিকা। মালিক চালকরা জানান, সরকার এখনও তালিকা দেয়নি তাদের। তাই তারা নিজের মতো হিসাব করে বাড়তি ভাড়া নিচ্ছেন। যাত্রীদের সঙ্গে তর্কবিতর্ক হচ্ছে। তালিকা পেলে এ সমস্যা থাকত না।

বাড়তি ভাড়া নিতে দেখা গেছে, নতুন বাজার থেকে সাভার রুটের ‘অগ্রগামী পরিবহনে’। গাবতলী সেতু থেকে হেমায়েতপুরের ভাড়া নেওয়া হচ্ছে ২৫ টাকা। এ পথে সরকার নির্ধারিত ভাড়া ১৪ টাকা। করোনকালে তা ২২ টাকা হওয়ার কথা। যাত্রীরা বলছেন, আগে ১০ টাকা নেওয়া হতো।

বাসের চালক নজরুল ইসলাম বললেন, যাত্রী পেতে আগে তারা ৪ টাকা কম নিতেন। ৪০ আসনের বাসে অন্তত ৬০ জন যাত্রী নিতেন। ৪ টাকা কম নিলেও পোষাত। এখন ২০ জন যাত্রী নিতে পারবেন, কিন্তু দীর্ঘক্ষণ অপেক্ষার পর তাও পাচ্ছেন না। তাই কম ভাড়া নেওয়া সম্ভব নয়।

সেন্ট্রাাল পরিবহন ও অগ্রগামী দু’টি বাসেই অর্ধেক সিট খালি রেখে সামাজিক দূরত্ব রক্ষা করা হয়েছে। তবে স্যানিটাইজার, চালক শ্রমিকের মাস্ক গ্লাভসসহ বাকি সুবিধাগুলো নেই। কয়েকজন মালিক দাবি করেন, তারা সকল সরঞ্জাম দিয়েছেন।

তবে উভয় বাসের চালক বললেন, মালিককের কাছ থেকে তারা কোনো সুরক্ষা সরঞ্জাম পাননি। তবে খুব সতর্কতার সঙ্গে যাত্রী তুলছেন। যেনো গায়ে গা না লাগে। কিন্তু যাত্রীরাই সচেতন নয়। নামার সময় তিন চার জন এক সঙ্গে এসে দরজার মুখে দাঁড়িয়ে থাকেন। নিষেধ করলে উল্টো ধমক দেয়।

গাবতলী থেকে হানিফা পরিবহনের রংপুর বিভাগের জেলাগুলোর বাস ছাড়ে। হানিফের মহাব্যবস্থাপক (জিএম) মোশাররফ হোসেন জানান, তারা বাসে স্যানিটাইজার দিচ্ছেন। বাসে উঠার আগে যাত্রীদের জীবাণুমুক্ত করছেন। কিন্তু যাত্রীর খুবই সঙ্কট। যে বাসে ২০ জন যাত্রী পরিবহনের অনুমতি রয়েছে, সেখানে ১০ থেকে ১২ জন যাত্রী হচ্ছে।

হিমাচল পরিবহনের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আফতাব মাসুদ সমকালকে জানান, তার কোম্পানির বাস চারটি রুটে চলে। ঢাকা-নোয়াখালী রুটে ৬০টি দুরপাল্লার বাস রয়েছে। সোমবার চলেছে ১৬টি। যাত্রী না থাকায় বাকিগুলো পথে নামাননি। মিরপুর-নারায়নগঞ্জ রুটের ‘নীলাচল পরিবহন’ নামে আফতাব মাসুদের কোম্পানির ৪০টি বাস চলে। সোমবার ২০টি নামিয়েছিলেন। কিন্তু সেখানেও যাত্রী সঙ্কট। ‘গুলশানের চাকা’ বাস এখনও চালুই করেননি।

আফতাব মাসুদ জানান, মিরপুর-নারায়ানগঞ্জ রুটের ভাড়া ছিল ৬০ টাকা। এখন নিচ্ছেন ৯৫ টাকা। আর ঢাকা-নোয়াখালীর ভাড়া ছিল ৩৮০। এখন নিচ্ছেন ৬০০। তিনি বলেন, একে তো করোনা, তার ওপর আবার ভাড়া বেশি। কেউ বাসে উঠতে চায় না। আগামী দুই তিন দিন পর দুরপল্লার রুটে যাত্রী আরও কমবে। তবে ঢাকার অভ্যন্তরীণ রুটের যাত্রী হয়তো বাড়বে। যাত্রী না বাড়লে মালিকরা বাস চালিয়ে পোষাতে পারবেন না। এমনিতেই ফের বাস বন্ধ হয়ে যাবে।

মোটরসাইকেলে রাজধানীর হাজারীবাগ, বছিলা, মোহাম্মদপুর, গাবতলী, কল্যাণপুর, শ্যামলী, তেজগাঁও, প্রেস ক্লাব, শাহবাগ হয়ে জিগাতলা পর্যন্ত গণপরিবহনের প্রায় অভিন্ন দৃশ্য দেখা গেছে। বাসগুলো স্বাস্থ্যবিধি মানছে কী-না পর্যবেক্ষণে বিআরটিএ বা সরকারের কোনো সংস্থার তদারকি দেখা যায়নি।

অথচ অনলাইন ব্রিফিংয়ে সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের বলেছেন, আইনশৃংখলা রক্ষাকারী বাহিনীসহ ভিজিল্যান্স টিম, মোবাইল কোর্টসহ টার্মিনাল কর্তৃপক্ষকে অর্ধেক আসন খালি রাখা, বর্ধিত ৬০ ভাগ ভাড়া এবং স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলা ও মাস্ক পরিধানের মতো বিষয়গুলো তদারকি করবে।

এদিকে মহাখালী ও সায়দবাস টার্মিনালে জীবাণুনাশক টানেল বসানো হয়েছে। সেখান থেকে যাত্রীর আগে বাসে জীবাণনাশক স্প্রে করা হচ্ছে। বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন সমিতির মহাসচিব খন্দকার এনায়েত উল্যাহ বলেন, প্রথম দিনে সার্বিক পরিস্থিতি সন্তোষজনক। সামাজিক দূরত্ব ভঙ্গের কোনো অভিযোগ পাওয়া যায়নি। সরকার যা নির্ধারণ করেছে, সেই ভাড়াই নিচ্ছেন মালিকরা।

যাত্রী কল্যাণ সমিতির মহাসচিব মোজাম্মেল হক চৌধুরী বলেন, প্রথম দিনে দু-এক জায়গায় বাড়তি ভাড়া ছাড়া আর কোনো অভিযোগ নেই। যাত্রী কম তাই সামাজিক দূরত্ব আছে। কিন্তু যাত্রী বাড়লে তা থাকবে এমন নিশ্চিয়তা নেই। স্বাস্থ্যবিধি রক্ষায় চালক শ্রমিকদের প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়নি। এতে সমস্যা হচ্ছে।

আরও পড়ুন

×