লাশ শনাক্ত
পায়ে ব্যান্ডেজ দেখে মা কেঁদে বললেন—‘এই তো আমার মাহিরা’
মিরপুরে অগ্নিদগ্ধ হয়ে নিহত শিশু মাহিরার মা ফাতেমা। ছবি: সমকাল
সমকাল প্রতিবেদক
প্রকাশ: ১৫ অক্টোবর ২০২৫ | ১৫:১৬ | আপডেট: ১৫ অক্টোবর ২০২৫ | ১৫:১৭
বাতের ব্যথায় ক’দিন আগেই ছোট মেয়ের পায়ে কালো ক্র্যাব ব্যান্ডেজ পরিয়ে দিয়েছিলেন মা ফাতেমা। ভেবেছিলেন এতে ব্যথা কিছুটা কমবে। কিন্তু সেই ব্যান্ডেজই হলো শেষ পরিচয়ের চিহ্ন। মঙ্গলবার গভীর রাতে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের (ঢামেক) মর্গে সেই কালো ব্যান্ডেজ পরা পুড়ে যাওয়া দেহের দিকে তাকিয়ে চিৎকার করে উঠলেন ফাতেমা- ‘এই তো আমার মাহিরা!’
মুহূর্তেই মাটিতে লুটিয়ে পড়েন তিনি। কান্নার রোল ছড়িয়ে পড়ে মর্গের সামনে। বুধবার সকাল পর্যন্ত ফাতেমা কিছু খেতে পারেননি, চোখের জলে শুকিয়ে গেছে মুখ।
মাত্র ১৪ বছর বয়স ছিল মাহিরার। বড় বোন সানজিদার বয়স ১৫। দুই বোনের জীবনে বাবার ভালোবাসা নেই বহু বছর ধরে। তারা তখনও ছোট, যখন বাবা ফারুক হোসেন মারা যান। সেই থেকে শুরু হয় সংগ্রামের জীবন। মা ফাতেমা দুই মেয়েকে নিয়ে বরগুনার বাবনা থানার আমতলী গ্রাম ছেড়ে চলে আসেন ঢাকায়। মাথা গোঁজার ঠাঁই হয় মিরপুরে মামা শফিকুল ইসলামের ছোট ভাড়া বাসায়।
সেখানে থেকেই নতুন জীবনের খোঁজে গার্মেন্টসে চাকরি নেয় বড় বোন সানজিদা। সংসারে কিছুটা স্বস্তি ফেরাতে চেয়েছিল সে। বড় বোনের পথেই হাঁটতে চেয়েছিল ছোট মাহিরাও। চলতি মাসের ১ অক্টোবর যোগ দেয় মিরপুরের শিয়ালবাড়ির সেই পোশাক কারখানায়, যেখানে ১৪ দিন পরই আগুনে দগ্ধ হয়ে নিভে গেল তার জীবন।
বুধবার সকালে ঢামেকের সামনে ভেঙে পড়া কণ্ঠে সানজিদা বলছিল, পরশু রাতে আমার নাইট ডিউটি ছিল। মাহিরা মজা করছিল- বলেছিল, ‘তুমি নাইট ডিউটিতে, আমি কিন্তু সকালে আগে ঘুম থেকে উঠব।’ তার সঙ্গে একটু ঝগড়া হয়েছিল। কে জানত সেটাই আমাদের শেষ কথা হবে…।
তার কণ্ঠে কাঁপন, চোখে স্থির এক বেদনা। বারবার বলছিল, আমার বোনটা এমনটা করতে পারত না। ওর হাসিটা এখনো কানে বাজে।
মাহিরার মামা শফিকুল ইসলাম বলেন, আজ সকালে আমার দুই মেয়ে ঝগড়া করছিল। সেই দৃশ্য দেখে হাউমাউ করে কাঁদতে শুরু করে সানজিদা। ওর মায়ের অবস্থা আরও খারাপ—মেয়ের মরদেহ দেখার পর থেকে কিছুই খায়নি। কেমন করে এই শোক সইব!
পরিবার জানিয়েছে, মরদেহ পাওয়ার পর মিরপুর কবরস্থানে দাফন করা হবে মাহিরাকে।
মঙ্গলবার সকাল সাড়ে ১১টার দিকে রাজধানীর মিরপুরের শিয়ালবাড়িতে একটি পোশাক কারখানা ও সংলগ্ন রাসায়নিক গুদামে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ড ঘটে। আগুনে ১৬ জনের মৃত্যু হয়। ফায়ার সার্ভিসের প্রাথমিক ধারণা, রাসায়নিকের গুদামে বিস্ফোরণের পর ছড়িয়ে পড়া বিষাক্ত ধোঁয়া ও গ্যাসই প্রাণঘাতী ছিল। দগ্ধ মরদেহগুলো এতটাই বিকৃত যে অনেকের পরিচয় নিশ্চিত করতে ডিএনএ পরীক্ষার প্রয়োজন হবে বলে জানিয়েছে সিআইডি। বুধবার সকালে আরও একটি মরদেহের পরিচয় শনাক্ত করেন স্বজনেরা।
ঢামেকের মর্গের সামনে এখনও আহাজারিতে ভরপুর পরিবেশ। কেউ প্রিয়জনের ছবি বুকে চেপে কাঁদছেন, কেউ মরদেহের নামের তালিকায় খুঁজছেন নিজের সন্তানকে।
- বিষয় :
- মিরপুর
- অগ্নিদগ্ধ
- অগ্নিকাণ্ড
