ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

পশু জবাই নিরাপদ হচ্ছে না

ঢাকার ৫ জবাইখানার ৩টি বন্ধ, দুটিতে কাজ চলে কদাচিৎ

পশুর শরীরে অ্যানথ্রাক্স জীবাণু ছড়িয়ে পড়ায় আক্রান্ত হচ্ছে মানুষও

ঢাকার ৫ জবাইখানার ৩টি বন্ধ, দুটিতে কাজ চলে কদাচিৎ
×

ফাঁকা পড়ে আছে রাজধানীর মিরপুরের জবাইখানা। সম্প্রতি তোলা সমকাল

 অমিতোষ পাল ও লতিফুল ইসলাম

প্রকাশ: ১৮ অক্টোবর ২০২৫ | ০৮:৪৫ | আপডেট: ১৮ অক্টোবর ২০২৫ | ১২:০৬

| প্রিন্ট সংস্করণ

পাড়া-মহল্লা-হাটবাজারসহ যত্রতত্র পশু জবাই হলেও রাজধানীর দুই সিটি করপোরেশনের তদারকি নেই। এমনকি প্রতি সোমবার পশু জবাইয়ে নিষেধাজ্ঞা (মিটলেস ডে) থাকলেও সেটির কোনো প্রয়োগ নেই। সম্প্রতি দেশের বিভিন্ন স্থানে গবাদি পশু ও মানুষের শরীরে অ্যানথ্রাক্সের প্রাদুর্ভাব দেখা দিলেও সিটি করপোরেশনের হেলদোল দেখা যাচ্ছে না।

পশু জবাই ও মাংসের মান নিয়ন্ত্রণ আইন, ২০১১-এর ধারা ৩(১) অনুযায়ী, পারিবারিক ও ধর্মীয় অনুষ্ঠান ছাড়া খোলা স্থানে পশু জবাই নিষেধ। এ ছাড়া জবাইখানায় একজন পশু চিকিৎসক উপস্থিত থেকে পশুর স্বাস্থ্য পরীক্ষা করে জবাইয়ের অনুমতি দেবেন। চামড়া ছড়ানোর পর পশুর শরীরের পেছনের পায়ের ওপরের অংশে সিল দেবেন। এসব আইনেরও কোনো প্রয়োগ নেই। 

জানা যায়, ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) দুটি জবাইখানার একটি আধুনিকায়নের পরও সাড়ে ছয় বছর বন্ধ আছে। আরেকটির নির্মাণকাজ আরও বছরখানেক আগে শেষ হলেও চালু করতে পারেনি কর্তৃপক্ষ। ফলে দক্ষিণ সিটি এলাকায় স্বাস্থ্য পরীক্ষা ছাড়াই চলছে পশু জবাই।

প্রায় একই পরিস্থিতি ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন (ডিএনসিসি) এলাকায়ও। তাদের মিরপুর-১১, মহাখালী ডিএনসিসি মার্কেট ও মোহাম্মদপুর কৃষি মার্কেটে তিনটি পশু জবাইখানা আছে। তবে মহাখালীরটি এখনও চালু করা যায়নি; অন্য দুটিতে পশু জবাই হয় কদাচিৎ। 

সোমবার মিরপুর ১১ নম্বরের কাঁচাবাজারের জবাইখানায় গিয়ে দেখা যায়, সেখানে কোনো পশু নেই। এক পাশ গোবরে ঠাসা। বাকি অংশে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে আবর্জনা। পাশের ইউসুফ মাংস বিতানের ব্যবসায়ী মো. বাবু সমকালকে বলেন, ভোরের দিকে দুয়েকটি গরু এখানে জবাই হয়। বাকিগুলো বাজারের ব্যবসায়ীরা দোকানের সামনেই জবাই করেন। কোনো ছাগল এখানে জবাই হয় না। সিটি করপোরেশনের দুয়েকজন কর্মী মাঝেমধ্যে সকালের দিকে আসেন। একটু পরই চলে যান। 

প্রায় একই চিত্র দেখা যায় মোহাম্মদপুর কৃষি মার্কেটসংলগ্ন জবাইখানায়। সেখানে দুটি গরু ও কয়েকটি ছাগল বাঁধা থাকলেও জবাইখানার বর্জ্য অপসারণের নর্দমাটিকে মানুষ মূত্রত্যাগের স্থান হিসেবে ব্যবহার করছে। মাংস দোকানি মো. মনা সমকালকে বলেন, এখানে সকালের দিকে দুয়েকটা পশু জবাই হয়। একটি গরু জবাই করলে ৫০ টাকা দিতে হয়। 

হাজারীবাগের গজমহল রোডে ডিএসসিসির জবাইখানায় গিয়ে দেখা যায়, ফটকে তালা। সেখানে হোল্ডিং ট্যাক্স পরিশোধে নগরবাসীকে উদ্বুদ্ধ করার একটি ব্যানার ঝুলছে। পাঁচতলার জবাইখানাটি কাজ শেষ করার আগেই ২০১৯ সালে তৎকালীন মেয়র সাঈদ খোকন উদ্বোধন করলেও এ পর্যন্ত একটি পশুও জবাই হয়নি। অথচ এটি তৈরিতে ডিএসসিসির খরচ হয় ৮১ কোটি টাকা। আর যন্ত্রপাতি কেনা হয় ১৫ কোটি টাকার। 

কাপ্তানবাজারের তিনতলা আধুনিক জবাইখানাটিরও প্রায় একই হাল। ২০১৮ সালে জবাইখানাটির নির্মাণকাজ শুরু হয়। গত বছর নির্মাণকাজ শেষ হলে এটি হস্তান্তরের জন্য প্রকৌশল বিভাগ গত জুনে সম্পত্তি বিভাগের কাছে পাঠায়। দীর্ঘদিন বিদ্যুৎ ও পানির বিল বকেয়া থাকায় এখনও সম্পত্তি বিভাগ তা বুঝে নেয়নি। এটির অবকাঠামো তৈরিতে খরচ হয় ১৯ কোটি টাকা। আর যন্ত্রপাতিতে খরচ হয় ৩৩ কোটি। দীর্ঘদিন ধরে এটিও তালাবদ্ধ।

সরেজমিন দেখা যায়, ফটকে লেখা ‘ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন আধুনিক জবাইখানা’। পশু জবাই না হলেও দুজন নিরাপত্তাকর্মী সেখানে দায়িত্বে আছেন। তারা জানান, মাঝেমধ্যে যন্ত্রপাতি সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানের লোকজন এসে যন্ত্র পরীক্ষা করে যান। 

কাপ্তানবাজার আধুনিক পশু জবাইখানার ৫০ থেকে ৬০ হাত দূরে ৩০ বছর ধরে মাংস বিক্রি করেন রুমান এন্টারপ্রাইজের ফাইজুর রহমান। তিনি বলেন, পাঁচ থেকে ছয় বছর আগে জবাইখানাটা বন্ধ হয়ে যায়। বছরখানেক আগে কাজ শেষ হলেও চালু হয়নি। আগে সেখানেই গরু জবাই হতো। বন্ধ থাকায় নিজেদের তত্ত্বাবধানে ভোরে দোকানের সামনেই গরু জবাই করি।
ডিএসসিসির কর্মকর্তারা বলছেন, দক্ষ জনবলের অভাবে আধুনিক যন্ত্রপাতি স্থাপনের পরও হাজারীবাগ পশু জবাইখানা চালু করা যায়নি। ডিএসসিসির সম্পত্তি কর্মকর্তা হাসিবা খাতুন বলেন, হাজারীবাগের পশু জবাইখানাটি বেসরকারি ব্যবস্থাপনায় দিতে তিন পর্যায়ে ৯ বার পত্রিকায় বিজ্ঞপ্তি দেওয়া হয়। তবে কোনো প্রতিষ্ঠান আগ্রহ দেখায়নি। প্রথম দুই দফা ইজারা দর ছিল আট কোটি ৫৬ লাখ এবং শেষ দফায় ছয় কোটি ১৬ লাখ টাকা। এর পরও কেউ আগ্রহী হয়নি। এখন ইজারামূল্য চার কোটি টাকা থেকে কমিয়ে দুই কোটি টাকা করার চিন্তাভাবনা চলছে। আর কাপ্তানবাজারের পশু জবাইখানাটি এখনও প্রকৌশল বিভাগ থেকে বুঝিয়ে দেওয়া হয়নি। এটি বুঝে পেলে ইজারার জন্য বিজ্ঞপ্তি দেওয়া হবে।

ঢাকায় প্রতিদিন কত পশু জবাই হয়, এর সঠিক হিসাব সিটি করপোরেশনে নেই। তবে বাংলাদেশ মাংস ব্যবসায়ী সমিতির সাধারণ সম্পাদক রবিউল আলম জানান, সংখ্যাটি প্রায় দুই হাজার। অধিকাংশই পথেঘাটে জবাই হয়। অভিযোগ রয়েছে, তদারকির ঘাটতির সুযোগে কিছু অসাধু কসাই অনেক সময় মৃত বা অসুস্থ পশু জবাই করেও মাংস বিক্রি করে। 
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. লেলিন চৌধুরী বলেন, অসুস্থ পশুর মাংস খেলে বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি থাকে। পশু কোনো ভাইরাসে আক্রান্ত থাকলে ভোক্তাও তাতে আক্রান্ত হতে পারেন। তাই জবাইয়ের আগে পশুর স্বাস্থ্য পরীক্ষা করা জরুরি। 

এ ব্যাপারে ডিএনসিসির ভেটেরিনারি কর্মকর্তা ডা. লুৎফর রহমান বলেন, আমাদের তিনটি জবাইখানার মধ্যে মিরপুর ও মোহাম্মদপুরে নিয়মিত পশু জবাই হয়। মহাখালী ডিএনসিসি মার্কেটের জবাইখানা বন্ধ রাখা হয়েছে। প্রয়োজনীয় জনবল না থাকায় আমরা ঠিকমতো তদারক করতে পারছি না। 
ডিএসসিসির প্রধান স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ডা. নিশাত পারভীন বলেন, আমাদের তিনজন ভেটেরিনারি চিকিৎসক ও তিনজন পরিদর্শক রয়েছেন। কয়েকজন সিলম্যানও আছেন। এটা পর্যাপ্ত না। আবার জবাইখানাগুলো বন্ধ থাকায় তারা সেটি তদারকও করতে পারছেন না। অবশ্য পরিদর্শকরা পাড়া-মহল্লার দোকানগুলোতে মাঝেমধ্যে পরিদর্শনে যান। আগামীতে আরও কিছু জনবল নিয়োগ দেওয়ার প্রস্তুতি চলছে।

আরও পড়ুন

×