ঢাকা বুধবার, ২২ জুলাই ২০২৬

করোনাকাল

প্রাণ ফিরেছে বুড়িগঙ্গায়

প্রাণ ফিরেছে বুড়িগঙ্গায়
×

দূষণমুক্ত বুড়িগঙ্গার বুকে এখন নৌকায় ভ্রমণ করছেন অনেকেই সমকাল

জাহিদুর রহমান

প্রকাশ: ০৪ আগস্ট ২০২০ | ১২:০০

তিলোত্তমা ঢাকার একেবারে গা ঘেঁষে যে নদীটি বয়ে গেছে তাকে কি নদী বলে মনে হতো এই ক'দিন আগেও? পানির রং কালো। পাড় ধরে জমে উঠেছে ময়লা, নোংরা আবর্জনার স্তূপ। বুড়িগঙ্গা বললে এ রকম চিত্রই ভেসে উঠত দু'চোখজুড়ে। অথচ সেই বুড়িগঙ্গার আকাশে এখন উড়ছে পাখির দল। চারদিকে বিস্তৃত টলটলে জলরাশি। পড়ন্ত বিকেলের সূর্যের ছবি সেই জলে।
নতুন করে ফিরে পাওয়া এই বুড়িগঙ্গার মধ্যে আলপনা কেটে এগোচ্ছে আমাদের ছোট্ট নৌকা। বৈঠা বাইতে বাইতে মাঝি আলিপ উদ্দিন স্মৃতির ঝাঁপি মেলে ধরলেন। দেশ স্বাধীন হওয়ার দুই বছর পর ভোলা থেকে কাজের সন্ধানে ছুটে আসেন ঢাকায়। পরিচিত এক লোকের পরামর্শে বুড়িগঙ্গা নদী ঘিরেই শুরু হয় তার জীবন-জীবিকা। গত ২৯ বছর ধরে এই নদীর বুকে ভেসে বেড়াচ্ছেন আলিপ। তার কথায়, তখন বুড়িগঙ্গা অনেক বড় ছিল। ছিল না কোনো গন্ধ। পাওয়া যেত বড় বড় মাছ। এই নদীকে ঘিরেই চলত হাজারো মানুষের জীবন। সেই থেকে জলের মায়া ছাড়তে পারেননি আলিপ। নদীর পাড়ের একটি গ্রামে বিয়েও করেছেন। তার সংসারও এখন বেশ বড়। ছেলেমেয়ে বিয়ে দিয়েছেন। নাতি-পুতিরাও বড় হয়েছে। তবুও নৌকার বৈঠা ঠেলেই যাচ্ছেন আলিপ।
মোহাম্মদপুরের বছিলা ব্রিজের নিচে নৌকা নিয়ে প্রতিদিন ঘুরতে আসা মানুষের অপেক্ষায় থাকেন আলিপ উদ্দিন। গত কয়েক মাসে নাকি আয়-রোজগারও বেড়েছে তার। শহর থেকে প্রতিদিন বহু মানুষ একটু প্রশান্তির আশায় ছুটে আসছেন নদীতে। এখান থেকে নৌকা ভাড়া করে ঘুরে বেড়াচ্ছেন নদীর জলরাশিতে। কোথাও কাশবন, কোথাও পাখির ঝাঁক, কোথাও মাছ ধরার দৃশ্য দেখে করোনাকালে নগরের বন্দিজীবনে হাঁপিয়ে ওঠা মানুষ স্বস্তির নিঃশ্বাস নিচ্ছেন। কেউ কেউ নৌকা নিয়ে ঘুরে আসছেন আশপাশের নির্জন গ্রামে।
গত কয়েক মাসে যাবতীয় দূষণ, নোংরা, আবর্জনা ঝেড়ে ফেলে বুড়িগঙ্গা নদী বদলে গেছে। নদীর এমন মনোরম দৃশ্যে মাঝিরা এখন বেশ চাঙ্গা। নদীতে জাল ফেলে মাছও ধরছেন জেলেরা। নদীর যে যৌবন ও রূপ খুলেছে, সেটা মানছেন ঘুরতে আসা পুলিশ কর্মকর্তা নিজাম উদ্দিন রিপনও। তিনি বলেন, নদীর পানি আগের থেকে স্বচ্ছ। পাখির দল নদী লাগোয়া এলাকায় ঘুরছে। নদীর স্বাস্থ্য ৫০ শতাংশ ভালো হয়ে গেছে। নানা প্রজাতির পাখির দল দু'চোখ ভরে দেখতে দেখতে নিজাম উদ্দিন রিপনের মুখের কাথা টেনে নিয়ে মাঝি আলিপ বললেন, 'এই সুখী নদীই তো আমাদের জীবন।'
নির্মল এই পরিবেশের আবেশ গায়ে মেখে নিতে বুড়িগঙ্গায় ছুটে এসেছেন সংবাদকর্মী মাসুদ রানা। বদলে যাওয়া স্বচ্ছ বুড়িগঙ্গায় ঘুরে বেড়ানোর লোভ ছাড়তে পারছেন না বলেই এক মাসে দু'বার এলেন তিনি। বলেন, 'করোনাকালে বুড়িগঙ্গা যেন অনেকটাই অতীতের স্মৃতি ফেরাতে শুরু করেছে। নদীতে মাছও মিলছে। দুই পাড়ের গাছপালায় যেন আরও সবুজ।' তিনি বলেন, 'করোনাকালে ঢাকায় সব বিনোদন কেন্দ্র বন্ধ থাকায় মানুষ এখানে ঘুরতে
আসছেন। দূর-দূরান্ত থেকে ভ্রমণপিপাসুরা ছুটে আসেন বুড়িগঙ্গার পাড়ে।'
নদীপাড়ের বাসিন্দা আবুল হোসেন বলেন, 'হাজারীবাগের ট্যানারি স্থানান্তরের পর বুড়িগঙ্গা কিছুটা হলেও প্রাণ ফিরে পায়। তারপর এবারের এই বর্ষা মৌসুমে বুড়িগঙ্গা পেয়েছে ভরা যৌবন। বাতাস ছাড়লেই নদীতে ঢেউ ওঠে। গত এক সপ্তাহ টানা বৃষ্টির পর মাছও বেড়েছে। জেলেদের জালে ধরা পড়ছে কালি বাউস, টেংরা, চাপিলা, পুটি, নলা, রুই, কাতল, বোয়াল, শিং, মাগুর, কৈ, বাইমসহ নানা প্রজাতির মাছ।'
পরিবেশ অধিদপ্তর দেশের বিভিন্ন নদনদীর নানা পয়েন্ট থেকে পানির মান পরীক্ষা করে। গত বছরে (২০১৯) বুড়িগঙ্গার মিরপুর ব্রিজের কাছের পানিতে পানির দ্রবীভূত অক্সিজেনের (ডিও) পরিমাণ ছিল শূন্য শতাংশ। চলতি বছরের এপ্রিল মাসে দাঁড়িয়েছে ২ দশমিক শূন্য ২ মিলিগ্রাম।
তবে, সবই কি ভালো? আশঙ্কা কি নেই কোথাও এতটুকু? বুড়িগঙ্গা ফের আগের ছবিতে ফিরে যাবে না তো? এমন প্রশ্নে বাংলাদেশ পরিবেশ আইনবিদ সমিতির (বেলা) প্রধান নির্বাহী সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান বলেন, 'হাজারীবাগের ট্যানারির কারণে দূষিত হচ্ছিল বুড়িগঙ্গা নদী। বেলার রিটের পরিপ্রেক্ষিতে হাইকোর্টের আদেশে ট্যানারি স্থানান্তর করার কারণে বুড়িগঙ্গার পানির ইতিবাচক পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে। এ থেকে আমাদের শিক্ষা নেওয়া উচিত। শিল্পকারখানা যদি আমরা আইনসম্মতভাবে পরিচালনা করি, তাহলে আমাদের শিল্পও থাকে, কর্মসংস্থানও থাকে। পাশাপাশি বুড়িগঙ্গার মতো নদী, যা কিনা আমরা নিজেরা সৃষ্টি করবার ক্ষমতা রাখি না, সেগুলোও টিকে থাকে। আর বুড়িগঙ্গা টিকে থাকলে ঢাকা শহরের মানুষের জন্য খাবার পানি আনতে পদ্মা অথবা মেঘনায় যেতে হয় না। তবে ট্যানারি মালিকরা এখন ধলেশ্বরী নদী দূষিত করছেন।'
তিনি বলেন, 'বুড়িগঙ্গা নদীর এমন রূপ ধরে রাখতে হলে অন্য সব কারখানাকে আইন মেনে চলতে হবে। ওয়াসার ড্রেন ও অন্য শিল্পকারখানা থেকে এখানে পানি যাচ্ছে। ৫০ বছর ধরে ওয়াসার ড্রেন থেকে ময়লা পানি বুড়িগঙ্গায় মিশছে। অথচ বুড়িগঙ্গা এক প্রজন্মের সম্পদ না। শুধু আইন মেনে চললে এই সম্পদ ঠিকই রক্ষা করা যায়।'


আরও পড়ুন

×