ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

কড়াইল বস্তিতে ফের আগুন, পুড়ে ছাই কয়েকশ ঘর

কড়াইল বস্তিতে ফের আগুন, পুড়ে ছাই কয়েকশ ঘর
×

রাজধানীর মহাখালী এলাকায় কড়াইল বস্তিতে গতকাল মঙ্গলবার বিকেলে ভয়াবহ আগুন লাগে। প্রধানত পোশাককর্মী, রিকশাচালক, হকার ও দিনমজুররা এখানকার বাসিন্দা। আগুন লাগার সময় তাদের বেশির ভাগই বাড়িতে ছিলেন না। সন্ধ্যায় তোলা -সমকাল

সমকাল প্রতিবেদক

প্রকাশ: ২৬ নভেম্বর ২০২৫ | ০৭:৪৭ | আপডেট: ২৬ নভেম্বর ২০২৫ | ১১:৫২

| প্রিন্ট সংস্করণ

রাজধানীর মহাখালীর কড়াইল বস্তিতে ফের ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে পুড়ে গেছে কয়েকশ বসতঘর। গতকাল মঙ্গলবার বিকেলে এই আগুনের সূত্রপাত। খবর পেয়ে ফায়ার সার্ভিসের ১৯টি ইউনিট সেখানে ছুটে যায়। পাঁচ ঘণ্টার বেশি সময় পর রাত ১০টা ৩৫ মিনিটে আগুন নিয়ন্ত্রণে আসে। তবে রাত সাড়ে ১২টায় এ রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত আগুন পুরোপুরি নেভানো যায়নি। 

আগুনে বস্তির শত শত বাসিন্দা হয়ে পড়েছেন আশ্রয়হীন। গতকাল রাতে তাদের বড় অংশই খোলা আকাশের নিচে রাত কাটাতে বাধ্য হন। ফায়ার সার্ভিস মিডিয়া সেলের কর্মকর্তা তালহা বিন জসীম জানান, বিকেল ৫টা ২২ মিনিটে কড়াইল বস্তিতে আগুন লাগার খবর পাওয়া যায়। প্রথমে সেখানে সাতটি ইউনিট পাঠানো হয়। আগুনের ভয়াবহতা বিবেচনায় পরে ইউনিট বাড়ানো হয়েছে। কীভাবে আগুনের সূত্রপাত, তাৎক্ষণিকভাবে জানা যায়নি।

আগুনের খবর পাওয়ার পর যানজটের কারণে ঘটনাস্থলে পৌঁছাতে সময় লাগে ফায়ার সার্ভিসের ইউনিটগুলোর। পৌঁছানোর পর দেখা যায়, আগুনের কাছাকাছি পানির উৎস নেই। এ কারণে আগুন নেভাতে সমস্যায় পড়েন ফায়ার সার্ভিস কর্মীরা। এক পর্যায়ে তারা বস্তি লাগোয়া খাল থেকে পানি নেওয়া শুরু করেন। 
ফায়ার সার্ভিসের এক কর্মকর্তা জানান, আগুনে দেড় হাজার ঘর পুড়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

সরেজমিন দেখা যায়, আগুন থেকে বাঁচতে নিরাপদ আশ্রয়ের সন্ধানে ছুটছেন বস্তির বাসিন্দারা। কেউ কেউ ঘরের মূল্যবান সামগ্রী সরিয়ে নিতে চেষ্টা চালাচ্ছেন। কাউকে কাউকে হাউমাউ করে কাঁদতে দেখা যায়। লাভলী বেগম নামের বস্তির এক বাসিন্দা বলেন, ‘আমার সব পুইড়া শ্যাষ; কিচ্ছু নাই। সাত বছর এই বস্তিত আছি। অনেক কষ্টে কিছু জিনিসপত্র কিনছিলাম। ঘরে টিভি, ফ্রিজ আছে। মাসে মাসে কিস্তির টাকা পরিশোধ করতে হয়।’

শেরপুর থেকে ১০ বছর আগে রাজধানীতে পাড়ি জমান লুৎফর রহমান। ঢাকায় এসে রিকশা চালানো শুরু করেন। স্ত্রী আসমা খাতুন গুলশানের একটি গার্মেন্টে কাজ করেন। গতকাল আগুন লাগার সময় লুৎফর গুলশানে রিকশা চালাচ্ছিলেন। সেখানেই শুনতে পান, কড়াইল বস্তির বউবাজারে আগুন লেগেছে। স্ত্রী আসমা ও দুই বছরের সন্তান কাওসার ঘরেই ছিল। তাদের নিরাপদে বের করার জন্য দ্রুত বস্তিতে চলে আসেন। তবে টিঅ্যান্ডটি মাঠের কাছে এসে আর সামনে এগোতে পারেননি। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী রাস্তা বন্ধ করে দিয়েছে। 
তিনি জানান, সঙ্গে মোবাইল ফোন নেই। আগুন লাগার পরে আর স্ত্রীর সঙ্গে কথা হয়নি। ঘরের জিনিসপত্র সব পুড়ে শেষ। দাঁড়িয়ে আছেন স্ত্রী-সন্তানকে খুঁজে পাওয়ার আশায়।

লুৎফরের মতো বস্তির অনেকেই টিঅ্যান্ডটি মাঠে আশ্রয় নিয়েছেন। রাব্বি শেরপুর নালিতাবাড়ীর সিটি করপোরেশনের সড়কের কাজ করেন। স্ত্রী সাবিনা ইয়াসমিনসহ কড়াইল বস্তির নৌকাঘাটে থাকেন। স্ত্রী গার্মেন্টসে কাজ করেন। আগুন লাগার সময় দুজনের কেউই ঘরে ছিলেন না। ঘরে আসবাবপত্র ছাড়াও জমানো ২০ হাজার টাকা ছিল। সব পুড়ে শেষ। রাব্বি বলেন, মোহাম্মদপুর থেকে এসে স্ত্রীর দেখা পেলেও ঘরের কিছুই পাননি। রাতে মাঠেই কাটাতে হবে।

বস্তির বাসিন্দা ছাড়াও উদ্ধারে সহায়তার জন্য অনেকে সেখানে ভিড় করেন। সেই সঙ্গে ছিলেন কৌতূহলী মানুষ। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা ঘটনাস্থলে গিয়ে উৎসুক লোকজনকে সরিয়ে দেন। আবার বাসিন্দাদের অনেকে ঝুঁকি নিয়ে আগুন লাগা ঘরের দিকে যেতে চাচ্ছিলেন। তাদেরও বাধা দেওয়া হয়।

বস্তির এক বাসিন্দা জানান, বউবাজার এলাকার ‘ক’ ব্লকে মসজিদের পাশের এলাকায় প্রথম আগুন দেখা যায়। সেখানকার কোনো ঘর থেকে আগুনের সূত্রপাত বলে ধারণা করা হচ্ছে।

ঘটনাস্থলে ফায়ার সার্ভিসের পরিচালক (অপারেশন ও মেইনটেন্যান্স) লেফটেন্যান্ট কর্নেল মোহাম্মদ তাজুল ইসলাম চৌধুরী বলেন, নানা রকম সীমাবদ্ধতার কারণে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনতে সময় লাগছে। আমাদের বড় গাড়িগুলো আগুনের কাছে আসতে পারছে না। বড় বড় পাইপ জোড়া দিয়ে আগুনের কাছে পৌঁছাতে হচ্ছে। এখানে প্রচুর ভিড়। অনেকে আমাদের কাজে সহায়তা করছেন। আবার সহায়তা করতে গিয়ে পাইপের জোড়া খুলে ফেলার মতো ঘটনাও ঘটেছে। আমাদের পানির স্বল্পতা আছে। তবে ঘটনাস্থলের চারপাশে পানির উৎস আছে। কিন্তু সেখান থেকে আগুন পর্যন্ত পানি নিয়ে যেতে সময় লাগছে। প্রথমে আমাদের পৌঁছাতেই ৩০ মিনিটের বেশি সময় লেগেছে। পরের ইউনিটগুলো আসতে আরও সময় লাগে। আমরা এসে দেখি, আগুন তীব্র হয়ে গেছে। আগুন যখন তৃতীয় ধাপে পৌঁছায়, তখন নেভাতে দীর্ঘ সময় লেগে যায়। 

কড়াইল বস্তির এক পাশে গুলশান, অন্য পাশে বনানীর মতো অভিজাত এলাকা। প্রায় ৯০ একর জায়গার ওপর গড়ে ওঠা বস্তিতে অন্তত ১০ হাজার ঘর রয়েছে। সেখানে মাঝেমধ্যেই অগ্নিকাণ্ড ঘটে। চলতি বছরের ২১ ফেব্রুয়ারি, গত বছরের ১৮ ডিসেম্বর ও ২৪ মার্চ আগুনে পুড়ে যায় বেশ কিছু ঘর।

 

আরও পড়ুন

×