ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

কড়াইল বস্তিতে অগ্নিকাণ্ড

পরনের কাপড় ছাড়া কিছু অবশিষ্ট নেই তাদের

ফায়ার সার্ভিসের তদন্ত কমিটি গঠন

পরনের কাপড় ছাড়া কিছু অবশিষ্ট নেই তাদের
×

রাজধানীর মহাখালীর কড়াইল বস্তিতে আগুনে হাজারখানেক ঘর পুড়ে গেছে। আগুন নেভার পর পোড়া ঘরে ব্যবহার করার মতো কিছু পাওয়া যায় কিনা, তার খোঁজ শুরু করেন বাসিন্দারা। গতকাল বুধবার দুপুরে তোলা -সমকাল

বকুল আহমেদ

প্রকাশ: ২৭ নভেম্বর ২০২৫ | ০৭:৫৬ | আপডেট: ২৭ নভেম্বর ২০২৫ | ০৯:০৭

| প্রিন্ট সংস্করণ

পুরো ঘর আগুনে ভস্মীভূত; কিন্তু দোতলায় ওঠার লোহার সিঁড়িটি অক্ষত। সেই সরু সিঁড়ি বেয়ে ওপরে উঠে দেখা গেল, ছাদে স্তূপ করা পোড়া জামাকাপড় উল্টেপাল্টে দেখছেন এক নারী, পরার যোগ্য কিছু অবশিষ্ট আছে কিনা। চোখ দিয়ে ক্রমাগত পানি ঝরছে তাঁর; মাঝেমধ্যে হাত দিয়ে চোখ মুছছেন। কী খুঁজছেন– জিজ্ঞাসা করতেই বললেন, ‘এই যে খালি ছাদ দেখছেন, এখানে আমার ঘর ছিল। ভাড়া থাকতাম। আগুনে সব পুড়ে শেষ হয়ে গেছে। পোড়া জিনিসপত্রের মধ্যে আমার ছেলের জামা খুঁজছি। পরনের কাপড় ছাড়া আমাদের আর কিছুই নেই।’ 

গতকাল বুধবার দুপুর ১২টার দিকে রাজধানীর মহাখালীর কড়াইলে পোড়া বউবাজার বস্তিতে গিয়ে কথা হয় ওই নারীর সঙ্গে। আগের দিন বিকেলে ভয়াবহ আগুনে বউবাজার বস্তির প্রায় দেড় হাজার ঘর পুড়ে ছাই হয়ে যায়। ফায়ার সার্ভিসের ১৯টি ইউনিটের চেষ্টায় পাঁচ ঘণ্টার বেশি সময় পর নিয়ন্ত্রণে আসে আগুন। বাসিন্দারা ঘরের কোনো আসবাব বের করার সুযোগ পাননি। ক্ষতিগ্রস্ত অনেকেই জানান, ঘরে আসবাব ছাড়াও কমবেশি স্বর্ণের গহনা ও নগদ অর্থ ছিল। আগুনে তাদের সব পুড়েছে। এখন পরনের কাপড় ছাড়া কোনো কিছুই অবশিষ্ট নেই তাদের। মঙ্গলবার রাত কাটিয়েছেন খোলা আকাশের নিচে। গতকাল বুধবার রাতও হয়তো খোলা আকাশের নিচে কাটাতে হয়েছে। 

গতকাল সরেজমিন দেখা যায়, বিভিন্ন স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন এবং ব্যক্তি উদ্যোগে পোড়া বস্তিতে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের মধ্যে রান্না করা খাবার ও পানি বিতরণ করা হচ্ছে। এ ছাড়া অস্থায়ী মেডিকেল ক্যাম্প বসিয়ে বিনামূল্যে চিকিৎসার ব্যবস্থাও করা হয়।

ফায়ার সার্ভিসের মিডিয়া সেলের কর্মকর্তা শাহজাহান শিকদার জানান, কড়াইল বস্তিতে অগ্নিকাণ্ডের কারণ তদন্তে ফায়ার সার্ভিস থেকে পাঁচ সদস্যের কমিটি গঠন করা হয়েছে। কমিটিকে আগামী ১৫ কার্যদিবসের মধ্যে তদন্ত প্রতিবেদন জমা দিতে বলা হয়েছে।

প্রত্যক্ষদর্শীরা জানিয়েছেন, বউবাজার বস্তির ‘ক’ ব্লকের মিন্টু মিয়ার বাড়ি থেকে আগুনের সূত্রপাত। তবে এ নিয়ে দুই ধরনের তথ্য পাওয়া গেছে। অনেকে বলেছেন, রান্নার গ্যাস সিলিন্ডারের পাইপ ঢিলা হয়ে যাওয়ায় সেখান থেকে আগুন লাগে। প্রথম পর্যায়ে মিন্টু মিয়ার পরিবারের সদস্য এবং কয়েকজন ভাড়াটিয়া আগুন নেভানোর চেষ্টা করেন। কিন্তু আগুন ছড়িয়ে পড়ে। এর কারণ, বস্তির টিন-কাঠের ঘর একটির সঙ্গে আরেকটি লাগোয়া। তবে মিন্টু মিয়ার মেয়ে আসমা আক্তার বলেন, ‘প্রথমে আমাদের বাড়ির ওপরে বিদ্যুতের তার থেকে নিচে আগুন ছিটকে পড়ে। এরপর সিলিন্ডারের পাইপে আগুন ধরে যায়। আমরা আগুন নেভানোর চেষ্টা করি। পরে সবাই বেরিয়ে চলে যায়। এর পর থেকে আমার মাকে পাওয়া যাচ্ছে না।’

মিন্টু মিয়ার আরেক মেয়ে শিউলী আক্তার জানান, তাদের বাবার ২৫টি ঘর ছিল সেখানে। তারা নিজেরা তিনটি ঘরে থাকতেন, বাকিগুলো ভাড়া দেওয়া। সব ঘরই পুড়ে ধ্বংস হয়ে গেছে। ঘরসংলগ্ন দোকানে তাদের বাবা চপ-পেঁয়াজু বিক্রি করতেন। সেই দোকানও শেষ। 

প্রত্যক্ষদর্শী রাসেল তালুকদার জানান, ঘটনাস্থল মানে মিন্টু মিয়ার বাড়ির পাশেই তাঁর দর্জির দোকান। ঘটনার সময় তিনি দোকানে ছিলেন। মিন্টু মিয়ার বাড়িতে আগুন লাগার খবর পেয়ে তিনি ছুটে গিয়ে দেখেন, গ্যাস সিলিন্ডারে আগুন লেগেছে। সবাই নেভানোর চেষ্টা করছে। পরে তিনি নিজের ঘরে গিয়ে স্ত্রী-সন্তান নিয়ে বের হয়ে চলে যান। 

ফায়ার সার্ভিস সূত্র জানায়, মঙ্গলবার বিকেল ৫টা ২২ মিনিটে তারা আগুন লাগার খবর পায়। পর্যায়ক্রমে তাদের ১৯টি ইউনিট অগ্নিনির্বাপণে অংশ নেয়। রাত ১০টা ৩৫ মিনিটে আগুন নিয়ন্ত্রণে আসে। গতকাল সকাল সাড়ে ৯টায় আগুন নেভার আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দেওয়া হয়। 

সরেজমিন দেখা যায়, বউবাজার বস্তির নৌকাঘাটের রাস্তার পাশের একটি পোড়া দোকান ঘরের ছাইয়ের মধ্যে নিজের ক্যাশবাক্স খুঁজছেন চা দোকানি আবু তাহের। ছাইয়ের মধ্য থেকে ৫০ টাকার মতো খুচরা পয়সা উদ্ধার করেন তিনি। তবে সেই পয়সাগুলো পুড়ে নষ্ট হয়ে গেছে। আবু তাহের জানান, দোকান বন্ধ রেখে গ্রামের বাড়ি কিশোরগঞ্জে গিয়েছিলেন। মঙ্গলবার সেখানে বসেই পরিবারের মাধ্যমে বস্তিতে আগুনের খবর পান। রাতেই রওনা হন ঢাকার পথে। ফিরে এসে দেখেন, সব শেষ। তাহেরের দাবি, তাঁর দোকানের ক্যাশবাক্সে এক লাখ ২০ হাজার টাকা ছিল। সেই টাকার পুরোটা পুড়ে গেছে। বস্তিতে তাঁর ৩০টি ঘর রয়েছে। দুটিতে নিজে থাকেন আর বাকিগুলো ভাড়া দেওয়া। পাঁচ-ছয় বছর আগে এক ব্যক্তির কাছ থেকে সাত লাখ টাকা ঋণ নিয়ে ১০টি ঘর কিনেছিলেন। সেই ঋণ পরিশোধের জন্য ঘর ভাড়া বাবদ প্রাপ্ত টাকা দোকানে রেখে দিয়েছিলেন। বাকি টাকা জোগাড়ের জন্য গ্রামের বাড়ি গিয়েছিলেন। 

আবু তাহেরের মেয়ে প্রিয়া আক্তার পূর্ণিমা জানান, বস্তির ‘ক’ ব্লক থেকে আগুন দ্রুত ছড়িয়ে তাদের ঘর জ্বলে ওঠে। প্রাণ বাঁচাতে এক কাপড়ে কোনোরকমে মা ও ভাইবোনকে নিয়ে নৌকাঘাটের দিকে ছুটে যান। সেখান থেকেই সবকিছু পুড়তে দেখেন।

মিনা আক্তার নামের এক নারী জানান, ১১ বছর আগে তাঁর স্বামী ফয়জুদ্দিন সড়ক দুর্ঘটনায় মারা যান। তাঁর গ্রামের বাড়ি কুমিল্লার চৌদ্দগ্রামে। আট বছর আগে ছেলেকে নিয়ে ঢাকায় এসে কড়াইল বউবাজার বস্তিতে ঘর ভাড়া নেন। তিনি তেজগাঁওয়ের একটি প্রতিষ্ঠানে পরিচ্ছন্নতাকর্মী হিসেবে চাকরি করেন। বেতন আট হাজার টাকা। এর মধ্যে ঘর ভাড়া চলে যায় তিন হাজার ২০০ টাকা। উত্তরার একটি মাদ্রাসায় ছেলেকে আবাসিক রেখে পড়াতে মাসে খরচ আরও তিন হাজার টাকা। বেতনের বাকি এক হাজার ৮০০ টাকা দিয়ে তাঁর নিজের খাবারের খরচ চলে। মাস শেষে কানাকড়িও হাতে থাকে না। আগুনে ঘরের সব আসবাব পুড়ে গেছে। এসব নতুন করে কেনার মতো সামর্থ্য নেই তাঁর।

গিয়াস উদ্দিন নামে আরেক ক্ষতিগ্রস্ত জানান, তাঁর ১০টি ঘর ছিল। সব পুড়ে ধ্বংস হয়ে গেছে। ১৯৯৮ সাল থেকে তিনি বস্তিতে থাকেন। মঙ্গলবারের আগে তাঁর ঘর আরও দু্ইবার ২০০৪ ও ২০১৭ সালে পুড়েছিল। দুবারই পুড়ে যাওয়ার পর নতুন করে ঘর তোলেন তিনি।

বস্তিতে অগ্নিকাণ্ডে দায়ীদের শাস্তি দাবি বাম জোটের
কড়াইল বস্তিতে অগ্নিকাণ্ডের সুষ্ঠু তদন্ত এবং কারণ উদ্ঘাটন করে দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছে বাম গণতান্ত্রিক জোট। একই সঙ্গে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোকে প্রয়োজনীয় খাদ্য-ওষুধসহ ত্রাণ সাহায্য, ক্ষতিপূরণ প্রদান এবং পুনর্বাসনের দাবি জানিয়েছে তারা। গতকাল ক্ষতিগ্রস্ত কড়াইল বস্তি পরিদর্শনকালে বাম গণতান্ত্রিক জোট নেতারা এসব দাবি জানান। বাম গণতান্ত্রিক জোটের সমন্বয়ক ও বাসদের সাধারণ সম্পাদক বজলুর রশীদ ফিরোজের নেতৃত্বে পরিদর্শনকালে আরও ছিলেন সিপিবির সভাপতি সাজ্জাদ জহির চন্দন, বিপ্লবী কমিউনিস্ট লীগের সাধারণ সম্পাদক ইকবাল কবির জাহিদ, বাসদের (মার্ক্সবাদী) সমন্বয়ক মাসুদ রানা এবং সমাজতান্ত্রিক পার্টির নির্বাহী সভাপতি আবদুল আলী।

 

আরও পড়ুন

×