বুড়িগঙ্গা ট্র্যাজেডি
ময়ূরের মাস্টার-সুকানি দায় এড়ানোর চেষ্টায়
আতাউর রহমান
প্রকাশ: ০৬ আগস্ট ২০২০ | ১২:০০
বুড়িগঙ্গায় লঞ্চডুবিতে ৩৪ জনের মৃত্যুর ঘটনায় ময়ূর-২ লঞ্চের মাস্টার ও সুকানি একে অন্যের ওপর দায় চাপিয়েছেন। পুলিশি রিমান্ড এবং আদালতে দেওয়া জবানবন্দিতে লঞ্চটির মাস্টার আবুল বাসার মোল্লা বলেছেন, লঞ্চটি চালাচ্ছিল সুকানি নাসির মৃধা। এদিকে নাসির বলেছেন, তিনি লঞ্চ চালালেও মাস্টার বাসার সঠিকভাবে সিগন্যাল দেননি। এতে তার পেছনে যে মর্নিংবার্ড নামের যাত্রীবাহী লঞ্চ ছিল, সেটি তিনি বুঝতে পারেননি। ফলে ধাক্কা খেয়ে মর্নিংবার্ড ডুবে প্রাণহানির ঘটনা ঘটে।
ময়ূর-২ লঞ্চের দায়িত্বশীল এই দু'জনের পাল্টাপাল্টি বক্তব্যের কারণে ঘটনার এক মাস পরও পুলিশ বুড়িগঙ্গা ট্র্যাজেডির ঘটনায় চার্জশিট দিতে পারেনি। ওই ঘটনায় এজাহারভুক্ত সব আসামি গ্রেপ্তার হলেও কাউকেই বিচারের মুখোমুখি করা যায়নি এখনও। এরই মধ্যে ময়ূর-২ লঞ্চের মালিক মোসাদ্দেক হানিফ সোয়াদ জামিনে কারাগার থেকে বেরিয়ে গেছেন।
গত ২৯ জুন সকালে মুন্সীগঞ্জের কাঠপট্টি থেকে মর্নিংবার্ড নামে ছোট আকারের লঞ্চটি অর্ধশতাধিক যাত্রী নিয়ে ঢাকার সদরঘাটের উদ্দেশে ছেড়ে আসে। সকাল ৯টার কিছু সময় পর সদরঘাটের অদূরে ময়ূর-২ নামের বড় আকারের লঞ্চটি পেছনের অংশ দিয়ে মর্নিংবার্ডকে ধাক্কা দিয়ে মাত্র কয়েক সেকেন্ডেই সেটি ডুবিয়ে দেয়। ওই ঘটনায় ৩৪ জন নিহত হন। তাদের সবার বাড়ি মুন্সীগঞ্জের বিভিন্ন এলাকায়।
ওই ঘটনায় সদরঘাট নৌ থানা পুলিশ অবহেলাজনিত মৃত্যুর অভিযোগে মামলা করে। এতে ময়ূর-২ লঞ্চের মালিক মোসাদ্দেক হানিফ, লঞ্চটির মাস্টার আবুল বাসার মোল্লা ও জাকির হোসেন, ইঞ্জিন রুম ড্রাইভার শিপন হাওলাদার ও শাকিল হোসেন, সুকানি নাসির মৃধা এবং গ্রিজার রুমের কর্মী হৃদয় হোসেনকে আসামি করা হয়। পৃথক অভিযান চালিয়ে পুলিশ ও র্যাব সব আসামিকেই গ্রেপ্তার করে। এজাহারের বাইরে ময়ূর-২ লঞ্চের সুপারভাইজার আবদুস সালামকেও গ্রেপ্তার করা হয়।
মামলার তদন্ত কর্মকর্তা নৌ পুলিশের সদরঘাট থানার উপপরিদর্শক শহিদুল আলম সমকালকে বলেন, মামলার অন্যতম আসামি মাস্টার আবুল বাসার এবং সুকানি নাসির মৃধা একে অন্যের ওপর দায় চাপিয়েছেন। এতে কেউই দায়মুক্ত হতে পারবেন না। এত বড় ঘটনায় অন্যান্য আসামির সঙ্গে এ দু'জনের দায়িত্বহীনতায় সেদিন এত প্রাণহানি হয়েছিল।
তদন্ত কর্মকর্তা বলেন, মামলার সব আসামিকে গ্রেপ্তার করা হলেও কিছু তথ্য যাচাই এবং প্রমাণ জোগাড়ের জন্য চার্জশিট দিতে বিলম্ব হচ্ছে। কারণ অভিযুক্ত ময়ূর-২ লঞ্চটি ঘটনার দিন বুড়িগঙ্গার দক্ষিণ তীরে নোঙর করা ছিল। সেটি যাত্রী তুলতে সকাল সাড়ে ১০টার দিকে টার্মিনালে আসার কথা। এর এক ঘণ্টা আগেই চলে আসার চেষ্টা করে। কার নির্দেশে সেটি আগে টার্মিনালে আসছিল, সে তদন্ত এখনও শেষ হয়নি। এজন্য চার্জশিট দিতে বিলম্ব হচ্ছে।
তদন্ত-সংশ্নিষ্ট সূত্র জানায়, লঞ্চের মাস্টার বাসার তার জবানবন্দিতে বলেছেন, মর্নিংবার্ড লঞ্চটি পেছনে দেখে তিনি সুকানিকে সিগন্যাল দিয়েছিলেন। সিগন্যাল না মেনে সুকানি নাসির লঞ্চ চালাতেই থাকে। নির্দেশ সে মানেনি, যে কারণে দুর্ঘটনাটি ঘটে। তবে নাসির মৃধা তার জবানবন্দিতে দাবি করেছেন, মূলত মাস্টারের সিগন্যালের ওপর ভিত্তি করেই লঞ্চ চালানো হয়। তিনি লঞ্চটি নোঙর থেকে টার্মিনালে নিচ্ছিলেন। তখন মাস্টার আবুল বাসার তাকে যেভাবে সিগন্যাল দিচ্ছিলেন, তিনি সেভাবেই চালাচ্ছিলেন। পেছনে যে যাত্রীবাহী মর্নিংবার্ড লঞ্চ ছিল, সেটি তার দেখার কথা নয়। সেটি দেখে মাস্টারের সিগন্যাল দেওয়া দায়িত্ব। সেটা তিনি না করাতেই সেদিন লঞ্চটি ঘোরানোর সময় পেছনের অংশটি অন্য লঞ্চের ওপর উঠিয়ে দেন।
ওই মামলায় রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী অতিরিক্ত পাবলিক প্রসিকিউটর আনোয়ারুল কবীর বাবুল সমকালকে বলেন, চাঞ্চল্যকর লঞ্চডুবি মামলায় এজাহারভুক্ত সব আসামি গ্রেপ্তার করা হলেও অভিযুক্ত ময়ূর-২ লঞ্চের মালিক মোসাদ্দেক জামিনে রয়েছেন। অন্য আসামিরা কারাগারে।
- বিষয় :
- বুড়িগঙ্গা ট্র্যাজেডি