ফ্লাইওভার থেকে ছোড়া ককটেলে তরুণ নিহত
সন্ত্রাসীদের জন্য রাস্তায়ও কি চলা যাবে না– নিহত সিয়ামের বাবার আর্তনাদ
রাজধানীর মগবাজার এলাকায় গতকাল বুধবার সন্ধ্যায় ফ্লাইওভার থেকে দুর্বৃত্তদের ছোড়া ককটেল বিস্ফোরণে নিহত সিয়াম মজুমদারের পরিবারের সদস্যদের আহাজারি -সমকাল
সমকাল প্রতিবেদক
প্রকাশ: ২৫ ডিসেম্বর ২০২৫ | ০৮:৩৬ | আপডেট: ২৫ ডিসেম্বর ২০২৫ | ১০:০৫
| প্রিন্ট সংস্করণ
রাজধানীর মগবাজার এলাকায় বাংলাদেশ মুক্তিযোদ্ধা সংসদ কেন্দ্রীয় কমান্ডের সামনে দুর্বৃত্তদের ছোড়া ককটেল বিস্ফোরণে সিয়াম মজুমদার (২০) নামে এক যুবক নিহত হয়েছেন। নিউ ইস্কাটন রোডের জাহিদ কার ডেকোরেশন নামে একটি প্রতিষ্ঠানের কর্মী ছিলেন তিনি। গতকাল বুধবার সন্ধ্যা সোয়া ৭টার দিকে মগবাজার ফ্লাইওভারের নিচে এ ঘটনা ঘটে।
বাংলাদেশ মুক্তিযোদ্ধা সংসদ কেন্দ্রীয় কমান্ড কাউন্সিলের সামনের ফুটপাতে মো. ফারুকের চায়ের দোকান। তিনি সমকালকে বলেন, ‘এক তরুণ এক কাপ চা দিতে বলছিল। কয়েক সেকেন্ড পর ওই তরুণের মাথায় কিছু একটা পড়ল। মাথার ছিন্নভিন্ন অংশ চায়ের কেতলিতে এসে পড়েছে।’
প্রত্যক্ষদর্শী ও পুলিশ জানায়, সন্ধ্যার দিকে ফ্লাইওভারের ওপর থেকে শক্তিশালী ককটেল ছোড়া হয়। এটি বিস্ফোরিত হলে ঘটনাস্থলেই সিয়াম গুরুতর আহত হন। পরে তাঁকে রক্তাক্ত অবস্থায় পড়ে থাকতে দেখা যায়। কিছুক্ষণ পর তাঁর মৃত্যু হয়। ঘটনাস্থলের কাছেই একটি চার্চ রয়েছে।
ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) রমনা বিভাগের উপপুলিশ কমিশনার মাসুদ আলম সমকালকে বলেন, প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে, ফ্লাইওভারের ওপর থেকে ককটেল নিচে নিক্ষেপ করা হয়েছে। এটি সিয়ামের মাথায় গিয়ে পড়ে। এতে তাঁর মাথা দ্বিখণ্ডিত হয়ে যায়। ঘটনাস্থলেই তিনি মারা যান।
গতকাল ঘটনাস্থলে গিয়ে দেখা যায়, সিয়ামের মা-বাবা ও ভাই ঘটনাস্থলে ছুটে এসে কান্নায় ভেঙে পড়েন। তাঁর বাবা আলী আকবর বলেন, ‘আমি গরিব মানুষ। আমি কোনো রাজনীতি করি না। সন্ত্রাসীরা আমার ছেলেকে কেন মারল। আমার ছেলে তো কোনো অপরাধ করেনি। সন্ত্রাসীদের জন্য রাস্তায়ও কি চলা যাবে না? আমার ছেলে খুনের বিচার চাই।’
নিহতের মা শিজু বেগম আর্তনাদ করে বলেন, ‘সিয়াম তুই কই, আমার কোলে ফিরে আয়। আমার বুক খালি হয়ে গেল। বাপ তুই বুকে আয়।’ কথা বলতে বলতে তিনি অচেতন হয়ে পড়েন। স্বজন তাঁর চোখেমুখে পানি দেন। মিনিট দুয়েক পরে চেতনা ফিরে পেয়ে আবার আর্তনাদ করতে থাকেন তিনি।
ঘটনার পর ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ এবং পুলিশের রমনা বিভাগের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা ছুটে যান ঘটনাস্থলে। এ ছাড়া সিটিটিসির বম্ব ডিসপোজাল ইউনিট এবং পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগের (সিআইডি) ফরেনসিক ইউনিট আলামত সংগ্রহ করে।
প্রত্যক্ষদর্শীদের বরাত দিয়ে পুলিশ জানায়, সিয়াম তাঁর কর্মস্থল থেকে ঘটনাস্থলের পাশে নাশতা কিনতে এসেছিলেন। নাশতা কেনার পর তিনি ফুটপাতে ফারুকের চায়ের দোকানে দাঁড়ান। ফারুককে চা দিতে বলেন তিনি। এরই মধ্যে ককটেল এসে তাঁর মাথায় পড়ে।
সিয়ামের ছোট ভাই সিজান মজুমদার জানান, নিউ ইস্কাটন রোডে একটি বাসায় তারা ভাড়া থাকেন। তাদের গ্রামের বাড়ি খুলনা জেলায়। সাড়ে চার বছর আগে তাদের দুই ভাইকে নিয়ে বাবা-মা ঢাকায় চলে আসেন। বাবা আলী আকবর ঢাকায় রিকশা চালান। চার বছর ধরে সিয়াম ইস্কাটন রোডে কার ডেকোরেশনের দোকানে কাজ করছিলেন। গতকাল সকাল ৯টায় বাসা থেকে বের হন তিনি। কর্মস্থল থেকে রাতে বাসায় ফেরার কথা ছিল।
এজি চার্চের একজন কর্মকর্তা জানিয়েছেন, মগবাজার মুক্তি সংসদ গলিতে দুটি চার্চ আছে। এর একটি গলির মুখেই প্রধান সড়কের কাছে। সেখানে প্রধান সড়কে ঘটনাটি ঘটেছে। তবে পুলিশ বলছে, ভীতি ছড়ানোর জন্য ককটেল ছোড়া হয়েছে। বড়দিনের সঙ্গে এর কোনো সম্পর্ক নেই।
গতকাল রাতে ডিএমপি এক বিজ্ঞপ্তিতে জানায়, ঢাকায় চলমান চেকপোস্ট ও টহল কার্যক্রম জোরদার করা হয়েছে। প্রাথমিকভাবে প্রতীয়মান হয়, ঘটনাটি কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের পরিকল্পিত ও ধারাবাহিক ককটেল সন্ত্রাসেরই অংশ। যার উদ্দেশ্য জনমনে ভীতি ও আতঙ্ক ছড়ানো। এই ঘটনার সঙ্গে জড়িতদের বিষয়ে কোনো তথ্য থাকলে নিকটস্থ থানা অথবা জাতীয় জরুরি সেবা ৯৯৯-এর মাধ্যমে পুলিশকে অবহিত করার জন্য নগরবাসীকে অনুরোধ করে ডিএমপি।
