তপশিলের পরও থামেনি আন্দোলন
৩৬ দিনে ৮৯ বার বিক্ষোভকারীরা রাস্তায়
ঢাকা সেন্ট্রাল ইউনিভার্সিটির অধ্যাদেশ জারির দাবিতে গতকাল বৃহস্পতিবারও রাজধানীর তিন স্থানে পাঁচ ঘণ্টা সড়ক অবরোধ করেন শিক্ষার্থীরা। দিনভর দুর্ভোগ পোহাতে হয় নগরবাসীকে। সায়েন্স ল্যাব মোড় থেকে তোলা - সমকাল
বকুল আহমেদ
প্রকাশ: ১৬ জানুয়ারি ২০২৬ | ০৯:০৫ | আপডেট: ১৬ জানুয়ারি ২০২৬ | ১০:৩৫
| প্রিন্ট সংস্করণ
আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে জাতীয় সংসদ নির্বাচনের তপশিল ঘোষণার পর যে কোনো ধরনের আন্দোলনে লাগাম টানার কথা বলেছিল অন্তর্বর্তী সরকার। তবে সরকার সেই কথা রক্ষা করতে পারেনি। রাজধানী ঢাকায় প্রায় প্রতিদিনই যৌক্তিক-অযৌক্তিক নানা দাবি নিয়ে রাস্তায় নামছেন বিভিন্ন সংগঠন, গোষ্ঠী ও প্রতিষ্ঠানের কর্মীরা। তপশিল ঘোষণা হয় ১১ ডিসেম্বর। সেই থেকে গতকাল বৃহস্পতিবার পর্যন্ত ৩৬ দিনে রাজধানীতে ৮৯টি আন্দোলন হয়েছে।
কোনো কোনো দিন বিভিন্ন সড়কে একাধিক সংগঠন আন্দোলনে নামে। গুরুত্বপূর্ণ সড়ক আটকে বিক্ষোভ করায় কখনও কখনও ব্যস্ত ঢাকা নগরী যানজটে স্থবির হয়ে পড়ে। এতে ভোগান্তিতে পড়েন মানুষ। পাশাপাশি নষ্ট হয় কর্মঘণ্টা। কখনও কখনও আন্দোলনকারীদের ছত্রভঙ্গ করতে গিয়ে পুলিশের সঙ্গে তাদের পাল্টাপাল্টি ধাওয়া ও সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। প্রধান উপদেষ্টার বাসভবনের আশপাশ ও সচিবালয় এলাকায় সভা-সমাবেশ নিষিদ্ধ থাকলেও এসব এলাকায়ও বিভিন্ন সময় আন্দোলন হয়েছে।
তপশিল ঘোষণার পর সব ধরনের বেআইনি ও অনুমোদনহীন জনসমাবেশ ও আন্দোলন থেকে বিরত থাকতে সবাইকে আহ্বান জানায় সরকার। গত ৯ ডিসেম্বর প্রধান উপদেষ্টার নির্দেশে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক বৈঠকে এসব সিদ্ধান্ত হয়।
প্রধান উপদেষ্টার প্রেস উইং থেকে পাঠানো এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়েছিল, তপশিলের পর থেকে নির্বাচন পর্যন্ত যে কোনো ধরনের বেআইনি ও অনুমোদনহীন সমাবেশ, জনদুর্ভোগ সৃষ্টি করে এমন আন্দোলন কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করা হবে। যারা বেআইনিভাবে সভা-সমাবেশে অংশ নেবে, তাদের আইনের আওতায় আনা হবে।
ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, ৮৮ আন্দোলনের ২০টিতে বিভিন্ন রাজনৈতিক ও সামাজিক সংগঠন, গোষ্ঠী এবং সরকারি-আধাসরকারি প্রতিষ্ঠান বিভিন্ন দাবি ও প্রতিবাদে রাস্তায় নামে। এর মধ্যে ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র শরিফ ওসমান হাদি হত্যার প্রতিবাদ ও জড়িতদের বিচারের দাবিতে ১৩ দিনে ১৩টি বিক্ষোভ মিছিল ও মানববন্ধন করেছে সংগঠনটি। একই দাবিতে জুলাই মঞ্চ দুদিন এবং বিভিন্ন রাজনৈতিক ও সামাজিক সংগঠন ২১ দিন বিক্ষোভ মিছিল, সমাবেশ ও মানববন্ধন করে।
সহপাঠীর মৃত্যুর ঘটনায় জড়িতদের বিচার দাবিতে তেজগাঁও কলেজের শিক্ষার্থীরা ৯ দিন মানববন্ধন ও বিক্ষোভ করেন ফার্মগেট এলাকায়। ব্যাটারিচালিত রিকশা আটক বন্ধের প্রতিবাদে চার দিন রাস্তায় নামেন চালকরা। সরকারি চাকরি আইন (সংশোধন) অধ্যাদেশ-২০২৫ উপদেষ্টা পরিষদের সভায় অনুমোদন করার প্রতিবাদে দুদিন অবস্থান কর্মসূচি পালন করে বাংলাদেশ সচিবালয় সরকারি পরিষদ।
এ ছাড়া চাকরিতে আবেদনের বয়সসীমা ৩৫ বছর প্রত্যাশী শিক্ষার্থী সমন্বয় পরিষদ দুদিন, বাংলাদেশ আউটসোর্সিং কর্মচারী কল্যাণ পরিষদ কেন্দ্রীয় কমিটি তাদের চাকরি জাতীয়করণের দাবিতে এক দিন, ছাত্রলীগ নিষিদ্ধ দাবি ও সমসাময়িক বিষয় নিয়ে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন চার দিন, যুবদল, স্বেচ্ছাসেবক দল ও ছাত্রদল ভারতের আগরতলায় বাংলাদেশের উপহাইকমিশনে হামলার প্রতিবাদে এক দিনের লংমার্চ, জুলাই শহীদদের স্মরণসভা ও দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি রোধে সার্বভৌমত্ব আন্দোলন তিন দিন, শেখ হাসিনা ও তাঁর দোসরের বিচারের দাবিতে এবি পার্টি দুদিন, কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের ছয় দিন ঝটিকা মিছিল, আইজিপি বাহারুল আলমকে অপসারণের দাবিতে নাসিরউদ্দিন আহম্মেদ পিন্টু স্মৃতি পরিষদ এক দিন, মোবাইল ফোন ব্যবসায়ীরা বিভিন্ন দাবিতে ছয় দিন, বাংলাদেশ হেলথ অ্যাসিস্ট্যান্ট অ্যাসোসিয়েশন তাদের ছয় দফা দাবিতে এক দিন, ঢাকা সেন্ট্রাল ইউনিভার্সিটির অধ্যাদেশের হালনাগাদ খসড়ার অনুমোদনের পাশাপাশি রাষ্ট্রপতির চূড়ান্ত অধ্যাদেশ জারির দাবিতে সরকারি সাত কলেজের শিক্ষার্থীরা দুদিন, প্রাথমিক শিক্ষক নিয়োগ পরীক্ষায় অংশগ্রহণকারীরা পরীক্ষা বাতিলের দাবিতে দুদিন, উত্তরা রাজউক মডেল স্কুল অ্যান্ড কলেজে অকৃতকার্য ছাত্রছাত্রীদের টিসির নোটিশ দেওয়ার প্রতিবাদে অকৃতকার্য ছাত্রছাত্রী ও অভিভাবকরা তিন দিন এবং ডিপ্লোমা কৃষিবিদদের পাবলিক কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে উচ্চশিক্ষা গ্রহণের দাবিতে বাংলাদেশ কৃষি ডিপ্লোমা ছাত্র পরিষদ চার দিন আন্দোলন কর্মসূচি পালন করে।
গত বুধবারও রাজধানীর গুরুত্বপূর্ণ পাঁচ এলাকার সড়ক আটকে বিক্ষোভ করা হয়েছে। প্রায় একই সময় গুরুত্বপূর্ণ পাঁচটি মোড় বন্ধ করে আন্দোলন করায় বিভিন্ন সড়কে অচলাবস্থা দেখা দেয়। এদিন সায়েন্স ল্যাব, মহাখালীর আমতলী, টেকনিক্যাল ও তাঁতীবাজার মোড় অবরোধ করেন সাত কলেজের শিক্ষার্থীরা। সহপাঠীর মৃত্যুর প্রতিবাদ ও জড়িতদের বিচারের দাবিতে বেলা সাড়ে ১১টার দিকে ফার্মগেট মোড় অবরোধ করেন তেজগাঁও কলেজের শিক্ষার্থীরা। সাত কলেজের শিক্ষার্থীরা গতকালও সড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ করেন।
এর আগে ৪ জানুয়ারি রাজধানীর তিন জায়গায় সড়ক অবরোধ, বিক্ষোভ ও অবস্থান কর্মসূচি পালন করে বিভিন্ন সংগঠন। ফার্মগেট, কারওয়ান বাজারের সার্ক ফোয়ারা মোড় এবং হাতিরপুলে মোতালিব প্লাজার সামনে অবরোধ ও অবস্থান কর্মসূচি ঘিরে বিভিন্ন সড়কে তীব্র যানজট হয়। সড়ক থেকে অবরোধকারীদের সরিয়ে দিতে গিয়ে পুলিশের সঙ্গে তাদের পাল্টাপাল্টি ধাওয়া ও সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। মোবাইল ফোন ব্যবসায়ীরা এদিন সকাল সাড়ে ১০টার দিকে সার্ক ফোয়ারা মোড় আটকে বিক্ষোভ করেন। পুলিশ তাদের সরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করলে সংঘর্ষ বাধে। এক পর্যায়ে আন্দোলনকারীরা মোতালিব প্লাজার সামনের সড়ক অবরোধ করেন। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে পুলিশ লাঠিপেটা, টিয়ার গ্যাসের শেল ও সাউন্ড গ্রেনেড নিক্ষেপ করে।
একই দিন সহপাঠীর মৃত্যুর ঘটনায় জড়িতদের বিচার দাবিতে সকাল পৌনে ১০টায় ফার্মগেট এলাকায় সড়ক আটকে বিক্ষোভ করেন তেজগাঁও কলেজের শিক্ষার্থীরা। এতে ফার্মগেট মোড় ও আশপাশের সড়কগুলোতে যান চলাচল বন্ধ হয়ে যানজট দেখা দেয়।
গত ২৯ ডিসেম্বর কারওয়ান বাজারে চাঁদাবাজির বিরুদ্ধে ব্যবসায়ীরা মানববন্ধন করেন। এতে দুই পক্ষের মধ্যে ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া হয়।
ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র শরিফ ওসমান হাদিকে গুলি করে হত্যার প্রতিবাদে একাধিক দিন রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় সড়ক অবরোধ ও সমাবেশ হয়েছে। ১৯ ডিসেম্বর বায়তুল মোকাররমে বিক্ষোভ সমাবেশ করে বাংলাদেশ খেলাফত ছাত্র মজলিস। একই দাবিতে ২৬ ডিসেম্বর শাহবাগ মোড় অবরোধ করে ইনকিলাব মঞ্চ। টানা চার দিন আন্দোলনের পর ২৯ ডিসেম্বর রাতে অবরোধ কর্মসূচি থেকে সরে যান আন্দোলনকারীরা।
গত ৬ জানুয়ারি হাদি হত্যার বিচার নিশ্চিতসহ ঘোষিত চার দফা দাবি আদায়ের লক্ষ্যে ঢাকা ও সিলেটে একযোগে ‘মার্চ ফর ইনসাফ’ কর্মসূচি পালন করে ইনকিলাব মঞ্চ।
ডিএমপির উপপুলিশ কমিশনার (মিডিয়া) মুহাম্মদ তালেবুর রহমান সমকালকে বলেন, আমরা অনুরোধ করেছি তপশিলের পর দাবি-দাওয়া নিয়ে কেউ যেন রাস্তা অবরোধ এবং বিক্ষোভ না করে। আইনশৃঙ্খলা স্বাভাবিক রাখতে আমরা কাজ করে যাচ্ছি।
- বিষয় :
- বিক্ষোভ
