ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

জাতীয় রবীন্দ্রসংগীত সম্মেলন

অস্থির সময়ের বিরুদ্ধে শিল্পের আহ্বান

অস্থির সময়ের বিরুদ্ধে শিল্পের আহ্বান
×

বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির জাতীয় নাট্যশালায় গতকাল শুক্রবার প্রদীপ প্রজ্বালনের মধ্য দিয়ে উদ্বোধন শুরু হয় ‘জাতীয় রবীন্দ্রসংগীত সম্মেলন’। ছবি: সমকাল

সমকাল প্রতিবেদক

প্রকাশ: ১১ এপ্রিল ২০২৬ | ০৮:২৩ | আপডেট: ১১ এপ্রিল ২০২৬ | ১০:৫৯

| প্রিন্ট সংস্করণ

ঢাকার শিল্পচর্চার কেন্দ্রবিন্দু বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির জাতীয় নাট্যশালা প্রাঙ্গণে গতকাল শুক্রবার শুরু হয় ‘জাতীয় রবীন্দ্রসংগীত সম্মেলন’। এ আয়োজনের মাধ্যমে একাডেমি প্রাঙ্গণ যেন পরিণত হয়েছে বাঙালির সাংস্কৃতিক আত্মপরিচয়ের এক উন্মুক্ত মঞ্চে। এটি ছিল জাতীয় রবীন্দ্রসংগীত সম্মিলন পরিষদের ৪৪তম বার্ষিক অধিবেশন। বক্তারা সংস্কৃতির জানালায় রবীন্দ্রচেতনাকে অস্থির সময়ের বিরুদ্ধে শিল্পের আহ্বান হিসেবে উল্লেখ করেন। 

এবারের সম্মেলনটি অংশগ্রহণের দিক থেকে অন্য বছরের চেয়ে আরও বিস্তৃত। দেশের নানা প্রান্ত থেকে সাত শতাধিক শিল্পী, সংস্কৃতিকর্মী ও সংগঠক সম্মেলনে অংশ নিয়েছেন। অনুষ্ঠানের সূচনা হয় ‘আমি মারের সাগর পাড়ি দেব’ গানের বোধন দিয়ে। সঞ্চালনায় ছিলেন নাট্যনির্দেশক ত্রপা মজুমদার।

উদ্বোধনী পর্বে ইমেরিটাস অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী তাঁর বক্তব্যে সংস্কৃতিকে তুলনা করেন ‘মায়ের’ সঙ্গে। যে লালন করে, আশ্রয় দেয়, আবার খুলে দেয় চিন্তার জানালা। তাঁর এই উপমা শুধু আবেগ নয়, বরং সময়ের রাজনৈতিক ও সামাজিক বাস্তবতার গভীর পাঠও বটে। তিনি স্পষ্ট ভাষায় বলেন, সভ্যতার কাঠামো যদি পিতৃতান্ত্রিক হয়, তবে সংস্কৃতিই মানবিকতার শেষ আশ্রয়।

বক্তব্যে তিনি ফিরে যান রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের দর্শনে। যেখানে নিষ্ঠুরতার বিরুদ্ধে আজীবন প্রতিরোধের কথা উচ্চারিত হয়েছে। তাঁর ভাষ্যে, সংস্কৃতিকে ধ্বংস করা মানে মানুষকে রাজনৈতিকভাবে দুর্বল করে তোলা। সমকালীন বাংলাদেশে মৌলবাদী প্রবণতার উত্থান এবং সংস্কৃতিবিরোধী মনোভাবকে তিনি সেই বৃহত্তর সংকটেরই লক্ষণ হিসেবে দেখেন।

শিক্ষাব্যবস্থার বিভাজন নিয়েও তিনি তীব্র উদ্বেগ প্রকাশ করেন। তাঁর মতে, বহুমুখী শিক্ষা কাঠামো সমাজে বৈষম্যকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিচ্ছে। একই সঙ্গে সাধারণ মানুষের সম্পদ পাচার হয়ে যাওয়ার প্রসঙ্গ তুলে তিনি প্রশ্ন তোলেন– রাষ্ট্র কার স্বার্থে পরিচালিত হচ্ছে?

বিশেষ করে প্রাথমিক বিদ্যালয়ে গানের শিক্ষক নিয়োগ বাতিলের উদ্যোগকে তিনি ‘মনুষ্যত্ববিরোধী’ আখ্যা দিয়ে এর বিরুদ্ধে সামাজিক প্রতিরোধ গড়ে তোলার আহ্বান জানান। তাঁর বক্তব্যে উঠে আসে রথযাত্রা নাটকের প্রতীকী ব্যাখ্যা। সভ্যতার রথ এগোয় তখনই, যখন মেহনতি মানুষ তার রশি ধরে টানে।

পরিষদের সহসভাপতি বুলবুল ইসলাম স্মরণ করেন দীর্ঘ পথচলার নানা প্রাপ্তি ও বেদনার কথা। তাঁর কণ্ঠে উচ্চারিত হয় এক বিশ্বজনীন উদ্বেগ। মানবিকতার সংকট এখন বৈশ্বিক, আর এর উত্তরণও মানুষকেই খুঁজে নিতে হবে।

সাধারণ সম্পাদক লিলি ইসলাম সংস্কৃতিকে দেখেন মূল্যবোধ পুনর্গঠনের শক্তি হিসেবে। বিশ্বায়নের চাপে যখন শিকড় হারানোর ভয় বাড়ছে, তখন রবীন্দ্রচর্চা হয়ে উঠতে পারে আত্মপরিচয়ের পুনর্দাবির এক গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম।

সভাপতি মফিদুল হক জোর দেন সংগীত শিক্ষার প্রাতিষ্ঠানিকীকরণের ওপর। তাঁর মতে, সংগীতকে শিক্ষাব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত করতে না পারলে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম সাংস্কৃতিক ভিত্তি থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়বে।

দুই দিনের এই আয়োজনে রয়েছে সংগীত, আবৃত্তি, নৃত্য, গীতি আলেখ্য ও আলোচনা। সমাপনী দিন আজ শনিবার সকাল ৯টায় কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে পুষ্পস্তবক অর্পণ করা হবে। এর পরই শুরু হবে প্রতিনিধি সম্মেলন। থাকবে ‘বিদ্যালয়ে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা ও সংগীত’ শীর্ষক সেমিনার। এতে অংশ নেবেন শিক্ষাবিদ অধ্যাপক সৈয়দ আকরম হোসেনসহ বিশিষ্টজন। সংস্কৃতিচর্চায় অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে সৈয়দ আকরম হোসেনের হাতে তুলে দেওয়া হবে রবীন্দ্রপদক। প্রধান অতিথি থাকবেন নাট্যজন ফেরদৌসী মজুমদার। সন্ধ্যায় সংগীত ও নৃত্যানুষ্ঠান এবং আবৃত্তি ও জাতীয় সংগীতের মধ্য দিয়ে অনুষ্ঠান শেষ হবে। 

এই সম্মেলনের শিকড়ও ইতিহাসে প্রোথিত। ১৯৭৯ সালে প্রয়াত শিল্পী জাহিদুর রহিমের স্মৃতিকে ধারণ করে শুরু হওয়া উদ্যোগই তিলে তিলে বিস্তৃত হয়েছে জাতীয় পর্যায়ে। বর্তমানে সংগঠনের ৮২টি সক্রিয় শাখা দেশজুড়ে সংস্কৃতির ধারাকে এগিয়ে নিচ্ছে।

আরও পড়ুন

×