ধানমন্ডি লেক
ইট-পাথরের শহরে জীববৈচিত্র্যের পাঠ
রাজধানীর ধানমন্ডি লেকে গতকাল শুক্রবার পরিবেশবিষয়ক কর্মশালায় আমেরিকান ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশের সাংবাদিকতা ও গণযোগাযোগ বিভাগের শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা সমকাল
সমকাল প্রতিবেদক
প্রকাশ: ১১ এপ্রিল ২০২৬ | ০৮:৫১
| প্রিন্ট সংস্করণ
ঢাকার কংক্রিটের অবিরাম বিস্তারের মাঝেও কোথাও কোথাও এখনও নীরবে শ্বাস নেয় প্রকৃতি। শহরের সেই বিরল সবুজ নিঃশ্বাসগুলোর একটি হলো ধানমন্ডি লেক। যেখানে নগরজীবনের কোলাহল ভেদ করে এখনও টিকে আছে পাখির ডানা ঝাপটানোর শব্দ, জলরাশির মৃদু ঢেউ, আর বৃক্ষের ছায়াঘেরা প্রশান্তি। সেই প্রাকৃতিক পরিসরকেই এবার পাঠশালায় রূপ দিল আমেরিকান ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশের (এআইইউবি) সাংবাদিকতা ও গণযোগাযোগ বিভাগ।
গতকাল শুক্রবার সকাল সাড়ে ৮টা থেকে দুপুর ১টা পর্যন্ত ‘নেচার ইন দ্য সিটি-ব্রিজিং লার্নিং অ্যান্ড প্র্যাকটিস থ্রু এ বায়োডাইভারসিটি ওয়াক’ শীর্ষক কর্মশালাটি ছিল এক অনন্য শিক্ষাযাত্রা। পরিবেশ সাংবাদিকতা কোর্সের স্নাতক পর্যায়ের শিক্ষার্থীদের জন্য এটির আয়োজন করা হয়। এর মূল লক্ষ্য, শ্রেণিকক্ষের তাত্ত্বিক জ্ঞানকে বাস্তব অভিজ্ঞতার সঙ্গে যুক্ত করা।
আয়োজনটির নেতৃত্ব দেন বিভাগের সহকারী অধ্যাপক আফরোজা সোমা। তাঁর ভাষায়, নগরের ভেতরে লুকিয়ে থাকা জীববৈচিত্র্যের সমৃদ্ধিকে নতুন প্রজন্মের সামনে তুলে ধরা এবং তাদের মধ্যে পরিবেশ নিয়ে দায়বদ্ধতা তৈরি করাই এই উদ্যোগের প্রধান উদ্দেশ্য।
ঘনবসতিপূর্ণ ঢাকায় ধানমন্ডি লেক কেবল একটি জলাশয় নয়, এটি এক ক্ষুদ্র কিন্তু জীবন্ত বাস্তুতন্ত্র। গবেষণায় দেখা গেছে, এখানে অন্তত ৫৭ প্রজাতির পাখির বসবাস। যা রাজধানীর মধ্যে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ পাখিবৈচিত্র্যের স্থান হিসেবে একে বিশেষভাবে চিহ্নিত করে। লেকঘেরা বৃক্ষরাজি, দেশীয় গাছপালা, ঝোপঝাড় ও জলজ উদ্ভিদ মিলে তৈরি করেছে একটি স্বয়ংসম্পূর্ণ প্রাকৃতিক আবাসস্থল।
তবে এই প্রাকৃতিক সম্পদ আজ বহুমাত্রিক সংকটে জর্জরিত। পানি ও প্লাস্টিক দূষণ, শব্দ ও আলোক দূষণ– সব মিলিয়ে লেকের পরিবেশ ক্রমেই ঝুঁকির মুখে পড়ছে। এমন প্রেক্ষাপটে এই ধরনের উদ্যোগ হয়ে উঠছে সময়োপযোগী ও জরুরি।
বায়োডাইভারসিটি ওয়াকের অন্যতম আকর্ষণ ছিল অভিজ্ঞদের সরাসরি অংশগ্রহণ। বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কারপ্রাপ্ত প্রকৃতিবিষয়ক লেখক মোকরাম হোসেন শিক্ষার্থীদের হাতে-কলমে দেশীয় গাছ ও ফুল চেনান। তিনি বলেন, শুধু গাছ লাগালেই হবে না; জীববৈচিত্র্য রক্ষায় দেশীয় প্রজাতির উপস্থিতি নিশ্চিত করা অপরিহার্য। তাঁর ভাষায়, দেশে প্রায় সাড়ে পাঁচ হাজার উদ্ভিদ প্রজাতি থাকলেও নগর পরিকল্পনায় তাদের যথাযথ স্থান দেওয়া হয় না।
এই বায়োডাইভারসিটি ওয়াক কেবল এক দিনের কর্মসূচি নয়, এটি একটি দৃষ্টিভঙ্গির সূচনা। যেখানে নগরের ভেতরেই খুঁজে নেওয়া হচ্ছে ভবিষ্যতের শিক্ষা, বইয়ের পাতার বাইরে প্রকৃতিই হয়ে উঠছে প্রধান শিক্ষক।
স্থাপত্যের সঙ্গে প্রকৃতির সম্পর্ক নিয়ে কথা বলেন মোহাম্মদ এমরান হোসেন। হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয় থেকে শিক্ষালাভ করে আন্তর্জাতিক পরিসরে কাজের অভিজ্ঞতা থাকা এই স্থপতি তুলে ধরেন, কীভাবে টেকসই নগর পরিকল্পনার মাধ্যমে মানুষ ও প্রকৃতির সহাবস্থান নিশ্চিত করা সম্ভব।
এই আয়োজনের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক ছিল পরিবেশ সাংবাদিকতার ব্যবহারিক শিক্ষা। সাংবাদিক সাদিকুর রহমান মিথুন, মোস্তফা ইউসুফ ও সামসুর রহমান আদিল শিক্ষার্থীদের দেখান, কীভাবে অনুসন্ধানী প্রতিবেদন তৈরির মাধ্যমে পরিবেশ দূষণকারীদের জবাবদিহির আওতায় আনা যায়। তাদের অভিজ্ঞতা থেকে বার্তা উঠে আসে– পরিবেশ সাংবাদিকতা কেবল তথ্য পরিবেশন নয়, বরং এটি এক ধরনের দায়বদ্ধ নাগরিক চর্চা।
আয়োজনে যুক্ত ছিলেন আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন ভিজ্যুয়াল শিল্পী কামরুজ্জামান স্বাধীন। তাঁর প্রতিষ্ঠিত গিদ্রী বাউলী আর্টস ফাউন্ডেশনস গ্রামীণ প্রেক্ষাপটে শিল্প ও পরিবেশের সংলাপ তৈরি করছে। অনুষ্ঠানের মিডিয়া পার্টনার হিসেবে ছিল সময় টিভি ও দৈনিক সমকাল।
- বিষয় :
- ধানমন্ডি
