১০ ঘণ্টায় ৩ দুর্ঘটনা, যানজটে স্থবির ঢাকার একাংশ
ফিলিং স্টেশনের আশপাশের অবস্থা অসহনীয়
যানজটে প্রায় স্থবির হয়ে পড়েছে রাজধানীর সড়কগুলো। ছবি-সাজ্জাদ নয়ন
সমকাল প্রতিবেদক
প্রকাশ: ১৫ এপ্রিল ২০২৬ | ২১:৫৫
১০ ঘণ্টার ব্যবধানে রাজধানীর তেজগাঁও এলাকায় তিনটি দুর্ঘটনার কারণে বুধবার দিনভর যানজটে প্রায় স্থবির হয়ে পড়ে ঢাকার একাংশ। আজ সকাল ৮টার দিকে এফডিসির সামনে রেইনবো ক্রসিংয়ে এক্সপ্রেসওয়ে থেকে নামতে গিয়ে নিয়ন্ত্রণ হারায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের বহনকারী বিআরটিসির একটি বাস। দোতলা বাস হওয়ায় রাজারবাগ পুলিশ লাইন্স থেকে বড় রেকার এনে সেটি সরাতে প্রায় ৫০ মিনিট সময় লেগেছে। এসময় এক্সপ্রেসওয়ে কোনো গাড়ি নামতে পারেনি। আবার হাতিরঝিল থেকে রেইনবো ক্রসিং হয়ে কোনো যানবাহন চলাচল করা সম্ভব হয়নি। এ কারণে পহেলা বৈশাখের পর প্রথম কর্মদিবসে তেজগাঁও শিল্পাঞ্চল, হাতিরঝিল, লাভরোড, মহাখালী, ফার্মগেটম সাতরাস্তাসহ আশপাশ এলাকায় অসহনীয় যানজট তৈরি হয়।
এদিকে দুর্ঘটনার প্রায় এক ঘণ্টা পর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাস সরিয়ে নেওয়ার পর ১১টার দিকে একই ক্রসিংয়ে আরেকটি মাইক্রোবাস নিয়ন্ত্রণ হারায়। এ কারণে ওই ক্রসিংয়ের কয়েকটি লেনে বেশ কিছু সময় যান চলাচল বন্ধ থাকে। ক্রেন দিয়ে সেটি সরানোর পর পরিস্থিতি কিছুটা উন্নতি হতে থাকে। তবে দুর্ঘটনার জের ধরে সারা দিন অত্যন্ত ধীর গতিতে আশপাশের সড়কে গাড়ি চলাচল করে।
এছাড়া আজ সন্ধ্যার দিকে তেজগাঁও এলাকার লাভরোডের দিক থেকে ফ্লাইওভার হয়ে এক্সপ্রেসওয়েতে ওঠার সময় আজমেরি পরিবহনের একটি বাস বিকল হয়ে পড়ে। এতে ওই সড়কে যানচলাচল বন্ধ হয়ে যায়। এরপর বিকল বাস রেকার দিয়ে সরানো হয়।
পুলিশের তেজগাঁও ট্রাফিক বিভাগের ডিসি রফিকুল ইসলাম সমকালকে বলেন, একই দিনে তিনটি দুর্ঘটনার কারণে তেজগাঁও শিল্পাঞ্চল ও আশপাশের যানজটের ভোগান্তি তৈরি হয়। এর পাশাপাশি পেট্রোল পাম্পে তেলের জন্য গাড়ির সারিও দুর্ভোগ কিছুটা বাড়িয়ে তুলছে। কোথাও অস্বাভাবিক পরিস্থিতি তৈরি হলে তাৎক্ষনিক প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করে পরিস্থিতি সহনীয় রাখার চেষ্টা করা হয়।
রাজধানীতে যানজট ঢাকাবাসীর জন্য নতুন নয়। কিন্তু আজ বুধবার তা হয়ে উঠেছিল আরও অসহনীয়। এমনিতেই প্রচণ্ড গরম। তারপর রাস্তা দখল করে তেলের পাম্পগুলো ঘিরে যানবাহনের সারি। পহেলা বৈশাখের পর প্রথম কর্মদিবসে তা আরও ভোগান্তির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছিল নগরবাসীর জন্য। ১০ মিনিটের গন্তব্য পাড়ি দিতে সময় গড়িয়ে গেছে ঘণ্টারও বেশি।
বুধবার দিনভর তেজগাঁও শিল্পাঞ্চল এলাকায় তীব্র যানজট ছিল। জ্বালানি তেলের জন্য গাড়ির দীর্ঘ সারি ও তেজগাঁও ট্রাক স্ট্যান্ডে যানবাহনের এলোমেলো জট ভোগান্তি আরও বাড়িয়েছে। অনেককে গাড়ি থেকে নেমে পায়ে হেঁটে গন্তব্যের উদ্দেশ্যে যাত্রা করতে দেখা যায়। রাত পর্যন্ত দুর্ভোগের একই দৃশ্য ছিল।
এমনিতেই দেশে চলছে জ্বালানী সংকট। সেই সুযোগে এমনিতেই রাইড শেয়ার চালকরা বাড়তি ভাড়া আদায় করছেন। মড়ার ওপর খাড়ার ঘা হিসেবে যানজট যুক্ত হওয়ায় যাত্রীদের গুণতে হয়েছে আরও বাড়তি অর্থ।
সরজমিনে ক্রসিং সিগনালগুলোতে দেখা গেছে তীব্র যানজট। আর যেসব এলাকায় ফিলিং স্টেশন আছে, তার চারপাশ ঘিরে কেবলই বিভিন্ন যানবাহনের গাদাগাদি করে দাঁড়িয়ে থাকার দৃশ্য দেখা গেছে। এতে যানচলাচলের জন্য ব্যবহারযোগ্য মূল সড়কের প্রশস্ততা অনেক কমে যায়। ফলে কেউই সময়মতো গন্তব্যে পৌঁছতে পারেনি।
নগরবাসী বলছেন, জ্বালানি সংকটকে ঘিরে রাজধানীর বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ সড়ক ও পয়েন্টে সৃষ্ট পরিস্থিতি জনজীবনকে বিপর্যস্ত করে তুলেছে। যাত্রাবাড়ী, মতিঝিল, গুলিস্তান, শাহবাগ, মহাখালী, মিরপুর, তেজগাঁও, খিলক্ষেতসহ প্রায় প্রতিটি এলাকায় ফিলিং স্টেশনকেন্দ্রিক দীর্ঘ যানবাহনের সারি বাড়তি যানজটের জন্ম দিচ্ছে।
ট্রাফিক ব্যবস্থাপনার সঙ্গে সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ফিলিং স্টেশন ব্যবস্থাপনায় সমন্বয়ের অভাব এবং সড়ক ব্যবহারে শৃঙ্খলার ঘাটতি এই সংকটকে আরও তীব্র করে তুলছে। নির্দিষ্ট লেন বা আলাদা সারি ব্যবস্থাপনা না থাকায় জ্বালানির জন্য অপেক্ষমাণ যানবাহন সরাসরি মূল সড়কে প্রভাব ফেলছে।
পশ্চিম শেওড়াপাড়ার বাসিন্দা বেসরকারি চাকরিজীবী সারোয়ার হোসেন বলেন, অন্যান্য দিন সকাল ৯টায় রওনা দিয়ে ১০টার ভেতরেই আফতাবনগরে অফিসে পৌঁছে যাই। কিন্তু আজকে অফিসে পৌঁছাতে প্রায় পৌনে ১১টা বেজেছে এই যানজটের জন্য। একই ধরনের অভিযোগ করেন খিলক্ষেত এলাকার এক শিক্ষার্থী ইয়াকুব হোসেন। তিনি বলেন, প্রতিদিনই ক্লাসে যেতে দেরি হচ্ছে। ফিলিং স্টেশনের সামনে গাড়ির লাইন এমনভাবে থাকে যে কোনটা রাস্তা আর কোনটা লাইন বোঝার উপায় থাকে না। ট্রাফিক পুলিশ থাকলেও তারা অনেক সময় শুধু দাঁড়িয়ে থাকে, সক্রিয়ভাবে কিছু করতে দেখা যায় না।
যাত্রীদের অভিযোগ, রাস্তায় গাড়িগুলো এলোমেলোভাবে দাঁড়িয়ে থাকে, কোনো শৃঙ্খলা নেই। ট্রাফিক পুলিশকে অনেক সময় দেখাই যায় না, আর থাকলেও পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনার চেষ্টা খুব একটা চোখে পড়ে না।
ঢাকা–গাজীপুর রুটে চলাচলকারী অনাবিল পরিবহনের সুপারভাইজার লিয়াকত হক বলেন, জ্বালানি সংকটজনিত এই পরিস্থিতিতে তারাও কম ভোগান্তিতে নেই। একদিকে যানবাহন সচল রাখতে জ্বালানি নেওয়া বাধ্যতামূলক, অন্যদিকে ফিলিং স্টেশনের দীর্ঘ লাইনে দাঁড়ালেই সড়কে তৈরি হচ্ছে বাড়তি চাপ; এই দ্বিমুখী সংকটে পড়েছেন তারাও। তেল না নিলে গাড়ি চালানো সম্ভব না। আবার লাইনে দাঁড়ালেও রাস্তা বন্ধ হয়ে যায়। কিন্তু করার তো কিছু নেই।
- বিষয় :
- রাজধানী
- সড়ক দুর্ঘটনা
- যানজট
- তেলের ডিপো
