ঈদের দ্বিতীয় দিনেও ঢাকা ছাড়ছেন ঘরমুখো মানুষ, রাস্তাঘাট ফাঁকা
শুক্রবার বিকালে রাজধানীর তেজগাঁও অঞ্চলের একটি ফাঁকা সড়কের চিত্র। ছবি: সমকাল/আকাশ সমদ্দার
অমরেশ রায়
প্রকাশ: ২৯ মে ২০২৬ | ১৮:৩১
ঈদুল আজহার দ্বিতীয় দিন শুক্রবারও রাজধানীর রাস্তাঘাট অনেকটাই ফাঁকা। প্রিয়জনদের সঙ্গে ঈদের আনন্দ ভাগাভাগি করে নিতে বেশিরভাগ নগরবাসী আগেই ঢাকা ছেড়েছেন। এ কারণে রাস্তায় মানুষজনের ভিড় কম। শহরের সড়কে নেই চিরচেনা যানজট বা গাড়ির হর্নের শব্দ। ফলে স্বস্তিতে রাস্তায় চলাফেরা করতে পারছেন নগরবাসী।
তবে এদিনও কিছু মানুষ ঈদ উদযাপনের জন্য গ্রামের পথে ছুটেছেন। পরিবার-পরিজন নিয়ে নগর ছেড়েছেন হাজারো মানুষ। ঘরমুখী এসব মানুষের ভিড়ে সকালের দিকে নগরীর বাস টার্মিনাল ও গুরুত্বপূর্ণ মোড়গুলোতে কিছুটা ভিড় দেখা যায়। ঘরমুখী মানুষের চাপ ছিল কমলাপুর রেলস্টেশন ও সদরঘাট লঞ্চ টার্মিনালেও। দুপুরের পর এসব জায়গায়ও নীরবতা নেমে আসে।
শুক্রবার সকাল থেকে বিকেল পর্যন্ত রাজধানীর মিরপুর, শেওড়াপাড়া, ফার্মগেট, কারওয়ান বাজার, শাহবাগ, পল্টন, গুলিস্তান, মতিঝিল, নিউমার্কেট, সায়েন্স ল্যাবরেটরি, ধানমন্ডি, রামপুরা ও মালিবাগসহ বিভিন্ন এলাকা ঘুরে এমন চিত্র দেখা যায়। ঈদের দিনের মতো এদিনও সড়কে যান চলাচল তুলনামূলকভাবে কম ছিল। বাস, সিএনজি, অটোরিকশা ও মোটরসাইকেলের সংখ্যাও ছিল স্বাভাবিক দিনের তুলনায় অনেক কম।
অন্যদিকে ফাঁকা সড়কে স্বস্তিতে চলাচল করছেন রাজধানীতে অবস্থান করা মানুষ। কোথাও কোথাও শিশু-কিশোরদের রাস্তায় খেলাধুলা করতেও দেখা গেছে।
ঈদের ছুটির পুরো সময়জুড়ে রাজধানী এমন শান্ত ও ফাঁকা পরিবেশ থাকবে বলে জানান সংশ্লিষ্টরা। ঈদুল আজহা উপলক্ষে সরকার ঘোষিত সাত দিনের ছুটি শেষে আগামী সোমবার থেকে ঢাকা মহানগর আবারও কর্মব্যস্ত ও জমজমাট হয়ে উঠবে বলেও মনে করছেন তাঁরা।
এদিকে, ঈদের দিন বন্ধ রাখার পর শুক্রবার দুপুরের পর মেট্রোরেলের চলাচল শুরু হয়। কিছু মানুষ এই গণপরিবহনেও যাতায়াত করেছেন এদিন। তবে মেট্রোরেলেও মানুষের ভিড় ছিল স্বাভাবিক দিনের তুলনায় অনেক কম। এ কারণে স্বস্তি ও নির্ঝঞ্ঝাট যাত্রা উপভোগ করছেন যাত্রীরা।
শেওড়াপাড়ায় বিহঙ্গ পরিবহনের চালক মো. ইসমাইল বলেন, ঈদের দিন সকাল থেকে রাত অবধি তাদের পরিবহনের বাসগুলো অনেকটাই ফাঁকা চলাচল করেছে। শুক্রবার অনেকে ঈদ করতে গ্রামে যাওয়ার কারণে সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত যাত্রীর ভিড় কিছুটা ছিল। বিকেলের পর আবারও প্রায় ফাঁকা বাস নিয়ে আসা-যাওয়া করতে হয়েছে।
সিএনজিচালক আবদুর রহমান জানান, ঈদের পরদিন বাড়তি আয়ের আশায় রাস্তায় নেমেছেন তিনি। সকাল থেকে অনেক যাত্রীকে বাসস্ট্যান্ড ও রেলস্টেশনে আনা-নেওয়া করেছেন। সব মিলিয়ে রোজগার ভালোই হয়েছে।
এদিনও রাস্তায় যানবাহনের সংখ্যা কম থাকলেও সেখানে বাড়তি ভাড়া আদায়ে অস্বস্তিকর পরিস্থিতি দেখা গেছে। ঈদ বকশিশের কথা বলে এই বাড়তি ভাড়া নিয়েছে পরিবহনগুলো। সিএনজি ও অটোরিকশাও এর ব্যতিক্রম ছিল না। বাড়তি ভাড়া নিয়ে যাত্রী ও পরিবহন শ্রমিকদের বাকবিতণ্ডাও দেখা গেছে।
ফার্মগেট এলাকায় কথা হয় শিকড় পরিবহনের যাত্রী বেসরকারি চাকরিজীবী আবদুল মোতালেবের সঙ্গে। তিনি জানান, স্বাভাবিক দিনে মিরপুর-১০ থেকে পল্টন পর্যন্ত ভাড়া ২৫ টাকা নেওয়া হলেও আজ ঈদের কথা বলে ৩৫-৪০ টাকা নেওয়া হচ্ছে। এরপরও কারও কারও কাছ থেকে বকশিশ দাবি করা হচ্ছে। বাড়তি ভাড়া না দেওয়া হলে রীতিমতো দুর্ব্যবহারও করছেন বাসের স্টাফরা।
এমন অভিযোগ অস্বীকার করে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একই পরিবহনের হেলপার জানান, সারা বছর যাত্রীদের আনা-নেওয়ায় কঠোর পরিশ্রম করেন তাঁরা। এর ওপর অনেক গরিব যাত্রীকে কম ভাড়া, ক্ষেত্রবিশেষে মানবিক কারণে বিনা ভাড়ায়ও গন্তব্যে পৌঁছে দেন তাঁরা। এখন উৎসবের দিন হওয়ায় তাঁরা বকশিশ দাবি করতেই পারেন। সেটাও আবার যারা স্বেচ্ছায় দেন, তাদের কাছ থেকেই নেওয়া হচ্ছে। কাউকে জোর করা হচ্ছে না।
তাঁর দাবি, ঈদে দূরের যাত্রায় পরিবহনগুলোতে স্বাভাবিক ভাড়ার চেয়ে দ্বিগুণ ভাড়া আদায় করা হয়। সেটা যদি যাত্রীদের কাছে সহনীয় হয়, তাহলে নগর পরিবহনে সামান্য ৫-১০ টাকা বেশি দিতে কষ্ট হলে তো আর কিছু বলার থাকে না।
রাস্তাঘাট ফাঁকা থাকলেও ঈদের দ্বিতীয় দিনেও অনেক মানুষ ঈদ করতে গ্রামমুখী হওয়ায় সকালের দিকে রাস্তায় চলাচলরত বাস ও সিএনজিগুলোতে যাত্রীদের কিছুটা ভিড় দেখা গেছে। অনেকেই পরিবার-পরিজনসহ এদিন ঢাকা ছেড়েছেন। কর্মব্যস্ত নগরীতে ঈদের ছুটির কারণে যানজট কম থাকায় স্বস্তি নিয়েই গ্রামের পথে রওনা হয়েছেন তারা। বিকেলের দিকে এই ভিড়ও কমে আসায় রাস্তাঘাট আরও খানিকটা ফাঁকা হয়ে যায়।
মিরপুর থেকে স্বাধীন পরিবহনের একটি বাসে চড়ে সপরিবারে গ্রামের বাড়ির উদ্দেশে রওনা হয়েছিলেন ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী আনোয়ার হোসেন। এই বাসে মাওয়া পর্যন্ত যাবেন। এরপর ভিন্ন বাসে পদ্মা সেতু পার হয়ে গ্রামের বাড়ি গোপালগঞ্জের কাশিয়ানী যাবেন।
তিনি জানান, এবার ঈদের দিন ঢাকায় থেকে কোরবানি দিয়েছেন। আর গ্রামে থাকা মা-বাবা ও অন্য স্বজনদের সঙ্গে ঈদের আনন্দ ভাগাভাগি করার ইচ্ছা নিয়েই ঈদের দ্বিতীয় দিন পথে বেরিয়েছেন। তবে রাস্তায় যানজট ও ভিড় না থাকায় দুর্ভোগবিহীনভাবে গ্রামে পৌঁছাতে পারবেন বলে তাঁর প্রত্যাশা।
এদিকে, ঈদকে ঘিরে রাজধানীতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর বাড়তি নিরাপত্তা ব্যবস্থাও লক্ষ্য করা গেছে। নগরীর গুরুত্বপূর্ণ সড়ক ও মোড়গুলোতে দায়িত্ব পালন করতে দেখা যায় পুলিশ সদস্যদের। সন্ধ্যার পর এসব সড়কে টহল দিতে দেখা গেছে পুলিশ ও র্যা়বের গাড়িগুলোকে। সন্দেহ হলেই পথচারী ও গাড়ি থামিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ ও তল্লাশিও করেছেন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা। এবারের ঈদে রাজধানীতে এখন পর্যন্ত বড় ধরনের কোনো অপ্রীতিকর পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়নি।
ঈদের ছুটিতে ট্রাফিক পুলিশের কর্মব্যস্ততা কিছুটা কমলেও সীমিতসংখ্যক সদস্যকে সড়কে দায়িত্ব পালন করতে দেখা গেছে। যেসব এলাকায় ট্রাফিক পুলিশ উপস্থিত নেই, সেখানে চালকরা স্বয়ংক্রিয় ট্রাফিক সিগন্যাল মেনেই যানবাহনকে চলাচল করতে হচ্ছে। সিগন্যাল বাতি অনুসরণ করে নিয়ম মেনে গাড়ি চলাচল করতে দেখা যায় অধিকাংশ চালককে। ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ (ডিএমপি) ও ট্রাফিক বিভাগ থেকে কয়েকটি এলাকায় এআই প্রযুক্তি দিয়ে যানবাহনের চলাচলে কঠোর মনিটরিং ব্যবস্থা চালু হওয়ায় এমন পরিস্থিতি দেখা যাচ্ছে রাজধানীতে।
