আদ্-দ্বীনে ছয় নবজাতকের মৃত্যু
মন্ত্রীর হুঁশিয়ারি, ক্ষতিপূরণের প্রস্তাব হাসপাতালের
ছয় শিশুর পরিবারকে চাকরি বিনামূল্যে চিকিৎসার প্রস্তাব
সমকাল প্রতিবেদক
প্রকাশ: ০৭ জুন ২০২৬ | ০৮:২৯ | আপডেট: ০৭ জুন ২০২৬ | ১০:৫২
| প্রিন্ট সংস্করণ
রাজধানীর আদ্-দ্বীন মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ছয় নবজাতকের মৃত্যুর ঘটনা তদন্তে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের অবহেলার প্রমাণ পাওয়ার পর কঠোর অবস্থানের কথা জানিয়েছেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন। তিনি বলেছেন, চ্যালেঞ্জ ছুড়ে লাভ নেই। হাসপাতালকে দেওয়া কারণ দর্শানোর (শোকজ) নোটিশ আইন অনুসারেই জারি করা হয়েছে। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে সন্তোষজনক জবাব না পেলে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
গতকাল শনিবার সংবাদ সম্মেলনে স্বাস্থ্যমন্ত্রী আরও বলেন, হাসপাতাল স্থাপনা-সংক্রান্ত বিধিমালা, আইনের বিভিন্ন ধারা এবং প্রাসঙ্গিক বিধিবিধান পর্যালোচনা করে সরকার পদক্ষেপ নিচ্ছে। তিনি জানান, হাসপাতালটির জবাব পাওয়ার পর পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
গত ২৭ মে আদ্-দ্বীন মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ছয় নবজাতকের মৃত্যু হয়। এ ঘটনায় স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তদন্ত কমিটি হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের অবহেলা ও বিভিন্ন অনিয়মের কথা উল্লেখ করে প্রতিবেদন জমা দেয়। প্রতিবেদনের ভিত্তিতে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর হাসপাতালকে কারণ দর্শানোর নোটিশ দিয়ে জানতে চেয়েছে, কেন তাদের লাইসেন্স বাতিল করা হবে না।
হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের দাবি, স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের দেওয়া শোকজ নোটিশ আইনসম্মত নয়। ভুক্তভোগী পরিবারগুলোর পক্ষে মধ্যস্থতাকারী আইনজীবী শিশির মনির গতকাল এক সংবাদ সম্মেলনে বলেন, নোটিশটি সংশ্লিষ্ট আইনের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয় এবং হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ এ বিষয়ে আইনি প্রক্রিয়ায় নিজেদের অবস্থান তুলে ধরবে। তবে এ দাবির জবাবে স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন, নোটিশটি যথাযথ আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণ করেই দেওয়া হয়েছে। ছয় নবজাতকের মৃত্যু গুরুতর ঘটনা। এ ঘটনায় মামলা হয়েছে। সংবাদ সম্মেলনে স্বাস্থ্যমন্ত্রী আরও জানান, আদ্-দ্বীন তিন বছর ধরে অগ্নিনিরাপত্তা-সংক্রান্ত প্রয়োজনীয় অনুমোদন ছাড়া পরিচালিত হয়ে আসছে। এ বিষয়ে ফায়ার সার্ভিস, পরিবেশ অধিদপ্তরসহ সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলো নিজ নিজ আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেবে।
এদিকে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ নবজাতকদের মৃত্যুকে ‘অপ্রত্যাশিত অবহেলার’ ফল বলে উল্লেখ করেছে। তাদের গঠিত অভ্যন্তরীণ তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনে একজন নার্স ও একজন কর্মচারীর পেশাগত দায়িত্ব পালনে ঘাটতির কথা উল্লেখ করা হয়েছে। এ ঘটনায় ওই দুই কর্মীকে সাময়িক বরখাস্তও করা হয়েছে।
গতকাল রাজধানীর একটি হোটেলে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে আইনজীবী শিশির মনির জানান, ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর জন্য হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ আজীবন বিনামূল্যে চিকিৎসাসেবা, উপযুক্ত চাকরির সুযোগ এবং ক্ষতিপূরণ দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। ভুক্তভোগী পরিবারগুলো দায়ীদের শাস্তি চাইলেও হাসপাতালের চিকিৎসাসেবা বন্ধ হোক, তা চায় না।
নবজাতকের একজনের বাবা ও মামলার বাদী হাবিবুর রহমানও একই ধরনের বক্তব্য দেন। তিনি বলেন, আমরা দায়ীদের শাস্তি চাই। কিন্তু হাসপাতাল বন্ধ হয়ে সাধারণ মানুষের ভোগান্তি হোক, সেটা চাই না। এক প্রশ্নের জবাবে তিনি হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে অতিরিক্ত আর্থিক সুবিধা পাওয়ার অভিযোগ অস্বীকার করেন। তাঁর দাবি, ঘোষিত সুবিধাগুলো ছাড়া তারা অন্য কোনো অর্থ নেননি। সংবাদ সম্মেলনের এক পর্যায়ে সাংবাদিকদের ওপর হামলার অভিযোগ এবং কেন শুধু শিশির মনির বক্তব্য দিচ্ছেন– এমন প্রশ্ন ওঠায় উত্তেজনাপূর্ণ পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। পরে আদ্-দ্বীন মেডিকেল কলেজের গভর্নিং বডির চেয়ারম্যান আব্দুস সবুর সাংবাদিকদের কয়েকটি প্রশ্নের জবাব দেন।
স্বাস্থ্য খাতের অনিয়ম তদন্তের নির্দেশনা চেয়ে রিট
আদ্-দ্বীন হাসপাতালে ছয় শিশুর মৃত্যুর ঘটনা এবং সারাদেশে স্বাস্থ্যসেবা খাতের বিভিন্ন অনিয়ম ও অব্যবস্থাপনা তদন্তের নির্দেশনা চেয়ে জনস্বার্থে হাইকোর্টে রিট করা হয়েছে। রিটে বেসরকারি হাসপাতাল, ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারগুলোয় বিদ্যমান অনিয়ম, চিকিৎসায় অবহেলা এবং রোগীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নিষ্ক্রিয়তাকে চ্যালেঞ্জ করা হয়েছে।
ন্যাশনাল লইয়ার্স কাউন্সিলের চেয়ারম্যান সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী এস. এম. জুলফিকার আলী জুনু গতকাল রিট আবেদনটি করেন। গতকাল শনিবার তিনি সমকালকে বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।
রিটে দেশের স্বাস্থ্যসেবা খাতে জবাবদিহি, স্বচ্ছতা ও রোগীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে আদালতের কাছে নিদের্শনা চাওয়া হয়েছে। রিটে স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের সচিব, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সচিব, আইন মন্ত্রণালয়ের সচিব, স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক (ডিজি), পুলিশ মহাপরিদর্শক (আইজিপি) ও র্যাবের মহাপরিচালককে (ডিজি) বিবাদী করা হয়েছে।
