ঢাকা বুধবার, ২২ জুলাই ২০২৬

ট্র্যাজেডির ১ বছর

মাইলস্টোনে ‘স্মৃতিতে আমার বন্ধু’

মাইলস্টোনে ‘স্মৃতিতে  আমার বন্ধু’
×

রাজধানীর মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজের দিয়াবাড়ী ক্যাম্পাসে যুদ্ধবিমান দুর্ঘটনায় নিহতদের প্রতি শ্রদ্ধাঞ্জলি নিবেদন করেন শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও অভিভাবকরা। গতকাল মঙ্গলবার সকালে তোলা -সমকাল

 সমকাল প্রতিবেদক

প্রকাশ: ২২ জুলাই ২০২৬ | ০৮:৫২ | আপডেট: ২২ জুলাই ২০২৬ | ০৯:২৬

| প্রিন্ট সংস্করণ

মাইলস্টোন ট্র্যাজেডিতে নিহতদের ছবিসংবলিত দুটি ব্যানার প্রতিষ্ঠানটির স্মৃতিবেদিতে টাঙানো। কালো ব্যানারের ওপর লেখা ছোট ছোট বার্তায় নিহতদের সহপাঠী, শিক্ষক ও স্বজনের নানা স্মৃতি উঠে এসেছে। শোক, শ্রদ্ধা ও ভালোবাসার স্বাক্ষর বহন করছে প্রতি পঙ্তি। একটি ব্যানারের শিরোনাম ‘স্মৃতিতে আমার বন্ধু’। 

রাজধানীর উত্তরার দিয়াবাড়ীতে মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজে বিমানবাহিনীর একটি যুদ্ধবিমান বিধ্বস্ত হয়ে ৩৬ জনের প্রাণহানির ঘটনার প্রথম বার্ষিকী ছিল গতকাল মঙ্গলবার। শিক্ষক, শিক্ষার্থী, অভিভাবক ও কর্মচারী যারা মারা গেছেন, তাদের অনেকের স্বজন এদিন দুর্ঘটনাস্থলে আসেন। পোড়া ক্ষত নিয়ে আসেন অনেক শিক্ষার্থী। মা-বাবা আসেন মর্মান্তিক দুর্ঘটনায় প্রাণ হারানো প্রিয় সন্তানের স্মৃতিবিজড়িত ময়দানে। বিদ্যালয় প্রাঙ্গণের মাটি স্পর্শ করে অভিভাবকরা সন্তানের স্পর্শ খুঁজলেন। বন্ধুরা খুঁজলেন হারিয়ে যাওয়া বন্ধুর স্মৃতি। শোক, শ্রদ্ধা, স্মৃতিচারণা ও দোয়ার মধ্য দিয়ে নিহতদের স্মরণ করেছে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানটি।  

সকালে কলেজের হায়দার আলী ভবনের সামনে স্থাপিত অস্থায়ী স্মৃতিবেদিতে ফুল দিয়ে নিহতদের প্রতি শ্রদ্ধা জানানো হয়। পরে তাদের আত্মার মাগফেরাত কামনায় বিশেষ দোয়া ও মোনাজাত অনুষ্ঠিত হয়। এদিন মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজের সব শাখায় সাধারণ ছুটি ছিল। 

বিদ্যালয় প্রাঙ্গণে নিহত শিক্ষার্থী তানভীর আহমেদের বাবা রুবেল মিয়ার সঙ্গে কথা হয়। তিনি বলেন, ‘আজও সেই দিনের কথা ভুলতে পারি না। সেই দিন সকালে নিজে হাত ধরে ছেলেকে স্কুলে পৌঁছে দিয়েছিলাম। দুপুরে তার নিথর দেহ পেয়েছিলাম। ছোট ছেলেকে স্কুলে আনতে গিয়ে শত শত শিক্ষার্থীর মাঝে তানভীরকে খুঁজি।’ 

নিহত তাসনিম আফরোজ আয়মানের মা আয়েশা আক্তার বলেন, ‘সন্তানের শূন্যতা কি পূরণ হয়। পূরণ হতে পারে না। কোনো পরিবার যেন এমন নির্মম অভিজ্ঞতার মুখোমুখি না হয়।’ 
গতকালের দোয়া মাহফিলে ছিলেন নিহত শিক্ষক মাহেরীন চৌধুরীর স্বামী মুনসুর হেলাল। তিনি বলেন, ‘মাহেরীন শুধু শিক্ষকই ছিলেন না, তিনি ছিলেন একজন মা, বন্ধু, জীবন বাঁচানোর কারিগর।’ 
এ আয়োজনে কথা বলতে গিয়ে বারবার কণ্ঠ ভারী হয়ে আসে মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজের শিক্ষক জেসমিন সুলতানার। তিনি বলেন, ‘সেদিন আমরা খুব কাছ থেকে মৃত্যু দেখেছি। আগুনের ভয়াবহতা দেখেছি। কালো ধোঁয়ায় ঢেকে যাওয়া চারপাশ দেখেছি। দেখেছি বাঁচার জন্য শিশুদের আকুতি, স্বজনদের বুকফাটা কান্না। সেই দৃশ্য কোনো দিন ভুলে থাকার নয়।’ তিনি বলেন, যে শিশুদের একটু আগেই ক্লাসে পড়িয়েছি, মাথায় হাত রেখে বলেছি– মা, আগামীকাল পড়া শিখে আসবে– মুহূর্তের মধ্যে তাদের অনেককেই হারিয়ে ফেললাম। এই কষ্ট শুধু আমাদের নয়, এই কষ্ট পুরো পৃথিবীকে নাড়িয়ে দিয়েছে। 
বক্তব্যের শুরুতেই তিনি গভীর শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করেন প্রয়াত কো-অর্ডিনেটর মাহেরীন চৌধুরী, ডেপুটি কো-অর্ডিনেটর মাহফুজা খাতুন, সহকর্মী মাসুকা এবং দুর্ঘটনায় প্রাণ হারানো শিক্ষার্থীদের। তিনি বলেন, দুর্ঘটনার সেই মুহূর্তে শিক্ষকরা কী করবেন, সেটি ভাবারও সময় পাননি। নিজেদের জীবন নিয়ে না ভেবে তারা শুধু শিক্ষার্থীদের নিরাপদে সরিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করেছেন।

জেসমিন সুলতানা বলেন, ‘আমরা শিক্ষকরা আমাদের সন্তানদের বাঁচাতে আপ্রাণ চেষ্টা করেছি। সেই আত্মত্যাগের সবচেয়ে বড় উদাহরণ রেখে গেছেন মাহেরীন চৌধুরী, মাহফুজা খাতুন ও মাসুকা ম্যাডাম। আমরা তাদের গভীর শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করি।’ 

মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজের প্রতিষ্ঠাতা অধ্যক্ষ কর্নেল (অব.) নুরন্নবী বলেন, ‘আজ আমরা গভীর শোকের সঙ্গে প্রাণ হারানো শিক্ষক, ছোট ছোট শিক্ষার্থী এবং অন্যান্যদের স্মরণ করছি।’ 
দুর্ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী ইংরেজি বিভাগের সহকারী অধ্যাপক মনিরুজ্জামান মোল্লা বলেন, বিমানটি বিধ্বস্ত হওয়ার পর একের পর এক বিস্ফোরণ হচ্ছিল। ৩০ থেকে ৪০ ফুট উঁচু পর্যন্ত আগুনের লেলিহান শিখা ছড়িয়ে পড়ে। চারদিকে শিশুদের আর্তচিৎকার শুনে তিনি তাদের উদ্ধারে ছুটে যান। তবে আগুন দ্রুত ছড়িয়ে পড়ায় কিছুটা পেছনে সরে যেতে বাধ্য হন। ভবনের ফটকের কাছে এসে তিনি কয়েকটি শিশুর মরদেহ দেখতে পান। সেখানে একজন অভিভাবকের মরদেহও পড়ে ছিল। এ সময় নিজের মেয়েকে খুঁজতে গিয়ে তিনি শিক্ষক মাহরীন চৌধুরীকে কয়েকটি শিশুকে ঠেলে নিরাপদ স্থানে পাঠাতে দেখেন। তখন মাহরীন চৌধুরীর শরীরে আগুন জ্বলছিল। 

দুর্ঘটনার পর গত বছরের ২৭ জুলাই ৯ সদস্যের একটি তদন্ত কমিশন গঠন করে অন্তর্বর্তী সরকার। তদন্ত প্রতিবেদনের বরাত দিয়ে সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়, দুর্ঘটনার মূল কারণ পাইলটের উড্ডয়ন ত্রুটি। মাইলস্টোন স্কুলের ভবনটি রাজউকের বিল্ডিং কোড অনুযায়ী অনুমোদিত হয়নি। বিল্ডিং কোড অনুযায়ী ওই ভবনে ন্যূনতম তিনটি সিঁড়ি থাকার কথা ছিল। কিন্তু ছিল মাত্র একটি। তিনটি থাকলে হতাহত আরও কমত। কমিটির প্রধান সুপারিশ ছিল, জননিরাপত্তার স্বার্থে বিমানবাহিনীর সব প্রাথমিক প্রশিক্ষণ ঢাকার বাইরে পরিচালনা করা। 

তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মানুষের ভুলই এই দুর্ঘটনার প্রধান কারণ। তবে পারিপার্শ্বিক বা পরিবেশগত কোনো কারণ হয়তো এই ঘটনাকে ত্বরান্বিত করেছিল। দুর্ঘটনার আগে সিসিটিভি ফুটেজে উড়োজাহাজের সামনের উইন্ডস্ক্রিনে একটি কালো দাগ দেখা যায়। বিমানবাহিনীর অভ্যন্তরীণ তদন্তে বলা হয়, পাখির আঘাত বা বাতাসে ওড়া অন্য কোনো বস্তুর কারণে এমন হতে পারে। তবে এই প্রতিবেদনে দাগটির সঠিক কারণ নিশ্চিত করা হয়নি।

প্রতিবেদনে বলা হয়, পাইলট সম্ভবত কন্ট্রোল স্টিকটি হঠাৎ করে খুব জোরে টেনেছিলেন, যার ফলে বিমানটি গতি হারায় এবং তিনি আর নিয়ন্ত্রণ ফিরে পাননি। 
এ সময় বিমানটির ইঞ্জিন, হাইড্রোলিক বা নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থায় কোনো ত্রুটির সংকেত ছিল না বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়। বিমান ও ইঞ্জিন অনুমোদিত আয়ুষ্কালের মধ্যেই ছিল, নির্ধারিত রক্ষণাবেক্ষণ ও পরিদর্শনও সময়মতো হয়েছিল। আগে থেকে কোনো ত্রুটির কথা কোথাও উল্লেখ ছিল না। ওড়ার আগে পাইলটকেও শারীরিক ও মানসিকভাবে সুস্থ ঘোষণা করা হয়েছিল।
তবে পাইলটের নির্ধারিত ‘ফার্স্ট সোলো-ফ্লাইট’ বা প্রথম একক উড্ডয়ন পরিকল্পনা এবং তাঁর অফিসার কমান্ডিংয়ের নির্দেশনার মধ্যে অসংগতি পেয়েছে কমিশন। মিশন প্রোফাইল অনুযায়ী, পাইলটের দ্বিতীয় সার্কিটের সময় ‘লো গো’ করার কথা ছিল। কিন্তু অফিসার কমান্ডিং তাঁকে ‘ইনিশিয়াল’-এ ফিরে গিয়ে আরেকটি সার্কিট শুরু করার নির্দেশ দেন।

কমিশন তাদের তদন্তে দেখেছে, হায়দার আলী ভবনের একমাত্র সিঁড়ির খুব কাছে বিমানটি আছড়ে পড়ে, যার ফলে আগুন ও ধোঁয়ায় ওই পথটি ব্যবহারের অনুপযোগী হয়ে পড়ে। ভবনটিতে ১৯টি শ্রেণিকক্ষ ছিল, যেখানে ৭৩৭ জন শিক্ষার্থী এবং ৫০ জনের বেশি শিক্ষক ছিলেন। ফায়ার সার্ভিসের মতে ভবনটিতে অন্তত তিনটি সিঁড়ি থাকা প্রয়োজন ছিল। ভবনের করিডোরটি ছিল প্রায় ৪ ফুট চওড়া, যা কমপক্ষে ৬ ফুট হওয়া উচিত ছিল। এ ছাড়া শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের অগ্নিকাণ্ডে করণীয় নিয়ে কোনো প্রাথমিক ধারণা ছিল না। স্কুল কর্তৃপক্ষ হায়দার আলী ভবনের অনুমোদনের কোনো কাগজপত্র কমিশনকে দেখাতে পারেনি। তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়, অন্যান্য ভবনের অনুমোদনের সময় কলেজ কর্তৃপক্ষ এই ভবনটি ভেঙে ফেলার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল, এর পরও সেখানে ক্লাস নেওয়া অব্যাহত রাখা হয়।

আরও পড়ুন

×