মেট্রোরেলের জন্য শেখ হাসিনার কান্নায় জ্বলে ক্ষোভের আগুন
সমকাল প্রতিবেদক
প্রকাশ: ২৫ জুলাই ২০২৬ | ০৮:২৪ | আপডেট: ২৫ জুলাই ২০২৬ | ০৮:৩২
| প্রিন্ট সংস্করণ
ধীরে ধীরে রাজপথে যখন আওয়ামী লীগ ও পুলিশের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠিত হচ্ছিল, সেই সময়ে ক্ষতিগ্রস্ত মেট্রোরেল স্টেশনে গিয়ে শেখ হাসিনার কান্না ক্ষোভের আগুন ফের জ্বালিয়ে দেয়। মধ্য জুলাই থেকে আন্দোলনকারীদের ওপর চালানো নারকীয় হত্যাযজ্ঞ ও দমনের পর, ২০২৪ সালের ২৫ জুলাই প্রথমবারের মতো গণভবন থেকে বের হন তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী। আহতদের দেখতে না গিয়ে, তিনি যান মিরপুর-১০ নম্বরে মেট্রোরেল স্টেশনে। সেখানে গিয়ে কেঁদে কেঁদে বলেন, এই ধ্বংসের বিচার চাই।
চার শতাধিক মানুষের প্রাণহানির পরিবর্তে মেট্রোরেল স্টেশনের ভাঙচুর দেখে প্রধানমন্ত্রীর কান্না দেশবাসীকে চরম ক্ষুব্ধ ও স্তম্ভিত করেছিল। ইন্টারনেট ব্ল্যাকআউট ও সেনা মোতায়েনের কড়া কারফিউর মধ্যে অবরুদ্ধ ছিল পুরো দেশ।
দেশজুড়ে ব্লক রেইড ও গণগ্রেপ্তারের তাণ্ডব
১৮ থেকে ২১ জুলাই পর্যন্ত আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও সরকারি দলের চালানো নারকীয় হত্যায় ছাত্র-জনতা পরের দিনগুলোতে ছত্রভঙ্গ হয়। রাজপথের দখল হারায়। ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের যাত্রাবাড়ী, ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কের উত্তরা সরকারের নিয়ন্ত্রণে থাকায় যান চলাচল স্বাভাবিক ছিল।
এর মধ্যেও চলতে থাকে গণগ্রেপ্তারের ‘ক্র্যাকডাউন’। ২৫ জুলাই বিভিন্ন বাহিনী ঢাকাসহ দেশের প্রতিটি প্রান্তে আন্দোলনকারী শিক্ষার্থী ও সাধারণ মানুষকে গ্রেপ্তার করতে থাকে। এক দিনেই সারাদেশে ১২৮টি মামলায় ৪৫১ জনকে গ্রেপ্তার দেখানো হয়।
রাজধানীর বিভিন্ন এলাকা, বিশেষ করে রামপুরা, বাড্ডা, উত্তরা, যাত্রাবাড়ী ও মোহাম্মদপুরে গভীর রাতে ব্লক রেইড দিয়ে সাধারণ শিক্ষার্থীদের বাসা ও ছাত্রাবাস থেকে তুলে নিয়ে যাওয়া হয়। ঢাকায় সরকারি স্থাপনায় নাশকতার অভিযোগে মহানগরের বিভিন্ন থানায় ২০১টি মামলা দায়ের করে ২৫ জুলাই পর্যন্ত দুই হাজার ২০৯ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল। এই সাঁড়াশি অভিযানে অভিভাবক ও সাধারণ মানুষের মনে চরম আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে।
প্রধানমন্ত্রীর কান্নায় ক্ষোভ
২৫ জুলাই সকাল ১০টার দিকে শেখ হাসিনা মেট্রোস্টেশনে গিয়ে আবেগাপ্লুত হয়ে ক্যামেরার সামনে চোখের জল ফেলেন। অথচ নিহত শত শত শিক্ষার্থী ও সাধারণ মানুষের রক্তের দাগ তখনও শুকায়নি। বহু শিশু এবং কিশোরের পঙ্গুত্বের হাহাকারে বাতাস ভারী ছিল। হাসপাতালগুলোতে তিলধারনের ঠাঁই ছিল না পুলিশ ও আওয়ামী লীগের গুলিতে আহতদের ভিড়ে। চোখ হারানো শত শত মানুষ তখন হাসপাতালে কাতরাচ্ছেন।
সেই মানুষের প্রাণের চেয়ে মেট্রোরেল ক্ষতিগ্রস্ত হওয়াকে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী বেশি গুরুত্ব দেওয়ায়, একে নির্মম ও নিষ্ঠুর তামাশা হিসেবে আখ্যা দেওয়া হয়। আন্দোলনকারী সমন্বয়ক ও সাধারণ মানুষ ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, জীবনের চেয়ে উন্নয়ন বড়। এই ক্ষোভই পরে শেখ হাসিনার পতনের কারণ হয়ে যায়।
অবরুদ্ধ রাজধানী ও থমথমে দেশ
২৫ জুলাই সামরিক বাহিনীর সাঁজোয়া যান ও কড়া কারফিউর নিয়ন্ত্রণে ছিল রাজপথ। মাঝে মাত্র কয়েক ঘণ্টার জন্য শিথিল করা হলেও মানুষের স্বাভাবিক চলাচল ছিল সম্পূর্ণ রুদ্ধ। রেলওয়ে ঘোষণা দিয়েও ট্রেন চলাচল শুরু করেনি। ইন্টারনেট ফের বন্ধ হওয়ায় অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক যোগাযোগ অচল হয়ে পড়ে।
আন্দোলনের নতুন ঘোষণা
বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন ২৫ জুলাই অজ্ঞাত স্থান থেকে জানায়, শত শত সহযোদ্ধার হত্যার বিচার, ক্ষতিপূরণ এবং গ্রেপ্তারকৃতদের মুক্তি না দেওয়া পর্যন্ত এই লড়াই থামবে না। সমন্বয়ক আব্দুল হান্নান মাসউদ বিবৃতিতে দেশবাসীকে নিহতদের স্মরণে পরের দিন শুক্রবার
মসজিদ ও উপাসনালয়গুলোতে দোয়া এবং প্রার্থনার আহ্বান জানান।
দেশজুড়ে আহত ১৫ হাজার বিক্ষোভকারীর চিকিৎসার জন্য জরুরি মেডিকেল টিম গঠনের ঘোষণা দেওয়া হয়।
- বিষয় :
- জুলাই গণঅভ্যুত্থান