রাজধানীর পানি নিষ্কাশনের দায়িত্ব পেল ২ সিটি করপোরেশন
ঢাকার পানি নিষ্কাশনের দায়িত্ব ডিএনসিসি ও ডিএসসিসির কাছে হস্তান্তরে বৃস্পতিবার ঢাকা ওয়াসার সঙ্গে সমঝোতা স্মারক সই হয়। ছবি: সমকাল
সমকাল প্রতিবেদক
প্রকাশ: ৩১ ডিসেম্বর ২০২০ | ০৭:৫০
ঢাকা শহরের পানি নিষ্কাশনের দায়িত্ব রাজধানীর দুই সিটি করপোরেশনের কাছে হস্তান্তর করেছে ঢাকা ওয়াসা। বৃহস্পতিবার রাজধানীর হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালে ঢাকা ওয়াসার সঙ্গে দুই সিটি করপোরেশনের এ সম্পর্কিত একটি সমঝোতা স্মারক সই হয়। এর ফলে দীর্ঘ তিন দশক পর এ দায়িত্ব পেল সিটি করপোরেশন।
ঢাকা ওয়াসার পক্ষে ব্যবস্থাপনা পরিচালক তাকসিম এ খান, ঢাকা উত্তর সিটি করপোশেনের (ডিএনসিসি) পক্ষে প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা সেলিম রেজা ও ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) পক্ষে প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা আমিন উল্লাহ নুরী সমঝোতা স্মারকে সই করেন। এ সময় স্থানীয় সরকারমন্ত্রী তাজুল ইসলাম এমপি, ডিএনসিসির মেয়র আতিকুল ইসলাম, ডিএসসিসির মেয়র ব্যারিস্টার শেখ ফজলে নূর তাপসসহ এসব প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন। অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন স্থানীয় সরকার বিভাগের সিনিয়র সচিব হেলালুদ্দীন আহমদ।
অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তাজুল ইসলাম ঢাকা মহানগরীর ড্রেনেজ ব্যবস্থার পরিচালনা, রক্ষণাবেক্ষণ ও উন্নয়নের লক্ষ্যে দ্রুত কাজ শুরু করার জন্য মেয়রদের প্রতি আহ্বান জানান। স্থানীয় সরকারমন্ত্রী বলেন, 'ঢাকা শহরকে আধুনিক এবং দৃষ্টিনন্দন করতে হলে নগরীর বেদখল এবং হারিয়ে যাওয়া খালগুলোকে উদ্ধার, সংস্কার ও পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন করতে হবে। ১৯৮৮ সালের আগে ঢাকার খালগুলো তদারকি করত তৎকালীন ঢাকা মিউনিসিপ্যাল করপোরেশন। কিন্তু কোন প্রক্রিয়ার মাধ্যমে ওই খালগুলো ওয়াসার কাছে গেল তার সঠিক কারণ জানা যায়নি। তাই এতোদিন খালগুলো রক্ষণাবেক্ষণে অনেকটা সমন্বয়হীনতা ছিল।'
তিনি আরও বলেন, 'সমঝোতা স্মারকের ফলে এখন ঢাকার ২৬টি খাল ওয়াসার কাছ থেকে ডিএনসিসি এবং ডিএসসিসির কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। সেগুলো রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব ওই দুটি করপোরেশন করবে। এতে নগরে আর জলাবদ্ধতা হবে না।'
দীর্ঘদিন ধরেই রাজধানীর জলাবদ্ধতার জন্য ঢাকা ওয়াসা ও সিটি করপোরেশন পরস্পরকে দোষারোপ করছে। কারণ রাজধানীর ড্রেনেজ ব্যবস্থা এতদিন ঢাকা ওয়াসা ও সিটি করপোরেশনের হাতে ন্যস্ত ছিল। সিটি করপোরেশন উন্মুক্ত ড্রেনের রক্ষণাবেক্ষণ, মেরামত ও নির্মাণের সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিল। আর ঢাকা ওয়াসার দায়িত্ব ছিল ভূগর্ভস্থ স্টর্ম স্যুয়ারেজ ডেন নির্মাণ, রক্ষণাবেক্ষণ ও মেরামত।
ঢাকা ওয়াসা বরাবরই বলে আসছিল, উন্মুক্ত ড্রেনগুলো ঠিকমতো তদারকি করে না সিটি করপোরেশন। ফলে বৃষ্টির পানি স্টর্ম স্যুয়ারেজের পাইপ-ড্রেনে প্রবেশ করতে পারে না। ফলে রাজধানীতে জলাবদ্ধতা তৈরি হয়। আর দোষ হয় ওয়াসার।
বিপরীতে সিটি করপোরেশনের অভিযোগ ছিল, স্টর্ম স্যুয়ারেজের পাইপ ড্রেনগুলো ওয়াসা ঠিকমতো পরিষ্কার করে না। ড্রেন পরিষ্কারের নামে ঠিকাদার ও ওয়াসার প্রকৌশলীরা টাকা-পয়সা লুটে খায়। ফলে ড্রেনের তিন-চতুর্থাংশ সব সময় ভরাট থাকে। উন্মুক্ত ড্রেনের পানি স্টর্ম স্যুয়ারেজের পাইপলাইনে প্রবেশ করতে পারে না।
এ অবস্থায় এর আগের স্থানীয় সরকারমন্ত্রী খন্দকার ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেন ড্রেনেজ সমস্যার সমাধানকল্পে একটি কমিটি করে দেন। কমিটি দীর্ঘদিন ধরে আইনকানুনসহ বিস্তারিত বিষয় পর্যালোচনা করে ড্রেনেজ ব্যবস্থাটি সিটি করপোরেশনের কাছে হস্তান্তরের সুপারিশ করে। বিষয়টি নিয়ে ওয়াসা, সিটি করপোরেশন ও স্থানীয় সরকার বিভাগ বিভিন্ন সময় বৈঠকের পর বৈঠক করতে থাকে। সর্বশেষ গত ২৬ নভেম্বর অনুষ্ঠিত বৈঠক শেষে স্থানীয় সরকারমন্ত্রী তাজুল ইসলাম জানিয়ে দেন, এক মাসের মধ্যে সিটি করপোরেশনের কাছে ড্রেনেজ হস্তান্তর করা হবে। বৃহস্পতিবার সেই হস্তান্তরের চুক্তি স্বাক্ষরিত হলো সংস্থাগুলোর মধ্যে।

অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথির বক্তব্যে ডিএসসিসি মেয়র ব্যারিস্টার শেখ ফজলে নূর তাপস বলেন, 'জলাবদ্ধতা নিরসনের দায়িত্ব ঢাকা ওয়াসা হতে সিটি করপোরেশনের কাছে হস্তান্তর করায় আজ ইতিহাস রচিত হলো।' এ সময় তিনি ঢাকাকে ভেনিসের মতো শহরে পরিণত করার অঙ্গীকার করেন।
তাপস বলেন, 'নতুন বছরের প্রথম দিন শুক্রবার হওয়ায় তারপরের দিন শনিবার হতেই আমরা প্রাথমিকভাবে ক্র্যাশ প্রোগ্রাম হাতে নিয়েছি। জিরানি খাল, মান্ডা খাল ও শ্যামপুর খাল এবং পান্থপথ বক্স কালভার্ট ও সেগুনবগিচা বক্স কালভার্ট হত বর্জ্য অপসারণের বিশাল কর্মযজ্ঞ আমরা হাতে নিয়েছি। আগামী মার্চের মধ্যে এই তিনটি খাল ও দুটি বক্স কালভার্ট হতে বর্জ্য অপসারণ করার কাজ শেষ করার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছি। যদি এটা করতে পারি, তাহলে আগামী জুন নাগাদ বাকিগুলো ধরব। তাহলে আগামী বর্ষা মৌসুমে জলাবদ্ধতা হবে না।'
অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথির বক্তব্যে ডিএনসিসি মেয়র আতিকুল ইসলাম বলেন, 'রাজধানীর সব খাল পুনরুদ্ধার করে হারানো রূপ ফিরিয়ে আনা হবে। সবাইকে সঙ্গে নিয়ে সকল চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করে খাল উদ্ধার করা হবে। খালগুলোর সীমানা চিহ্নিত করে খালের পাড় থেকে অবৈধ সকল স্থাপনা উচ্ছেদ করে পাড় বাঁধাই, সবুজায়ন, ওয়াকওয়ে নির্মাণ করা হবে।'
খালের দূষণ রোধে আতিকুল ইসলাম বলেন, 'কোনোভাবেই পয়ঃনিষ্কাশন লাইনের সংযোগ খালের মধ্যে সরাসরি দেওয়া যাবে না। প্রয়োজনে বায়োলজিকেল সেফটি ট্যাঙ্ক নির্মাণের কথা ভাবা যেতে পারে।'
