সমকাল এক্সপ্লেইনার
অর্থনীতিতে ‘চায়না শকের’ শঙ্কা, পরিবারে কীভাবে প্রভাব ফেলে
চীনের নতুন পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনা ঘিরে দ্বিতীয় ‘চায়না শকের’ সতর্কতা দেওয়া হচ্ছে। ছবি: সংগৃহীত
সাদিকুর রহমান
প্রকাশ: ২১ মে ২০২৬ | ১৯:০২ | আপডেট: ২১ মে ২০২৬ | ১৯:১০
ইউরোপের বৃহত্তম অর্থনীতির দেশ জার্মানিকে এরইমধ্যে ‘চায়না শক ২.০’ এর বিষয়ে সতর্ক করেছে একটি থিঙ্ক ট্যাঙ্ক। বলা হচ্ছে, এর প্রভাবে বার্লিনের অর্থনীতি ও সামাজিক জীবন ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। শুধু জার্মানি নয়, সম্প্রতি চীন তাদের নতুন পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনা প্রণয়নের পর থেকে বিশ্বজুড়েই অর্থনীতিতে দ্বিতীয় ‘চায়না শকের’ আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
যদিও চীনের পক্ষ থেকে দাবি করা হচ্ছে, পশ্চিমা গণমাধ্যমগুলো এই তত্ত্বের ব্যাপক প্রচার করে বাস্তবতাকে আড়াল করছে। হাই-টেক বা উচ্চপ্রযুক্তি খাতে চীনের উত্থান বিশ্ব অর্থনীতির জন্য কোনো হুমকি নয়। এটি বরং আধুনিক প্রযুক্তিকে সাধারণ মানুষের কাছে সহজলভ্য করে তোলার নিয়ামক।
প্রশ্ন হলো, চীন তাদের প্রযুক্তি খাতে কী নীতি নিয়েছে- যেটিকে বিশ্ব অর্থনীতির জন্য ধাক্কা মনে করা হচ্ছে? ২০০১ সালে যুক্তরাষ্ট্রে বেকারত্ব ও বিবাহবিচ্ছেদের হার বৃদ্ধির জন্যও ‘চায়না শককে’ দায়ী করা হয়। চায়না শক কীভাবে সামাজিক ও পারিবারিক জীবনে প্রভাব ফেলে?
‘চায়না শক’ কী
ম্যাসাচুসেটস ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজির অর্থনীতিবিদ ডেভিড অটোর ২০১৬ সালে তাঁর এক গবেষণাপত্রে ‘চায়না শক’ ধারণা তুলে ধরেন। তাঁর বর্ণনা অনুযায়ী, চীন ২০০১ সালে বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থায় (ডব্লিউটিও) যোগদানের পর যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে তাদের রপ্তানির হার প্রায় তিনগুণ বাড়ে। এর ফলে যুক্তরাষ্ট্রের উৎপাদন খাতের ১০ লাখ এবং সামগ্রিকভাবে প্রায় ২৫ লাখ মানুষ চাকরি হারায়।

অর্থনীতির প্রচলিত ধারণা অনুযায়ী, কোনো অঞ্চলের স্থানীয় শিল্পগুলো খুব দ্রুতই নতুন পরিস্থিতির সঙ্গে মানিয়ে নেয়। কর্মীরাও দক্ষতার উন্নয়ন করে পরিস্থিতির সঙ্গে খাপ খাওয়ান। কিন্তু ডেভিড অটোর তাঁর গবেষণায় দেখান, যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে চীনা পণ্য প্রবেশের ধাক্কায় মানিয়ে নেওয়ার প্রক্রিয়া খুবই ধীর গতির ছিল। কিছু অঞ্চলে অন্তত এক দশক ধরে মজুরি হ্রাস ও উচ্চ বেকারত্ব বজায় ছিল।
গত বছর ফিন্যান্সিয়াল টাইমসের একটি পডকাস্টে অংশ নিয়েছিলেন ডেভিড অটোর। সেখানে তিনি বাস্তব উদাহরণ দিয়ে চায়না শকের ধারণাটি পরিস্কার করেন। অটোর বলেন, চীন বর্তমানে রোবোটিক্স, টেলিযোগাযোগ, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ও জ্বালানি প্রযুক্তির মতো উন্নত খাতগুলোর ওপর মনোযোগ দিচ্ছে। বিপরীতে যুক্তরাষ্ট্রের শুল্ক নীতিগুলো নিম্ন-প্রযুক্তির উৎপাদন খাতকে লক্ষ্য করে প্রণীত। এমন অবস্থায় উচ্চপ্রযুক্তি সম্পন্ন চীনের কম দামী পণ্য যখন বাজারে ঢোকে তখন ক্রেতারা সেগুলোর দিকে ঝোঁকেন। একইসঙ্গে স্থানীয় শিল্প সেই পরিস্থিতির সঙ্গে খাপ খাওয়াতে না পেরে কর্মী ছাঁটাই করে। কোনো বাজার বা শিল্পের ওপর চীনা পণ্যের এই প্রভাবই ‘চায়না শক’।
কেন দ্বিতীয় ধাক্কার শঙ্কা?
গত মাসে চীন ২০২৬-৩০ সালের জন্য পাঁচ বছর মেয়াদী একটি পরিকল্পনা প্রণয়ন করেছে। এতে বর্তমান শাসক দল কমিউনিস্ট পার্টির কৌশলগত বেশকিছু উচ্চাকাঙ্ক্ষা যুক্ত হয়েছে। যার মধ্যে অন্যতম হলো প্রযুক্তিখাতে বৈশ্বিক শ্রেষ্ঠত্ব ও স্বনির্ভরতা অর্জন করা।

চীনের এই পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনার গুরুত্বপূর্ণ বিভিন্ন দিক তুলে ধরেছে লন্ডনভিত্তিক থিঙ্ক ট্যাঙ্ক ‘ইন্টারন্যাশনাল ইনস্টিটিউট ফর স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজ’। তারা লিখেছে, চীন মূলত উদ্ভাবনের গতি বাড়িয়ে, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার আরো সম্প্রসারণ ঘটিয়ে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি খাতে বিশ্বের শীর্ষস্থান দখল করতে চায়। চীনা কমিউনিস্ট পার্টির নেতারা মনে করছেন, প্রযুক্তির ক্ষেত্রে যুগান্তকারী আবিষ্কারের মাধ্যমে সামগ্রিক উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি করা সম্ভব। তাই তারা আগামী পাঁচ বছরে মাল্টিমোডাল ইন্টেলিজেন্স, কোয়ান্টাম প্রযুক্তি, বায়োটেকনোলজি এবং জ্বালানিসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে উদ্ভাবনের নতুন মডেল প্রতিষ্ঠা করবে।
মাল্টিমোডাল ইন্টেলিজেন্স বা মাল্টিমোডাল এআই হলো এমন এক ধরনের কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, যা মানুষের মতো একইসঙ্গে ভিন্ন ধরনের একাধিক তথ্য (লেখা, ছবি, অডিও, ভিডিও) গ্রহণ, প্রক্রিয়াকরণ ও বিশ্লেষণ করতে পারে।
বিশ্লেষকদের শঙ্কা, চীনের এই উদ্ভাবনগুলো যখন বাজারে ছড়াবে তখন আমদানিকারক দেশগুলোর স্থানীয় শিল্প সেটির সঙ্গে খাপ খাওয়াতে না পেরে একটি ধাক্কা খাবে। ম্যাসাচুসেটস ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজির অর্থনীতিবিদ ডেভিড অটোর-এর ধারণা অনুযায়ী, এটি দ্বিতীয় চায়না শক বা ‘চায়না শক ২.০’ তৈরি করবে।
পরিবারে কীভাবে প্রভাব ফেলে
যখন চীনা পণ্যের বন্যায় অন্য কোনো দেশের বাজার ভেসে যাবে, তখন সেটির প্রভাব পরিবারগুলোর ওপরও পড়বে। কারণ বাজারের সঙ্গে শিল্পখাত, কর্মী ও তাদের পরিবার সরাসরি যুক্ত।

বাংলাদেশের বাজার বিবেচনায় উদাহরণ দেওয়া যাক। দেশের হালকা প্রকৌশল ও ইলেকট্রনিক্স পণ্যকে সম্ভাবনাময়ী খাত হিসেবে বিবেচনা করা হয়। বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (বিডা) ওয়েবসাইটের তথ্য অনুযায়ী, কেবল ইলেকট্রনিক্স খাতের সঙ্গে ৩ হাজার প্রতিষ্ঠান জড়িত। সেগুলোতে ১০ লাখ মানুষের কাজের সুযোগ হয়েছে।
বাংলাদেশের ইলেকট্রনিক্স শিল্পে মূলত কনজিউমার বা ভোক্তা পণ্য যেমন- মোবাইল ফোন, গৃহস্থালির সামগ্রী (ফ্রিজ, এয়ার কন্ডিশনার, টেলিভিশন, বৈদ্যুতিক ফ্যান, ওভেন, ব্লেন্ডার ইত্যাদি) উৎপাদিত হয়। তা সত্ত্বেও দেশের ইলেকট্রনিক্স বাজারে উল্লেখযোগ্য অংশ দখল করে আছে চীনা পণ্য।
বেইজিংয়ের পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনার আওতায় উদ্ভাবিত উন্নত প্রযুক্তির আরো পণ্য দেশের বাজারে ঢুকলে তা স্বাভাবিকভাবেই স্থানীয় কোম্পানিগুলোকে প্রতিযোগিতার মুখে ফেলবে। সেই প্রতিযোগিতায় টিকতে না পারলে ব্যয় কমাতে নেওয়া হবে কর্মী ছাঁটাইয়ের উদ্যোগ।
বেলজিয়ামভিত্তিক থিঙ্ক ট্যাঙ্ক সেন্টার ফর ইউরোপিয়ান রিফর্ম (সিইআর) বলছে, ২০০১ সালে প্রথম চায়না শকের সময় যুক্তরাষ্ট্রের বাজারেও এমনটা ঘটেছিল। সম্ভাব্য দ্বিতীয় চায়না শক নিয়ে সংস্থাটি বুধবার একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। সেখানে বলা হয়েছে, ‘চায়না শক ১.০’ এর প্রভাবে যুক্তরাষ্ট্রে ২৫ লাখ মানুষ কাজ হারায়। অনেক শহরে শিল্পায়ন থেমে যায়। সামাজিক জীবনে এর প্রভাব হিসেবে আত্মহত্যা, বিবাহবিচ্ছেদ ও মাদকাসক্তির হার আশঙ্কাজনকভাবে বেড়েছিল।

জার্মানিতে দ্বিতীয় চায়না শকের সতর্কতামূলক প্রতিবেদনে সিইআর, বাণিজ্য উদ্বৃত্তের উদাহরণ টেনেছে। লিখেছে, ২০২৪ থেকে ২০২৫ অর্থবছরে জার্মানির সঙ্গে চীনের বাণিজ্য উদ্বৃত্ত ১২ বিলিয়ন ডলার থেকে ২৫ বিলিয়ন হয়েছে। দুই দেশের মধ্যে বর্তমানে বাণিজ্য ঘাটতির পরিমাণ প্রায় ৯৪ বিলিয়ন ডলার। এমন প্রেক্ষাপট বার্লিনকে ‘চায়না শক ২.০’ এর ঝুঁকিতে ফেলেছে।
চীন কী বলছে
ক্ষমতাসীন দল চীনা কমিউনিস্ট পার্টির মুখপত্র হিসেবে পরিচিত গণমাধ্যম পিপলস ডেইলি। গত ২৭ এপ্রিল তারা একটি প্রতিবেদনে দাবি করে, সম্প্রতি পশ্চিমা কিছু গণমাধ্যম ‘চায়না শক ২.০’ তত্ত্বটির ব্যাপক প্রচার ও প্রচারণা চালাচ্ছে। তারা দেখাচ্ছে, উচ্চ-প্রযুক্তি খাতে চীনের উত্থান বিশ্ব অর্থনীতির জন্য একটি নতুন বিপর্যয়।
পিপলস ডেইলি লিখেছে- প্রকৃতপক্ষে, চীনের উন্নত মানসম্পন্ন এবং প্রতিযোগিতামূলক দামের পণ্যগুলো দীর্ঘদিন ধরে আধুনিক প্রযুক্তিকে সাধারণ মানুষের কাছে সহজলভ্য করে তোলার প্রধান নিয়ামক হিসেবে কাজ করেছে। যা দিন দিন অনিশ্চয়তার দিকে যাওয়া বিশ্ববাজারে এক ধরনের স্বস্তি এনে দিচ্ছে।
বুধবার চীন সরকারের আরেকটি মুখপত্র গ্লোবাল টাইমস লিখেছে, তথাকথিত এই তত্ত্বের মাধ্যমে বিশ্ববাজারে চীনা প্রতিষ্ঠানগুলোর অর্জনকে হুমকি হিসেবে তুলে ধরা হচ্ছে। বাস্তবতা হলো- বিশ্ববাজারে প্রতিযোগিতা সবসময়ই ছিল। কোনো দেশই চিরকাল একচ্ছত্র আধিপত্য ধরে রাখতে পারে না। যারা সময়ের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলে, প্রযুক্তিগত ও শিল্প খাতে রূপান্তরের সুযোগ কাজে লাগায় এবং সরবরাহ ব্যবস্থার উন্নতি করে- তারাই শেষ পর্যন্ত টিকে থাকে।
