ঢাকার দুই সিটিতে নির্বাচন
ভোটের প্রচারেও পরিবেশ দূষণ
জয়নাল আবেদীন
প্রকাশ: ২০ জানুয়ারি ২০২০ | ১৫:১২ | আপডেট: ২০ জানুয়ারি ২০২০ | ১৫:২১
প্লাস্টিকে মোড়ানো পোস্টারে ছেয়ে গেছে ঢাকা। বেশি সময় অক্ষত রাখতে কাগজের পোস্টার টেকসই করার লক্ষ্যে লেমিনেট করার প্রতিযোগিতা এখন রূপ পেয়েছে আভিজাত্যে। ঢাকার দুই সিটি করপোরেশন নির্বাচনে প্রার্থীদের কাছে পরিবেশ দূষণকারী পণ্যটিই হয়ে উঠেছে প্রচারের অন্যতম হাতিয়ার। পরিবেশ দূষণ ঘটিয়েই তারা দিয়ে যাচ্ছেন আধুনিক, উন্নত ও সুন্দর শহর গড়ার অঙ্গীকার।
দেশে ১৭ বছরের বেশি সময় ধরে আইনগতভাবে প্লাস্টিকের ব্যবহার নিষিদ্ধ হলেও হবু জনপ্রতিনিধিরা আইনকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়েছেন। মাত্র দুই সপ্তাহ আগে একবার ব্যবহার করা হয় এমন 'সিঙ্গেল ইউজ' প্লাস্টিক পণ্যের ব্যবহার শূন্যে নামিয়ে আনতে আদেশ দিয়েছেন হাইকোর্ট। এমন একটি সময়ে উৎসবের আমেজে ঢাকায় প্লাস্টিক পণ্যের ব্যবহার আকাশ ছুঁয়েছে। নির্বাচনের ডামাডোলে বিষয়টি খুব একটা আলোচনায়ও নেই। ফলে নীরবে পরিবেশের বড় ধরনের বিপর্যয়ের আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।
সরেজমিন ঘুরে প্রায় প্রতিটি এলাকায় প্লাস্টিকে মোড়ানো পোস্টার দেখা গেছে। নৌকা ও ধানের শীষ প্রতীক নিয়ে মেয়র পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতাকারী প্রার্থীদের সব পোস্টারই প্লাস্টিকে লেমিনেট করা। আভিজাত্যের এই দৌড়ে পিছিয়ে নেই অন্যান্য মেয়র, কাউন্সিলর এবং সংরক্ষিত নারী কাউন্সিলর প্রার্থীরাও। অধিকাংশ প্রার্থীই পরিবেশ দূষণের কথা ভুলে মেতে উঠেছেন প্লাস্টিকের পোস্টারে।
তবে পরিবেশ অধিদপ্তরের পরিচালক (মনিটরিং অ্যান্ড এনফোর্সমেন্ট) বেগম রুবিনা ফেরদৌসী সমকালকে বলেন, 'আমরা বিষয়টি খেয়াল করিনি। বায়ুদূষণ রোধে ঢাকার আশপাশে ইটভাটার বিরুদ্ধে অভিযান নিয়ে ব্যস্ত থাকায় আর কোনো দিকে নজর দিতে পারিনি।'
এ প্রতিবেদকের কাছে পোস্টারে প্লাস্টিক ব্যবহারের তথ্য জেনে তিনি মন্তব্য করেন, 'বিষয়টি দেখভালের দায়িত্ব তাদের নয়, নির্বাচনী আচরণবিধি নিয়ন্ত্রণকারী সংস্থাই এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে পারে। অবশ্য বিষয়টি পরিবেশ অধিদপ্তরের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সঙ্গে আলোচনা করব আমরা।'
অধিদপ্তরের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা সমকালকে বলেন, 'শুরু থেকেই বিষয়টি খেয়াল করেছি আমি। যারা নতুন ঢাকা উপহার দেওয়া এবং ঢাকাকে নিয়ে স্বপ্নের কথা বলছেন, তাদের কাছ থেকে এ ধরনের পরিবেশবিরোধী কর্মকাণ্ড হতাশাজনক।'
পরিবেশবিদদের আশঙ্কা, প্লাস্টিকে মোড়ানো পোস্টারের শেষ ঠিকানা হতে পারে রাজধানীর ড্রেন ও নালা-নর্দমা। এতে দেখা দিবে নিত্যনতুন দুর্ভোগ। আর শেষ পর্যন্ত নির্বাচিত প্রার্থীদেরই ওই দুর্ভোগ পরিস্থিতি সামাল দিতে হবে। শুধু তাই নয়, পোস্টারে প্লাস্টিকের ব্যবহার একরকম আভিজাত্যে রূপ নিয়েছে। এ চর্চা যেভাবে 'জনপ্রিয়তা' পাচ্ছে, তাতে দেশজুড়ে যে কোনো নির্বাচনে এর অনুকরণ দেখা যাবে। এতে পরিবেশের দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতি ঠেকানো যাবে না।
নির্বাচন কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, মনোনয়নপত্র প্রত্যাহার ও প্রার্থিতা বৈধ ঘোষণার পর ঢাকার দুই সিটি করপোরেশন নির্বাচনে মেয়র, কাউন্সিলর ও সংরক্ষিত নারী কাউন্সিলর পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন ৭৫৮ জন। তাদের প্রায় সবাই প্রচারের অংশ হিসেবে পোস্টার টানিয়েছেন। একজন মেয়র প্রার্থী গতকাল পর্যন্ত দুই লাখ পোস্টার ছাপিয়েছেন। আরেক কাউন্সিলর প্রার্থীর সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, তিনি ছাপিয়েছেন ২৫ হাজার পোস্টার। গড়ে ২০ হাজার ধরে হিসাব করলে দুই সিটিতে দেড় কোটির বেশি পোস্টার ছাপা হয়েছে এবার।
সরেজমিন দেখা যায়, রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় আকাশ ঢাকা পড়েছে প্রার্থীদের পোস্টারে। গত দু'দিন রাজধানীর মতিঝিল, রাজারবাগ, ফকিরাপুল, আরামবাগ, টিকাটুলী, গোপীবাগ, ওয়ারী, গেণ্ডারিয়া, পল্টন, কারওয়ানবাজার, ধানমন্ডি, তেজগাঁও, রামপুরা, মালিবাগসহ বেশ কয়েকটি এলাকায় ঘুরে প্লাস্টিকে মোড়ানো পোস্টার দেখা গেছে।
ফকিরাপুল এলাকা ঘুরে দেখা যায়, পোস্টার ছাপানোর কাজে ঘাম ঝরিয়ে যাচ্ছেন ছাপাখানার কর্মীরা। স্বাভাবিকভাবে কাগজে ছাপানোর পর সেগুলো লেমিনেটিং করা হয়। এ ক্ষেত্রে আদর্শ মানের প্রতিটি পোস্টার লেমিনেট করতে সংখ্যাভেদে তিন টাকা পর্যন্ত ব্যয় হয়।
এনভায়রনমেন্ট অ্যান্ড সোশ্যাল ডেভেলপমেন্ট অর্গানাইজেশনের প্রধান নির্বাহী শাহরিয়ার হোসেন সমকালকে বলেন, 'এমনিতেই ঢাকায় প্রচুর পরিমাণে প্লাস্টিক বর্জ্য রয়েছে, তার সঙ্গে লাখ লাখ পোস্টার যোগ হলো। নিশ্চিত করেই বলা যায়, এই পোস্টারের শেষ ঠিকানা ড্রেন। এতে পানিপ্রবাহ বন্ধ হবে। নোংরা আবর্জনায় গোটা রাজধানী হয়ে উঠবে অপরিচ্ছন্ন। ফলে ডেঙ্গু আর চিকুনগুনিয়ার মতো মশাবাহী রোগের প্রাদুর্ভাব বাড়বে।'
পরিবেশের বিষয়ে নেতাদের রাজনৈতিক সদিচ্ছা কম উল্লেখ করে শাহরিয়ার জানান, 'তারা যেন এই পোস্টারের দায়িত্ব নেন। এগুলো যাতে যত্রতত্র ছড়িয়ে ড্রেনে চলে না যায়, সেটি তাদেরই নিশ্চিত করতে হবে। তিনি প্রশ্ন করেন, প্রার্থীরা যদি এই দায়িত্বটুকু নিতে না পারেন, তাহলে তারা জনগণের দায়িত্ব নেবেন কী করে? পরিবেশ অধিদপ্তরের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন তোলেন পরিবেশ বিষয়ক সংগঠনের এ নেতা।
কয়েকজন মেয়র প্রার্থীর নির্বাচন পরিচালনার সঙ্গে যুক্ত কর্মকর্তাদের সঙ্গে আলাপ করে জানা যায়, টেকসই এবং গুণগত মানের দিক চিন্তা করে পোস্টারে প্লাস্টিকের ব্যবহার হচ্ছে। বেশিদিন অক্ষত থাকার পাশাপাশি ঘন কুয়াশা এবং হালকা বৃষ্টিতে যেন দ্রুত ক্ষতি না হয়, সেদিক চিন্তা করেই এমন পরিকল্পনা। এ প্লাস্টিক দ্রুত পচনশীল বলেও দাবি করেন কেউ কেউ।
বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলনের (বাপা) নির্বাহী সভাপতি ডা. মো. আব্দুল মতিন সমকালকে বলেন, সাদামাটা চোখে যা দেখি, তাতে মনে হয় না এগুলো দ্রুত পচনশীল। বরং আমরা একটি পরিবেশগত বিপর্যয়ের পথে এগোচ্ছি। গত দুই-তিন বছর ধরে পোস্টারে প্লাস্টিক ব্যবহারের প্রচলন চলছে। বর্তমানে এটি ব্যাপক পরিসরে ছড়িয়ে পড়েছে। এ ধরনের চর্চা অব্যাহত থাকলে পরিবেশের পরিণতি খুবই খারাপ হবে।
তিনি আরও বলেন, তারা এ বিষয়ে সিটি করপোরেশনকেই অবহিত করেছিলেন। কিন্তু কেউ কথা রাখেনি। প্রার্থীরা ঢাকাকে নিয়ে সুন্দর সুন্দর চিন্তাভাবনা করছেন এবং প্রতিশ্রুতি দিচ্ছেন। অথচ পোস্টারের মাধ্যমে তারা পশ্চাৎমুখী চিন্তার প্রতিফলন দেখাচ্ছেন।
এই পরিবেশবিদ বলেন, আওয়ামী লীগই প্রথম দেশে প্লাস্টিক ও পলিথিনের ব্যবহার নিষিদ্ধের চিন্তা করে। ২০০১ সালে তারা এ বিষয়ে আইন করার প্রক্রিয়া শুরু করে। বিএনপি ক্ষমতায় এসে ওই প্রক্রিয়া এগিয়ে নেয় এবং এ বিষয়ে আইন প্রণয়ন করে। প্লাস্টিক পলিথিনের বিরুদ্ধে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সোচ্চার ভূমিকা নানা সময়ে দেখা গেছে। এখন তিনিই পারবেন, এ বিষয়ে কিছু করতে। অন্যথায় এসব প্লাস্টিক তার গতি অব্যাহত রেখে দেশের পরিবেশের বিপর্যয় ঘটাবে।
এক গবেষণায় দেখা গেছে, আবর্জনার মধ্যে 'সিঙ্গেল ইউজ' প্লাস্টিকের পরিমাণ ২০১৪ সালে ছিল মাত্র তিন শতাংশ। পাঁচ বছর পরে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে প্রায় ২১ শতাংশে। দেশে এখন প্রতিবছর যে পরিমাণ বর্জ্য হয়, তার ৮৭ হাজার টনই হচ্ছে সিঙ্গেল ইউজ প্লাস্টিক। এসব প্লাস্টিক রি-সাইকেল করা যায় না। ফলে এগুলোর শেষ ঠিকানা হয় নদীনালা, খালবিলে।
গবেষণায় দেখা যায়, প্লাস্টিকের কণাগুলো খুবই ক্ষতিকর। এগুলো শত শত বছর টিকে থাকে এবং মাটি ও পানির স্বাস্থ্য নষ্ট করে দিচ্ছে। মাছ এগুলোকে খাবার হিসেবে গ্রহণ করছে এবং মারা পড়ছে। পানির দূষণ হলে সেখানে মাছের বংশবিস্তারেও সমস্যা হবে।
