ঢাকা সোমবার, ২২ জুন ২০২৬

ঢাকার দুই সিটিতে নির্বাচন

২৪ ঘণ্টাই নিশ্চিত করব নগর ভবনের সেবা: শেখ ফজলে নূর তাপস

২৪ ঘণ্টাই নিশ্চিত করব নগর ভবনের সেবা: শেখ ফজলে নূর তাপস
×

শাহেদ চৌধুরী

প্রকাশ: ০৯ জানুয়ারি ২০২০ | ১৩:৫৭ | আপডেট: ০৯ জানুয়ারি ২০২০ | ১৪:৩৪

নির্বাচিত হলে নাগরিক সেবা নিশ্চিত করতে নগর ভবনের সেবা কার্যক্রম ২৪ ঘণ্টা অব্যাহত রাখার অঙ্গীকার করেছেন ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন (ডিএসসিসি) নির্বাচনে মেয়র পদে আওয়ামী লীগ মনোনীত প্রার্থী ব্যারিস্টার শেখ ফজলে নূর তাপস। সেইসঙ্গে তিনি দায়িত্ব নেওয়ার ৯০ দিনের মধ্যেই মৌলিক নাগরিক সেবা নিশ্চিত করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। ঢাকাবাসীকে উন্নয়ন ও কল্যাণমুখী উন্নত রাজধানী উপহার দেওয়ার জন্য নিরবচ্ছিন্নভাবে কাজ করার প্রত্যাশায় রয়েছেন তিনি।

শেখ ফজলে নূর তাপস সমকালকে দেওয়া এক বিশেষ সাক্ষাৎকারে বলেছেন, দল-মত নির্বিশেষে সবার জন্য ২৪ ঘণ্টাই খোলা থাকবে নগর ভবনের দরজা। ঢাকা দক্ষিণ সিটিকে নতুন করে ঢেলে সাজাতে তিনি তার পরিকল্পনাকে 'ঐতিহ্য রক্ষা, সুন্দর ঢাকা, সচল ঢাকা, সুশাসনের ঢাকা, উন্নত ঢাকা'- এই পাঁচ ভাগে ভাগ করেছেন।

তিনি পুরান ঢাকার ঐতিহ্য সংরক্ষণ করার পাশাপাশি এর স্বকীয় রূপকে প্রস্ম্ফুটিত করতে চাইছেন। ঢাকায় তিনি ব্যাপকভাবে সবুজায়ন করবেন। সবক'টি ওয়ার্ডে খেলার মাঠ, উন্মুক্ত স্থান ও পার্কের ব্যবস্থা করবেন। এর মাধ্যমে ঢাকার সৌন্দর্যও বাড়বে।

ব্যারিস্টার শেখ ফজলে নূর তাপস বলেন, কিছু বাস সার্ভিস ছাড়া ঢাকাবাসী গণপরিবহনের তেমন কোনো সুযোগ পান না। নিম্নবিত্ত ও নিম্ন-মধ্যবিত্তরা অনেক সময় কষ্ট করে হেঁটে পথ চলেন। আর যানজটের সংকট তো আছেই। যানজটের কারণে প্রতিদিনের কাজের জন্য ঢাকাবাসীকে রীতিমতো সংগ্রাম করে গন্তব্যস্থলে যেতে হচ্ছে। তিনি তাই সুষ্ঠু ও সমন্বিত ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে পুরো যাতায়াত ব্যবস্থা ঢেলে সাজানোর পরিকল্পনা করছেন। তিনি পরিবেশবান্ধব কার্যক্রম প্রণয়নেও উদ্যোগী হবেন।

বিভিন্ন দেশের উদাহরণ দিয়ে শেখ তাপস বলেন, সব দেশেই পুরোনো শহরের আলাদা একটি মর্যাদা, সম্মান ও সৌন্দর্য রয়েছে। তিনি সেটা দক্ষিণ ঢাকায় ফিরিয়ে আনতে চাইছেন। তিনি বলেছেন, লন্ডনের টেমস নদীর দুই তীরের মতোই হতে পারে বুড়িগঙ্গা নদীর দুই পাড়। সেখানে নদীর তীর ঘেঁষে আট লেনের রাস্তা থাকবে। একটি রাস্তায় মানুষ হাঁটবে। তিনটি রাস্তায় রিকশা, সাইকেল ও ঘোড়ার গাড়িসহ ধীরগতির যানবাহন চলবে। চারটি রাস্তায় চলবে দ্রুতগতির যানবাহন। আবার দৃষ্টিনন্দন পার্কও থাকবে। জনগণ যেটা পছন্দ করবে, সেটা ব্যবহার করবে।

ব্যারিস্টার তাপসের ইচ্ছা- ঢাকায় ঘোড়ার গাড়িও চলবে। আবার সাইকেল চালানোর আলাদা জায়গাও থাকবে। মানুষ যেখানে হেঁটে যেতে চায়, সেখানে সে হেঁটে যেতে পারবে। এ রকম ব্যবস্থাপনা কার্যকরের মধ্য দিয়ে তিনি সচল ঢাকা প্রতিষ্ঠা করতে চাইছেন। পুরান ঢাকার ঐতিহ্যবাহী পঞ্চায়েত ব্যবস্থাও কার্যকর করতে চাইছেন ব্যারিস্টার তাপস। তার বিশ্বাস, পঞ্চায়েত ব্যবস্থার মাধ্যমে অনেক সামাজিক ব্যাধি একেবারেই দূর করা সম্ভব। যেমন মাদক। এলাকাভিত্তিক মুরব্বিদের দিয়ে পঞ্চায়েত ব্যবস্থার মাধ্যমে মাদক নির্মূল করা সম্ভব। তিনি দূষণমুক্ত ঢাকা প্রত্যাশা করছেন।

ব্যারিস্টার শেখ ফজলে নূর তাপস মৌলিক নাগরিক সুযোগ-সুবিধা ও সেবাগুলো জনগণের দোরগোড়ায় পৌঁছে দিতে ডিএসসিসিকে সম্পূর্ণ দুর্নীতিমুক্ত সংস্থা হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে চাইছেন। উন্নত ঢাকা গড়াই তার মূল লক্ষ্য। এ জন্য তিনি ৩০ বছর মেয়াদি একটি মহাপরিকল্পনা তৈরি করবেন। এ পরিকল্পনা বাস্তবায়নের মাধ্যমে মৌলিক নাগরিক সেবাগুলো ঢাকাবাসীর কাছে পৌঁছে দেওয়া হবে। এর ফলে উন্মুক্ত রাস্তায় আবর্জনা থাকবে না। নিয়মিত মশক নিধন হবে। সড়কবাতিগুলো সুন্দরভাবে জ্বলবে।

জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের দৌহিত্র ব্যারিস্টার শেখ ফজলে নূর তাপস কিছুদিন আগেও আইনপ্রণেতা হিসেবে কাজ করেছেন। রাজনৈতিক পরিবারের সন্তান তাপসের ফুফু প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তার বাবা শেখ ফজলুল হক মনি আওয়ামী যুবলীগের প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান এবং অধুনালুপ্ত বাংলার বাণীর প্রতিষ্ঠাতা সম্পাদক। তার বড় ভাই শেখ ফজলে শামস পরশ আওয়ামী যুবলীগের চেয়ারম্যান। চাচা শেখ ফজলুল করিম সেলিম আওয়ামী লীগ সভাপতিমণ্ডলীর অন্যতম সদস্য।

১৯৯৬ সালে যুক্তরাজ্যের ওলভারহ্যাম্পটন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আইনবিদ্যায় স্নাতক ব্যারিস্টার শেখ ফজলে নূর তাপস ১৯৯৭ সালে 'বার অব ইংল্যান্ড অ্যান্ড ওয়েলস'-এর জেনারেল কাউন্সিলের অধীনে বার ফাইনাল কোর্স সম্পন্ন করেছেন। তিনি লিঙ্কনস ইন ও বাংলাদেশ বার কাউন্সিলের একজন সদস্য। তরুণ এই আইনজীবী বলেছেন, ঢাকাবাসী নির্বাচিত করলে তিনি সার্বক্ষণিক নগরবাসীর সেবায় নিয়োজিত থাকবেন। এর ফলে তিনি সবচেয়ে বেশি মিস করবেন আইন পেশাকে।

২০০৮ সালে ঢাকা-১০ আসনে নির্বাচনে অংশ নেওয়ার মধ্য দিয়ে আনুষ্ঠানিক রাজনীতিতে আসা শেখ তাপস বলেছেন, ঢাকা-১০ আসনের জনগণ তাকে অনেক ভালোবাসে। অনেক আদর-স্নেহ করে। তারাই তাকে টানা তিনবার নির্বাচিত করেছে। তাদের সেবা করার সুযোগ দিয়েছে। তিনিও তাদের হতাশ করেননি। নিবিড়ভাবে জনগণের পাশে থেকে তাদের কল্যাণে কাজ করার চেষ্টা করেছেন।

কিন্তু দ্বিতীয় মেয়াদে এমপি নির্বাচিত হওয়ার পর থেকেই ব্যারিস্টার তাপস উপলব্ধি করেন, জনগণের আশা-আকাঙ্ক্ষা পূরণের জন্য আরও বড় পরিসরে কাজ করা প্রয়োজন। তাই তিনি পরিবর্তনের চিন্তা করতে থাকেন। ঢাকা-১০ আসন দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের আওতাধীন। মেয়র পদে সুযোগ পেলে তিনি এ আসনের জনগণের জন্য কাজ করার আরও বেশি সুযোগ পাবেন বলে ভাবতে থাকেন। মূলত এ চিন্তা থেকেই তিনি নির্বাচনে অংশ নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। তার শুভাকাঙ্ক্ষীরা অবশ্য তা চাননি। তারা তাকে পরামর্শ দিয়েছেন, 'এ পথে যেও না। এটা একটা ভিন্ন পথ। এতে মূল স্রোতধারা থেকে সরে যেতে হবে।'

কিন্তু মেয়র পদে নির্বাচনকে চ্যালেঞ্জ হিসেবেই নিয়েছেন শেখ তাপস। দায়িত্ব নিয়ে কাজ করলে পরিবর্তন আনা সম্ভব বলে মনে করছেন তিনি। এ ক্ষেত্রে তাকে অনুপ্রাণিত করেছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। প্রধানমন্ত্রী ২০৪১ সাল নাগাদ উন্নত বাংলাদেশ গড়ার জন্য রূপকল্প দিয়েছেন। এ জন্য উন্নত রাজধানীর প্রয়োজনীয়তা অনুভব করেছেন ব্যারিস্টার শেখ ফজলে নূর তাপস। সেই তাগিদ থেকেই তিনি দায়িত্ব নিয়ে কাজ করার পথ বেছে নিয়েছেন।

শেখ তাপসের নির্বাচনী স্লোগান হচ্ছে 'আমাদের ঢাকা, ঐতিহ্যের ঢাকা/ আমাদের ঢাকা, উন্নত ঢাকা আমরাই গড়ব'। তিনি দুর্নীতিমুক্ত সুশাসিত ঢাকা প্রত্যাশা করছেন। তিনি বিজয়ী হলে দায়িত্ব পাওয়ার পরের মুহূর্ত থেকেই অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে মশক নিধনে কার্যকর উদ্যোগ নেবেন। প্রজনন পর্যায়েই মশক নিধন ও নিয়ন্ত্রণ করবেন। তার ভাষায়, এটা দৈনন্দিনের কাজ। প্রতিদিনই মশা মারতে হবে।

নৌকা প্রতীকের প্রার্থী ব্যারিস্টার তাপস বলেছেন, সিটি করপোরেশনে সবার জন্য কাজ নির্ধারণ করা থাকবে। কঠোরভাবে আইন প্রয়োগের মাধ্যমে প্রতিদিনের কাজ প্রতিদিন সম্পন্ন করা হবে। তার কথা, সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে বিরাজমান সমস্যার সমাধান করতে হবে। আইন ও রীতিনীতির বাস্তবায়ন হতেই হবে। তা হলেই জনগণকে ২৪ ঘণ্টা সেবা দেওয়া যাবে। প্রতিটি কাজে জবাবদিহি নিশ্চিত করা সম্ভব হবে। আর সিটি করপোরেশনের দায়িত্ব হলো সেবা দেওয়া। সেই সেবা সকালে দেওয়া হবে, বিকেলে দেওয়া হবে না- তা হবে না।

শেখ ফজলে নূর তাপস যে কোনো উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ডের স্থায়িত্ব প্রত্যাশা করছেন কমপক্ষে ১০ বছর। এ জন্য তিনি উন্নয়নমূলক কাজের গুণগত মান নিশ্চিত করবেন, যাতে একটি রাস্তা কিংবা ড্রেন তৈরির পরের বছরেই আবার তা নির্মাণ করতে না হয়। ব্যারিস্টার তাপস বলেছেন, সিটি করপোরেশন একটা অব্যবস্থাপনার মধ্যে রয়েছে। গাফিলতি, অবহেলা, অনিয়ম-দুর্নীতিও আছে। কেউ অভিভাবকত্ব নিয়ে কাজ করেনি। কিন্তু অভিভাবকত্ব নিতে হবে। তাহলে নগরবাসী নিঃসন্দেহে একটি বসবাস উপযোগী সুন্দর ও নান্দনিক রাজধানী পাবে।

মেয়র প্রার্থী তাপস বলেছেন, 'আমার কাজ, আমার কর্তব্য, আমার দায়িত্ব আমাকেই পালন করতে হবে। ঢাকাকে নিয়ে চিন্তা ও পরিকল্পনা করতে হবে। সততা, নিষ্ঠা ও একাগ্রচিত্তে ঢাকাকে নিয়ে স্বপ্ন দেখতে হবে।' তিনি আরও বলেছেন, 'আমি বাস্তবতায় বিশ্বাসী। কাজকে পছন্দ করি। কাজ করতে ভালোবাসি। আর দক্ষিণ সিটি করপোরেশনে কাজ করার যথেষ্ট সুযোগ রয়েছে।' তিনি সবার মতামতের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নিয়ে সিটি করপোরেশনের কার্যক্রম পরিচালনা করবেন। একবার সিদ্ধান্ত নিলে তা বাস্তবায়নে অটল থাকবেন। সততা ও নিষ্ঠার সঙ্গে সুব্যবস্থাপনায় একাগ্রচিত্তে কাজ করলে সবকিছুই সম্ভব বলে মনে করছেন তরুণ এই নেতা।

ইলেকট্রনিক ভোটিং মেশিনে (ইভিএম) ভোট গ্রহণের ব্যাপারে বিএনপির অভিযোগ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে শেখ তাপস বলেন, এই আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে স্বচ্ছতার সঙ্গে দ্রুত ভোট দেওয়া যায়। ভোটারদের মধ্যে এই প্রযুক্তি নিয়ে কোনো শঙ্কা নেই। তারা উৎসবমুখর পরিবেশে ভোটাধিকার প্রয়োগের অপেক্ষায় রয়েছে। অথচ এই প্রযুক্তি নিয়ে বিএনপি জাতীয় নির্বাচনের মতো সিটি করপোরেশনের ভোটকে ঘিরেও কূটকৌশল করছে।

'জিতলে নিরাপদ ঢাকা গড়তে কাজ করব' :একই দিন রাজধানীর বঙ্গবন্ধু অ্যাভিনিউর কর্নেল তাহের মিলনায়তনে জাসদ নেতাদের সঙ্গে মতবিনিময় সভায় ব্যারিস্টার শেখ ফজলে নূর তাপস বলেন, নির্বাচিত হলে ঢাকাবাসীর কাছে দায়বদ্ধ থেকে সচল ও নিরাপদ ঢাকা গড়ে তোলার জন্য কাজ করবেন তিনি। ঢাকা সিটি করপোরেশনকে দুর্নীতির 'উঁইপোকা' মুক্ত করবেন তিনি।

সভায় জাসদের সভাপতি হাসানুল হক ইনু এমপি বলেন, তথ্যপ্রযুক্তির ব্যবহার করে নাগরিক সেবা নিশ্চিত করে ঢাকাকে স্মার্ট নগরীতে পরিণত করতে তাপসই সবচেয়ে যোগ্য। তার কোনো বিকল্প নেই। মেয়রের জন্য মন্ত্রীর পদমর্যাদা জরুরি নয়, মেয়রের জন্য দরকার নাগরিক সেবা প্রদানকারী সব কর্তৃপক্ষ ও সংস্থাকে সমন্বয় করার ক্ষমতা, কর্তৃত্ব ও এখতিয়ার।

এ সময় আরও উপস্থিত ছিলেন জাসদের সাধারণ সম্পাদক শিরীন আখতার এমপি, কেন্দ্রীয় নেতা অ্যাডভোকেট শাহ জিকরুল আহমেদ, অ্যাডভোকেট হাবিবুর রহমান শওকত, নুরুল আখতার, নাদের চৌধুরী, শহীদুল ইসলাম, শওকত রায়হান, ওবায়দুর রহমান চুন্নু, নইমুল আহসান জুয়েল, হাজী ইদ্রিস ব্যাপারী, এ কে এম শাহ আলম, অ্যাডভোকেট মুহিবুর রহমান মিহির প্রমূখ।

আরও পড়ুন

×