সরকারি বাসায় দ্বিতীয় স্ত্রীর লাশ, পুলিশ হেফাজতে এমপি নজরুল
ঘটনার সময় বাসায় ছিলেন নজরুল
গাজী নজরুল ইসলাম
সমকাল প্রতিবেদক
প্রকাশ: ২১ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ০০:০৮ | আপডেট: ২১ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ০০:৩৪
রাজধানীর মানিক মিয়া অ্যাভিনিউসংলগ্ন ন্যাম ভবনের ফ্ল্যাট থেকে সাতক্ষীরা-৪ আসনের আলোচিত সংসদ সদস্য (এমপি) গাজী নজরুল ইসলামের দ্বিতীয় স্ত্রী মরিয়াম খাতুনের (১৯) লাশ উদ্ধার করা হয়েছে। পুলিশ বলছে, খবর পেয়ে রোববার সন্ধ্যা ৭টার দিকে ঘটনাস্থলে যায় পুলিশ। রাত ১০টার দিকে কক্ষের দরজা ভেঙে মরদেহ উদ্ধার করা হয়। যে কক্ষে মরিয়ামের লাশ পাওয়া গেছে, তার পাশের কক্ষে অবস্থান করছিলেন এমপি নজরুল ইসলাম।
এ ঘটনার পর রাতেই নজরুল ও তাঁর প্রথম স্ত্রী মাকছুদা বেগমকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য হেফাজতে নিয়েছে পুলিশ। রাতে শেরেবাংলা নগর থানায় রেখে তাঁকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছিল।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নজরুল ইসলাম জামায়াতে ইসলামীর মনোনয়নে সাতক্ষীরা-৪ আসন থেকে এমপি নির্বাচিত হন। গত জুলাইয়ে মগবাজারের একটি আবাসিক হোটেলে ধারণ করা তাঁর ব্যক্তিগত মুহূর্তের একটি ভিডিও সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। সেখানে ১৯ বছরের তরুণী মরিয়ামকে তাঁর সঙ্গে দেখা যায়। পরে নজরুল ইসলাম জানান, মরিয়াম তাঁর দ্বিতীয় স্ত্রী। এরপর ২২ জুলাই জামায়াতে ইসলামী নজরুল ইসলামকে দল থেকে বহিষ্কার করে। দলটির পক্ষ থেকে তাঁর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য স্পিকার, নির্বাচন কমিশনসহ সংশ্লিষ্টদের কাছে চিঠি দেওয়া হয়।
এদিকে, পল্লবী থানায় দ্বিতীয় স্ত্রীর মামার করা হত্যাচেষ্টা মামলায় উচ্চ আদালত থেকে জামিন পাওয়ার পর নজরুল ইসলাম গতকাল ঢাকার আদালতে জামিননামা দাখিল করেন। জামিনের মেয়াদ শেষ হলে জামায়াতে ইসলামী থেকে বহিষ্কৃত এমপি নজরুল আত্মসমর্পণ করে জামিন চাইবেন।
ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) তেজগাঁও বিভাগের উপকমিশনার ইবনে মিজান সমকালকে জানান, খবর পেয়ে সন্ধ্যায় ৭টায় তিনিসহ পুলিশের একটি দল ন্যাম ভবনে যায়। ঘরের দরজা ভেঙে ঝুলন্ত অবস্থায় মরিয়ামের লাশ উদ্ধার করা হয়। এ সময় এমপি নজরুল ইসলাম বাসায় ছিলেন। ফ্ল্যাটটি তাঁর নামে বরাদ্দ। তিনি বলেন, ‘কী ঘটেছিল, তা নিশ্চিত হতে এমপি ও তাঁর প্রথম স্ত্রীকে আমরা জিজ্ঞাসাবাদ করছি।’
রাতে সরেজমিন দেখা যায়, ন্যাম ভবনের ৩ নম্বর গেটের ভেতরে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা পাহারায়। গেট দিয়ে ভেতরে ঢুকে ডান পাশে একটু সামনে গেলে ৫ নম্বর ভবন। ভবনটির কাছে কাউকে যেতে দিচ্ছেন না আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা। রাত ৯টা ৪৮ মিনিটে ভবন থেকে সিআইডির ক্রাইম সিনের সদস্যদের বের হতে দেখা যায়। তবে তারা গণমাধ্যমের সঙ্গে কথা বলেননি। তার কিছুক্ষণ পর রাত ৯টার ৫৩ মিনিটের দিকে ৫ নম্বর ভবনটির নিচ থেকে তিনটি গাড়ি বেরিয়ে আসে। প্রথমে একটি গাড়ি, তার পেছনেই একটি অ্যাম্বুলেন্স। এরপর অন্য আরেকটি গাড়ি বের হয়ে যায়। তবে এ সময় নজরুল ইসলাম ও তাঁর দ্বিতীয় স্ত্রীর পরিবারের কাউকে দেখা যায়নি।
এক নিরাপত্তাকর্মী জানান, ন্যাম ভবনের আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যসহ অন্যান্য নিরাপত্তাকর্মী রয়েছে। ৫ নম্বর ভবনসহ প্রতিটি ভবনই ১০ তলা। তবে ৫ নম্বর ভবনের অধিকাংশ তলায় কোনো আলো দেখা যায়নি।
পুলিশ জানায়, ৫ নম্বর ভবনের দোতলায় ২০৩ নম্বর ফ্ল্যাটে এমপি নজরুল ইসলাম সস্ত্রীক বসবাস করেন। গতকাল সন্ধ্যায় পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে কক্ষের জানালা দিয়ে মরিয়ামের লাশ সিলিং ফ্যানের সঙ্গে ঝুলন্ত দেখা যায়। ন্যাম ভবনের একজন নিরাপত্তা কর্মকর্তা বিষয়টি শেরেবাংলা নগর থানার ওসিকে জানান। এরপর পুলিশ ঘটনাস্থলে যায়। আলামত সংগ্রহের জন্য পরে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই) ও পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগের (সিআইডি) ফরেনসিক ইউনিটকে ডাকা হয়। তারা আসার আগ পর্যন্ত ওই কক্ষে প্রবেশ করেনি থানা পুলিশ। রাত ১০টার দিকে লাশ উদ্ধার করে ময়নাতদন্তের জন্য শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ মর্গে পাঠানো হয়।
শেরেবাংলা নগর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মনিরুল ইসলাম সমকালকে বলেন, ন্যাম ভবনের একজন নিরাপত্তা কর্মকর্তার কাছ থেকে তথ্য পাওয়ার পর পুলিশ সেখানে যায়। এরপর ঝুলন্ত অবস্থায় এমপির দ্বিতীয় স্ত্রীর লাশ পাওয়া গেছে।
গত জুলাইয়ে মরিয়ামের সঙ্গে এমপি নজরুল ইসলামের ব্যক্তিগত মুহূর্তের কয়েকটি ভিডিও সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে আলোচনা-সমালোচনা শুরু হয়। এ ঘটনার পর জামায়াতের অনেক নেতাকর্মী সামাজিক মাধ্যমে ওই ভিডিওকে প্রথমে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) প্রযুক্তিতে তৈরি বলে দাবি করেন। অবশ্য নজরুল ইসলাম নিজের ফেসবুক আইডিতে পোস্ট দিয়ে জানান, মরিয়াম তাঁর দ্বিতীয় স্ত্রী। ১৭ জুন পারিবারিকভাবে এবং প্রথম স্ত্রীর সম্মতিতে দ্বিতীয় স্ত্রীর বাবার বাসায় তাদের বিয়ে সম্পন্ন হয়।
গাজী নজরুল ফেসবুক পোস্টে বলেন, গত ১৩ জুলাই তিনি প্রথম ও দ্বিতীয় স্ত্রীকে নিয়ে মগবাজারে যান। সেখানে তাঁর দ্বিতীয় স্ত্রীর বাবার ব্যবসায়িক অফিস। সেখানে তারা আনুমানিক সোয়া এক ঘণ্টা অবস্থান করেন। দ্বিতীয় স্ত্রীর বাবার ব্যবসায়িক অফিসে অবস্থানকালে তাঁর গাড়িচালক ও দ্বিতীয় স্ত্রীর মামা ওবায়দুল্লাহ গাড়ি দেখার কথা বলে বাইরে যান। পরে তিনি ৫-৭ জন অপরিচিত ব্যক্তিকে নিয়ে তাদের কক্ষে ঢোকেন। এরপর তাদের জিম্মি করে এক লাখ টাকা আদায় করেন।
গাজী নজরুল ইসলাম পোস্টে বলেন, তিনি চলাচলের জন্য যে ভাড়া গাড়িটি ব্যবহার করেন, ওবায়দুল্লাহর যোগসাজশে পরে সেটিও আটকে রেখে দফায় দফায় তাঁর কাছে কয়েক লাখ টাকা দাবি করা হয়। টাকা দিতে অস্বীকৃতি জানালে তাঁকে বিভিন্ন ধরনের হুমকি দেওয়া হয়। দ্বিতীয় স্ত্রীর বাবার সঙ্গে ওবায়দুল্লাহর পূর্বশত্রুতা ও পারিবারিক বিরোধের জের ধরে এই ষড়যন্ত্রের ঘটনা ঘটানো হয়েছে।
নজরুল ইসলাম পোস্টে আরও বলেন, ‘পরবর্তীতে হিংসা ও ব্যক্তিস্বার্থ চরিতার্থ করার উদ্দেশ্যে ওবায়দুল্লাহ আমাদের স্বামী-স্ত্রীর ব্যক্তিগত মুহূর্তের ভিডিও ধারণ করে ও বিভিন্ন সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে দেয়।’ এ ঘটনাকে কেন্দ্র করে কিছু অসাধু ব্যক্তি ভিডিওটিকে বিবাহবহির্ভূত সম্পর্কের ঘটনা হিসেবে প্রচার করছে, যা সম্পূর্ণ মিথ্যা ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে উল্লেখ করেছেন এমপি গাজী নজরুল ইসলাম।
ভিডিওকাণ্ডের পর ২২ জুলাই নজরুল ইসলামকে দল থেকে বহিষ্কার করে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী। সাংগঠনিক তদন্তে নৈতিক স্খলন প্রমাণিত হওয়ায় তাঁকে বহিষ্কার, একই সঙ্গে নির্বাচন কমিশনকে বিষয়টি অবগত করা হয়।
জামিননামা দাখিল গাজী নজরুলের
উচ্চ আদালত থেকে জামিন পাওয়ার পর রাজধানীর পল্লবী থানার হত্যাচেষ্টা মামলায় এমপি গাজী নজরুল ইসলাম ঢাকার আদালতে জামিননামা দাখিল করেছেন। ঢাকার অতিরিক্ত মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আওলাদ হোসাইন মুহাম্মদ জোনাইদের আদালতে তিনি উপস্থিত থেকে এ জামিননামা জমা দেন। জামিনের মেয়াদ শেষ হলে আত্মসমর্পণ করে জামিন চাইবেন তিনি।
অনৈতিক সম্পর্কের প্রতিবাদ এবং ভিডিও ফাঁসের সন্দেহে মারধর ও শ্বাসরোধে হত্যাচেষ্টার অভিযোগ এনে গত ২১ জুলাই নজরুল ইসলামের ব্যক্তিগত গাড়িচালক ওবায়দুল্লাহ বাদী হয়ে পল্লবী থানায় মামলা করেন। এই মামলায় হাইকোর্ট থেকে ১০ আগস্ট আট সপ্তাহের জামিন পান তিনি। এই মামলার আসামিরা হলেন এমপি নজরুল ইসলাম, আমিনুর রহমান, মাসুম বিল্লাহ, মোতাসসিম বিল্লাহ ও রাকিবুল হাসান।
মামলার বিবরণে বলা হয়েছে, মামলার বাদী ওবায়দুল্লাহ পল্লবীর কালশী এলাকার ‘রোজগার্ডেন টাওয়ার’-এ তাঁর বোনের বাসায় থাকতেন। তিনি নজরুল ইসলামের ব্যক্তিগত গাড়ির চালক ছিলেন। আত্মীয়তার সূত্রে নজরুল ইসলাম ওই বাসায় যাতায়াত করতেন। একপর্যায়ে নজরুল ইসলামের সঙ্গে ওবায়দুল্লাহর ভাগনির অনৈতিক সম্পর্ক গড়ে ওঠে। বিষয়টি টের পেয়ে ওবায়দুল্লাহ তাঁর পরিবারকে জানান এবং নজরুল ইসলামকে এ থেকে বিরত থাকার অনুরোধ করেন। এতে ক্ষিপ্ত হয়ে নজরুল ইসলাম তাঁকে প্রাণনাশের হুমকি দেন।
এমপির বিচার দাবি এলাকাবাসীর
শ্যামনগর (সাতক্ষীরা) প্রতিনিধি জানিয়েছেন, এমপি গাজী নজরুল ইসলামের দ্বিতীয় স্ত্রীর মৃত্যুর ঘটনায় ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে তাঁর এলাকার মানুষ। এ ঘটনায় নজরুল ইসলামকে দায়ী করে মৃত্যু রহস্য উদঘাটনে সরকারের আন্তরিক হস্তক্ষেপ দাবি করেছেন তারা।
উপজেলা বিএনপির আহ্বায়ক আলহাজ সোলায়মান কবীর বলেন, ‘ঘটনাটি খুবই দুঃখজনক। গাজী নজরুলের অনৈতিক কাজের দায় নিতে না পেরে চরম হতাশা আর অপমানে সে আত্মহত্যা করেছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।’
সুশীল সমাজের প্রতিনিধি ও সমাজকর্মী গাজী আল ইমরান বলেন, অসম বিয়ে অনেকে মেনে নিতে পারেননি। এ ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত দাবি করেন তিনি।
বিষয়টি নিয়ে প্রতিক্রিয়া জানতে চাইলে উপজেলা জামায়াতের আমির মাওলানা আব্দুর রহমান কোনো মন্তব্য করতে অস্বীকৃতি জানান। তিনি জেলার দায়িত্বশীলদের অনুমতি ছাড়া কথা বলতে পারবেন না বলেও জানান। তবে সাতক্ষীরা জেলা জামায়াতের দপ্তর সম্পাদক রুহুল আমিনের মোবাইলে একাধিকবার ফোন দিলেও তিনি ধরেননি।
শ্যামনগর উপজেলা জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি রেজাউল ইসলাম বলেন, বিষয়টি হৃদয়বিদারক। বহিষ্কার করার পর থেকে দলের সঙ্গে নজরুল ইসলামের কোনো যোগাযোগ নেই।
- বিষয় :
- গাজী নজরুল ইসলাম
- লাশ উদ্ধার
- জিজ্ঞাসাবাদ