ঢাকা বুধবার, ০২ সেপ্টেম্বর ২০২৬

টনসিল: লক্ষণ, কারণ এবং চিকিৎসা

টনসিল: লক্ষণ, কারণ এবং চিকিৎসা
×

ছবিটি জেমিনি এআই দিয়ে বানানো হয়েছে

 ডা. মো. আব্দুল হাফিজ শাফী 

প্রকাশ: ০১ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ০৭:৫৩

| প্রিন্ট সংস্করণ

টনসিলাইটিস সাধারণত ৩ থেকে ১৪ বছরের শিশুর মধ্যে বেশি দেখা যায়। বড়দের ক্ষেত্রে যে একেবারেই হয় না, তা কিন্তু নয়। টনসিল ইনফেকশনের জন্য ভাইরাস এবং ব্যাকটেরিয়া 
উভয়ই দায়ী 

টনসিল মানবদেহের রোগ প্রতিরোধব্যবস্থার একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অংশ। এটি মূলত এক ধরনের লসিকাগ্রন্থি বা লিম্ফয়েড টিস্যু (Lymphoid tissue), যা আমাদের গলার পেছনের অংশে দুই পাশে (Palatine tonsils) অবস্থান করে। এটি বাইরে থেকে আসা ক্ষতিকর ভাইরাস ও ব্যাকটেরিয়াকে আটকে দিয়ে শরীরে প্রাক-প্রতিরোধ গড়ে তোলে। এই টনসিলে যখন কোনো কারণে প্রদাহ বা সংক্রমণ ঘটে, তখন চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় তাকে টনসিলাইটিস (Tonsillitis) বলা হয়।

টনসিল ইনফেকশনের কারণ
টনসিলাইটিস মূলত ভাইরাস (যেমন: এডেনোভাইরাস, ইনফ্লুয়েঞ্জা) এবং ব্যাকটেরিয়া উভয় প্রকার অণুজীবের আক্রমণের কারণে হতে পারে। ব্যাকটেরিয়ার ক্ষেত্রে প্রধানত ‘বিটা হেমোলাইটিক স্ট্রেপ্টোকক্কাস' (Beta-hemolytic Streptococcus) নামক জীবাণু এই ইনফেকশনের জন্য সবচেয়ে বেশি দায়ী।
ঝুঁকিপূর্ণ বয়স: সাধারণত ৩ থেকে ১৪ বছরের শিশুর মধ্যে এর প্রাদুর্ভাব সবচেয়ে বেশি দেখা যায়। প্রাপ্তবয়স্করাও এতে আক্রান্ত হতে পারেন।
 ঋতু পরিবর্তন (বিশেষ করে শীতকালে), ঘন ঘন ঠান্ডা-সর্দি লাগা, পুষ্টিহীনতা, শারীরিক রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমে যাওয়া, পরিবেশ দূষণ এবং অতিরিক্ত কোল্ড ড্রিংকস বা বরফজাতীয় ঠান্ডা খাবার পানের আসক্তি এই ইনফেকশনের ঝুঁকি বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়।

লক্ষণ ও উপসর্গ
টনসিল ইনফেকশনকে সাধারণত দুটি অবস্থায় ভাগ করা যায়, তীব্র বা আকস্মিক (Acute Tonsillitis) এবং দীর্ঘমেয়াদি (Chronic Tonsillitis)। প্রাথমিক লক্ষণের মধ্যে রয়েছে–
গলা ব্যথা ও গিলতে কষ্ট: গলায় তীব্র ব্যথা অনুভব হওয়া এবং খাবার বা লালা গিলতে তীব্র কষ্ট হওয়া।
উচ্চ তাপমাত্রা: শরীরের তাপমাত্রা ১০২° থেকে ১০৪° ফারেনহাইট পর্যন্ত উঠতে পারে, সঙ্গে মাথা ব্যথা, শরীর ব্যথা ও বমির ভাব থাকা।
কানে ব্যথা: কানের সঙ্গে গলার স্নায়ুগত সংযোগ থাকায় টনসিলের তীব্র প্রদাহে কান ব্যথা হতে পারে।
শিশুর অতিরিক্ত লালাস্রাব: ছোট শিশুর ক্ষেত্রে গলায় ব্যথার কারণে মুখ দিয়ে ক্রমাগত লালা পড়তে দেখা যায়।
মুখ খুলতে বাধা: ইনফেকশন অত্যন্ত গুরুতর হলে রোগী ঠিকমতো মুখ খুলতে পারে না। (Trismus)।

চিকিৎসা পদ্ধতি
সঠিক সময়ে চিকিৎসকের পরামর্শ মেনে চললে ওষুধ ও ঘরোয়া পরিচর্যায় এটি নিরাময় সম্ভব।
ওষুধনির্ভর চিকিৎসা: সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে সাধারণত উপযুক্ত অ্যান্টিবায়োটিক, প্রদাহনাশক বা ব্যথানাশক ওষুধ, অ্যান্টিহিস্টামিন এবং মাউথওয়াশ ব্যবহার করা হয়।
 যত্ন: প্রচুর পরিমাণে বিশুদ্ধ পানি পান করা, উষ্ণ গরম পানিতে লবণ দিয়ে দিনে ৩-৪ বার গড়গড়া (Gargle) করা এবং আদা-লেবু মিশ্রিত হালকা গরম চা পান করলে গলার তীব্র অস্বস্তি ও প্রদাহ অনেকটাই লাঘব হয়।

দীর্ঘমেয়াদি ইনফেকশনের জটিলতা
রোগী যদি সঠিকভাবে চিকিৎসা না নেন বা চিকিৎসকের নির্দেশনা না মানেন, তবে এই ইনফেকশন বারবার ফিরে আসে এবং দীর্ঘমেয়াদি বা Chronic Tonsillitis-এ রূপ নেয়। পর পর দুই বছর ধরে যদি বছরে অন্তত ৪-৫ বার করে তীব্র সংক্রমণ হয়, তবে সার্জারির পরামর্শ দেওয়া হয়। সঠিক সময়ে চিকিৎসা বা অপারেশন না করালে নিম্নোক্ত জটিলতাগুলো তৈরি হতে পারে:
টনসিল ফোড়া (Peritonsillar Abscess): ইনফেকশন আশপাশে ছড়িয়ে পড়ে টনসিলে পুঁজ জমে ফোঁড়ার সৃষ্টি হয়।
শ্বাসকষ্ট ও গিলতে বাধা: টনসিল অতিরিক্ত আকারে বেড়ে গিয়ে শ্বাসপ্রশ্বাসের পথ অবরুদ্ধ করতে পারে, যা ঘুমের মধ্যে শ্বাসকষ্ট (Sleep Apnea) ঘটায়।
কানের সংক্রমণ: গলার প্রদাহ কানে ছড়িয়ে পড়ে দীর্ঘস্থায়ী কান পাকা বা কানের ইনফেকশন তৈরি করতে পারে।
বাতজ্বর ও কিডনির ক্ষতি: স্ট্রেপ্টোকক্কাল ইনফেকশন অবহেলা করলে পরবর্তীকালে বাতজ্বর (Rheumatic Fever) হতে পারে এবং রক্তের মাধ্যমে জীবাণু ছড়িয়ে কিডনি ক্ষতিগ্রস্ত (Glomerulonephritis) হতে পারে।
ক্যান্সারের ঝুঁকি: বয়স্ক ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে যদি শুধু একপাশের টনসিল অনিয়মিতভাবে বড় হয়ে যায় এবং দীর্ঘমেয়াদি প্রদাহ থাকে, তবে তা টনসিল ক্যান্সারের লক্ষণ হতে পারে।

কখন অপারেশন করানো যাবে না?
আধুনিক পদ্ধতিতে টনসিল অপারেশন (Tonsillectomy) একটি অত্যন্ত নিরাপদ প্রক্রিয়া হলেও কিছু নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে অপারেশন করা স্থগিত রাখতে হয়–
টনসিলে তীব্র ইনফেকশন বা জ্বর-ব্যথা চলাকালীন অবস্থায়।
তিন বছরের কম বয়সী শিশুদের ক্ষেত্রে।
রক্তে হিমোগ্লোবিনের পরিমাণ কম থাকলে বা ব্যাপক রক্তশূন্যতা থাকলে।
হিমোফিলিয়ার মতো রক্ত তঞ্চনজনিত (Bleeding Disorders) রোগের ইতিহাস থাকলে।
নারীর মাসিক বা ঋতুস্রাব চলার সময়ে।
টনসিল ইনফেকশন অত্যন্ত সাধারণ একটি সমস্যা হলেও অবহেলা করলে তা পরবর্তী সময়ে গুরুতর স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি করতে পারে। তাই প্রাথমিক লক্ষণ দেখা দিলে অবহেলা না করে একজন অভিজ্ঞ নাক-কান-গলা (ENT) বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নিয়ে সঠিক সময়ে চিকিৎসা নিশ্চিত করা অত্যন্ত জরুরি।
[ নাক-কান-গলা রোগ বিশেষজ্ঞ ]

আরও পড়ুন

×