ঢাকা রোববার, ২১ জুন ২০২৬

জন্মশতবার্ষিকী

বিভাজনের ঊর্ধ্বে ঋত্বিক ঘটক

বিভাজনের ঊর্ধ্বে ঋত্বিক ঘটক
×

ঋত্বিক ঘটক। ছবি: সংগৃহীত

রহমান লেনিন

প্রকাশ: ০৪ নভেম্বর ২০২৫ | ১৩:৩০ | আপডেট: ০৪ নভেম্বর ২০২৫ | ১৯:৩৮

ঢাকায় জন্ম, কলকাতায় মৃত্যু। অথচ তাঁর চলচ্চিত্রের মর্মকথা আজও এই মাটিরই প্রতিধ্বনি। বিভাজনের রেখা পেরিয়ে ঋত্বিক ঘটক যেন আজও ফিরে আসেন তাঁর হারানো ভূখণ্ডে, তাঁর হারানো পিতৃভূমিতে। ঋত্বিক ঘটক বাংলা চলচ্চিত্রের ইতিহাসে এমন এক নাম, যিনি কেবল চলচ্চিত্র পরিচালক নন, যাঁর হাত ধরে চলচ্চিত্র পেয়েছে নতুন ভাষা। জন্মেছিলেন ১৯২৫ সালের ৪ নভেম্বর, তৎকালীন পূর্ববঙ্গের ঢাকা শহরে।

তাঁর জন্মশতবার্ষিকীতে আমরা যেন তাঁকে ভুলে না যাই– এই মানুষটি ছিলেন আমাদেরই মাটির সন্তান। তিনি ছিলেন পূর্ববঙ্গের সেই মধ্যবিত্ত পরিবারের প্রতিনিধি, যাদের ইতিহাস ১৯৪৭ সালে এক রক্তাক্ত রেখায় বিভক্ত হয়েছিল। তাই তাঁর চলচ্চিত্রের প্রতিটি ফ্রেমে আছে ‘বাংলাদেশ’ নামে এক হারানো ভূখণ্ডের প্রতিধ্বনি।    

বিভাজনের পর ঋত্বিক ঘটক চলে যান পশ্চিমবঙ্গে কিন্তু তাঁর মনের ভেতর রয়ে যায় ঢাকার গন্ধ, রাজশাহীর পদ্মা নদীর শব্দ, পূর্ববঙ্গের কথ্য ভাষার টান। মেঘে ঢাকা তারা, কোমল গান্ধার বা সুবর্ণরেখা– সবখানেই দেখা যায় ‘পূর্ববঙ্গীয় বেদনা’ নামের এক নন্দনতত্ত্ব।  তিনি বলেছিলেন, “আমি বাংলা চলচ্চিত্র করি, কারণ আমি বাংলার মানুষদের কথা বলতে চাই।” এই ‘বাংলা’ বলতে তিনি বোঝাতেন কেবল পশ্চিমবঙ্গ নয়; বরং সমগ্র বাঙালি জাতি– এক ভাষা, এক সংস্কৃতি, এক ভাগ করা শোকের ইতিহাস। এই জায়গা থেকেই তাঁর চলচ্চিত্র হয়ে ওঠে রাজনৈতিকভাবে বাংলাদেশেরও চলচ্চিত্র।  

ঋত্বিক ঘটকের চলচ্চিত্রে আমরা দেখি– রাষ্ট্র ভাগ হয়েছে, কিন্তু মানুষের মন ভাগ হয়নি। ‘কোমল গান্ধার’ চলচ্চিত্রে যে দুইটি নাট্যদলের বিভাজন দেখানো হয়েছে, সেটা আসলে তৎকালীন ভারত ও পাকিস্তানের রাজনৈতিক-সাংস্কৃতিক বিভেদের রূপক। আর ‘সুবর্ণরেখা’-তে যখন চরিত্ররা নদীর ওপারে হারিয়ে যায়, তখন সেটি রাষ্ট্রীয় রেখা নয়; বরং মানবিক সংযোগের ব্যাকুলতার প্রতীক। ঋত্বিক বিশ্বাস করতেন, রাজনীতি যতই বিভক্ত করুক, সংস্কৃতি সব সময় ঐক্য সৃষ্টি করে। বাংলাদেশ যখন নতুন করে জাতীয়তাবাদ ও ধর্মের টানাপোড়েনে দাঁড়িয়ে, তখন তাঁর ভাষা আমাদের মনে করিয়ে দেয় জাতি কেবল ভৌগোলিক নয়, সাংস্কৃতিকও বটে। ঋত্বিক ঘটকের শিল্পচিন্তা ছিল এক রকমের সাংস্কৃতিক প্রতিবাদ। তিনি বলেছিলেন, “আমি বামপন্থি, কিন্তু তার চেয়েও বেশি আমি বাঙালি।” এই উক্তি বাংলাদেশের ক্ষেত্রে অদ্ভুতভাবে প্রাসঙ্গিক। যেখানে ‘বাঙালিত্ব’ এবং ‘বাংলাদেশিয়তা’– দুটি ধারণা বারবার মুখোমুখি দাঁড়াচ্ছে।    

ঋত্বিক ঘটক এই দ্বন্দ্বকে অতিক্রম করে বলেছিলেন, “বাঙালি সংস্কৃতি কোনো রাষ্ট্রীয় সীমার মধ্যে বন্দি নয়; এটি মানুষের অভিজ্ঞতার যৌথ স্মৃতি।” তাঁর জন্ম ঢাকায়, মৃত্যু কলকাতায়। কিন্তু তাঁর চলচ্চিত্রের আত্মা আছে দু-দিকের মাটিতেই।  

বাংলাদেশের চলচ্চিত্র ও সংস্কৃতি যখন বিভিন্ন সংকটে পড়ে নিজেকে পুনঃসংজ্ঞায়িত করতে চাইছে, তখন ঋত্বিক ঘটকের ভাবনা নতুন করে অনুপ্রেরণা জোগায়। তিনি দেখিয়েছিলেন চলচ্চিত্র শুধু বিনোদন নয়, এটি জাতির স্মৃতি ও প্রতিবাদের ভাষা। 

বাংলাদেশের তরুণ নির্মাতারা যখন নিজেদের চলচ্চিত্রে ‘স্বদেশ’, ‘অভিবাসন’, ‘বঞ্চনা’ বা ‘বিচ্ছেদ’-এর গল্প বলেন, তারা অনিচ্ছাসত্ত্বেও ঋত্বিক ঘটকেরই উত্তরসূরি হয়ে পড়েন। কারণ, তিনি আমাদের শিখিয়েছিলেন যে, চলচ্চিত্র নিজের ইতিহাসকে মুখোমুখি হতে ভয় পায়, সে কখনও শিল্প হয়ে ওঠে না।   
যদি ইতিহাসের পুনর্লিখন সম্ভব হতো, তাহলে হয়তো ঋত্বিক ঘটক আজকের বাংলাদেশের অন্যতম সাংস্কৃতিক প্রতীক হতেন। 

তিনি ছিলেন সেই মানুষ, যিনি ধর্ম, রাজনীতি ও শ্রেণি-পার্থক্যের বাইরে গিয়ে এক নতুন ‘মানুষের দেশ’ কল্পনা করেছিলেন যেখানে বিভাজন নেই, আছে কেবল পুনর্মিলনের তৃষ্ণা।

তাঁর চলচ্চিত্রের গল্পের চরিত্ররা যেমন নদীর ওপারে হারিয়ে যাওয়া প্রিয়জনকে খোঁজে, আমরাও যেন আজ তাঁর ভেতর দিয়ে খুঁজি আমাদের যা হারানো গেছে, তার প্রতিচ্ছবি। এই পুনরাবিষ্কার কেবল নস্টালজিয়া নয়; এটি আমাদের সাংস্কৃতিক দায়বদ্ধতা।

দুঃখজনক হলেও সত্য, বাংলাদেশের জাতীয় পাঠ্যক্রম, চলচ্চিত্র শিক্ষা কিংবা সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানে ঋত্বিক ঘটক এখনও এক ‘অনুপস্থিত নাম’। যে মানুষটি এই ভূখণ্ডে জন্ম নিয়ে সমগ্র বাঙালি সংস্কৃতির ব্যথা ব্যক্ত করেছিলেন; তাঁকে আমরা কীভাবে উপেক্ষা করছি! ঋত্বিক ঘটক একবার বলেছিলেন, “আমার সিনেমা বুঝতে হলে এই জাতির কান্না বুঝতে হবে।” এই কান্না কেবল পশ্চিমবঙ্গের বাঙালির কান্না নয়, বাংলাদেশেরও। তাঁর প্রতিটি দৃশ্য, প্রতিটি সংলাপ আমাদের জাতীয় ইতিহাসের এক বিকল্প ভাষা হয়ে বেঁচে আছে। তাই ঋত্বিককে স্মরণ করা মানে কেবল একজন পরিচালককে শ্রদ্ধা জানানো নয়; এটি আসলে আমাদের সাংস্কৃতিক আত্মপরিচয়ের পুনরুদ্ধার– এক হারানো মাটির মানুষকে ফিরে পাওয়া। 

লেখক: চলচ্চিত্রকর্মী ও নির্মাতা

আরও পড়ুন

×