ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

একীভূত হতে যাওয়া ৫ ব্যাংক

বীমা সুরক্ষা পেতে বড় আমানত ভাগ করে রাখা হচ্ছে

বীমা সুরক্ষা পেতে বড় আমানত ভাগ করে রাখা হচ্ছে
×

ওবায়দুল্লাহ রনি 

প্রকাশ: ২১ অক্টোবর ২০২৫ | ০৭:০১ | আপডেট: ২১ অক্টোবর ২০২৫ | ১৪:৫০

| প্রিন্ট সংস্করণ

একীভূত হতে যাওয়া একটি ব্যাংকে আজবাহার শেখের (ছদ্মনাম) ৯ লাখ টাকার আমানত রয়েছে। নানা উপায়ে চেষ্টা করেও তিনি টাকা তুলতে পারছেন না। শাখা ম্যানেজারের পরামর্শে তিনি এখন ওই টাকা ভেঙে পাঁচজনের নামে ১ লাখ ৮০ হাজার টাকা করে আলাদা সঞ্চয় করেছেন। এতে করে এখন পাঁচটি হিসাব হয়েছে। আমানত বীমা সুরক্ষা তহবিল থেকে তাঁর পুরো ৯ লাখ টাকা নিকট মেয়াদে ফিরে পাওয়ার আশা তৈরি হয়েছে। একক নামে থাকলে যেখানে সর্বোচ্চ ২ লাখ টাকা পাবেন।

জানা গেছে, একীভূত হতে যাওয়া এক্সিম, সোস্যাল ইমলামী, ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী, ইউনিয়ন ও গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংকের আমানতকারীরা দুই লাখ টাকা পর্যন্ত বীমা সুরক্ষা পাবেন। এই সুবিধা নিতেই একাধিক নামে আমানত হিসাব খুলে দুই লাখের নিচে রাখা হচ্ছে। এতে করে আমানত হিসাবের সংখ্যা বাড়ছে। এরকম তথ্য পাওয়ার পর গত রোববার ব্যাংকগুলোর এমডিকে ডেকে সতর্ক করেছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। এছাড়া আজ মঙ্গলবার কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কয়েকটি টিম এসব ব্যাংক পরিদর্শনে নামছে। আমানত ভেঙে এভাবে খণ্ড-খণ্ড করার সঙ্গে জড়িত শাখা কর্মকর্তাদের চিহ্নিত করা হবে। ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক বা প্রধান কার্যালয়ের কারও নির্দেশনায় এটি করা হচ্ছে কিনা, তাও খতিয়ে দেখা হবে। 

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী একীভূত হতে যাওয়া পাঁচ ব্যাংকের মোট আমানত কমছে। অথচ আমানত হিসাব বাড়ছে। বর্তমানে এসব ব্যাংকের আমানত কমে এক লাখ ৪০ হাজার কোটি টাকায় নেমেছে। গত জুন শেষে মোট আমানত ছিল এক লাখ ৪৬ হাজার কোটি টাকা। অথচ আমানত হিসাব বেড়ে ৭৫ লাখ ছাড়িয়েছে। কয়েক মাস আগে যা ৭০ লাখের নিচে ছিল। আমানত কমার অন্যতম কারণ, কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে বিশেষ ধার হিসেবে অর্থ নিয়ে ফেরত দেওয়া হয়েছে। আবার খেলাপি ঋণ থেকে সামান্য যেসব আদায় রয়েছে তা থেকেও কিছু কিছু আমানতকারীদের ফেরত দেওয়া হচ্ছে। অন্যদিকে বড় আমানত ভেঙে ভেঙে একাধিক নামে রাখার কারণে সংখ্যা বাড়ছে। একীভূত হতে যাওয়া পাঁচ ব্যাংকের মধ্যে একটি ব্যাংকের সর্বোচ্চ ১১ লাখ আমানত হিসাব বাড়ার তথ্য পাওয়া গেছে।

চলতি বছরের মে মাস থেকে পাঁচ ব্যাংক একীভূতকরণের আলোচনা শুরু হয়। এরপর থেকে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর ড. আহসান এইচ মনসুর বীমা তহবিল থেকে দুই লাখ টাকা পর্যন্ত ফেরত দেওয়ার আশ্বাস দিয়ে আসছেন। গত ৫ অক্টোবর উপদেষ্টা পরিষদে এ-সংক্রান্ত অধ্যাদেশের অনুমোদন হয়। এর আগে আমানত বীমা ট্রাস্ট তহবিল থেকে কেবল একটি ব্যাংক বন্ধ হলে এক লাখ টাকা পর্যন্ত দেওয়ার সুযোগ ছিল। তবে এই সংশোধনীর মধ্য দিয়ে আমানত সুরক্ষা অধ্যাদেশের আলোকে পাঁচ ব্যাংকের আমানতকারীদের দুই লাখ টাকা পর্যন্ত প্রথমে পরিশোধ করা হবে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র ও নির্বাহী পরিচালক আরিফ হোসেন খান সমকালকে বলেন, এভাবে নতুন হিসাব খুলে বীমা সুবিধা পাওয়ার সুযোগ নেই। প্রকৃত ক্ষতিগ্রস্তদের সুবিধা দিতে বীমা তহবিল থেকে টাকা দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। সেখানে কেউ এভাবে কৌশল করে সুবিধা নেবে, তা হবে না। প্রশাসকরা এগুলো ভালো করে যাচাই করবেন।

সমস্যাগ্রস্ত শরিয়াহভিত্তিক পাঁচ ব্যাংক মিলে একটি বড় ইসলামী ব্যাংক প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। এই ব্যাংকের প্রাথমিক মূলধন হবে ৩৫ হাজার কোটি টাকা; যেখানে মূলধন হিসেবে সরকার ২০ হাজার কোটি টাকা দিচ্ছে। অন্যদিকে প্রাতিষ্ঠানিক আমানতকারীদের ১৫ হাজার কোটি টাকার শেয়ার দেওয়া হবে। প্রশাসকরা দায়িত্ব বুঝে নেওয়ার ১৭ দিনের মধ্যে বীমা তহবিল থেকে দুই লাখ টাকা পর্যন্ত পরিশোধ করা হবে। এভাবে ১২ হাজার কোটি টাকা পরিশোধের মাধ্যমে পাঁচ ব্যাংকের প্রায় ৯৩ শতাংশ আমানতকারীর দায় শোধ হবে বলে জানা গেছে। জাতীয় পরিচয়পত্র যাচাইয়ের মাধ্যমে বীমা তহবিল থেকে অর্থ ফেরত দেওয়া হবে। পরবর্তী ধাপে প্রয়োজন অনুযায়ী ব্যাংকের নিজস্ব তহবিল থেকে অর্থ তুলতে পারবেন আমানতকারীরা।

জানতে চাইলে গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংকের চেয়ারম্যান মোহাম্মদ নূরুল আমিন সমকালকে বলেন, হঠাৎ করে আমানত হিসাব বাড়ার বিষয়টি অবশ্যই সন্দেহজনক। নিয়ন্ত্রক সংস্থার পক্ষ থেকে এ ধরনের বিষয় নিয়ে সন্দেহ করা স্বাভাবিক। এ বিষয়ে তিনি নিজেও তাদের ব্যাংকের এমডির সঙ্গে কথা বলেছেন। তিনি বলেন, তবে অনেক ক্ষেত্রে আমানত কবে পাওয়া যাবে অনিশ্চয়তা থেকে বাবা-মা হয়তো তাঁর সন্তানদের নামে টাকা স্থানান্তর করেন। কেউ এমন করলে স্বাভাবিক প্রক্রিয়া। তবে কেউ যদি বিভিন্ন ব্যক্তির নামে হিসাব খোলেন, তার বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে হবে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের সংশ্লিষ্ট একজন কর্মকর্তা সমকালকে বলেন, ব্যক্তি পর্যায়ের আমানতকারীদের অনেকেই ব্যাংকের কর্মকর্তার আত্মীয়-স্বজন বা পরিচিতজন। বিভিন্ন শাখার কর্মকর্তারা হয়তো তাদের আমানত খণ্ড খণ্ড করে রাখার বুদ্ধি দিয়ে থাকতে পারবেন। এছাড়া কিছু ব্যাংকের প্রাণসঞ্চার করতে প্রধান কার্যালয় থেকে অ্যাকাউন্ট খোলা, আমানত বৃদ্ধি ও ঋণ আদায়ের একটি লক্ষ্যমাত্রা দেওয়া হয়েছিল। সেই লক্ষ্যমাত্রা অর্জন দেখাতে গিয়ে কেউ কেউ হয়তো এরকম করতে পারেন। তদন্ত শেষে পুরো বিষয়টি বোঝা যাবে।

আরও পড়ুন

×