কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ডলার ক্রয় তিন বিলিয়ন ডলার ছাড়াল
ফাইল ছবি
বিশেষ প্রতিনিধি
প্রকাশ: ২৯ ডিসেম্বর ২০২৫ | ১০:৫২ | আপডেট: ২৯ ডিসেম্বর ২০২৫ | ১০:৫৪
বাজার থেকে আরও সাড়ে ১১ কোটি ডলার কিনেছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। গতকাল ১২২ টাকা ৩০ পয়সা দরে বিভিন্ন ব্যাংক থেকে ওই পরিমাণ ডলার কেনা হয়। এ নিয়ে চলতি অর্থবছরে এ পর্যন্ত বাংলাদেশ ব্যাংকের ডলার ক্রয় তিন বিলিয়ন বা তিনশ’ কোটি ডলার ছাড়াল। প্রবাসী আয় বা রেমিট্যান্স চাঙ্গা থাকায় বাজারে ডলারের উচ্চ সরবরাহ থেকে বাংলাদেশ ব্যাংক ধারাবাহিকভাবে ডলার কিনছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, বাজার থেকে ডলার কেনার উদ্দেশ্য একদিকে টাকার বিপরীতে এর দর স্থিতিশীল রাখা, অন্যদিকে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বাড়ানো। ডলারের দাম কমলে আমদানি পণ্যের ওপর ইতিবাচক প্রভাব পড়ার সম্ভাবনা থাকলেও কেন্দ্রীয় ব্যাংক রেমিট্যান্সের উচ্চপ্রবাহ ধরে রাখতে এবং রপ্তানি আয় বাড়ানোর উদ্দেশ্যে বাজার থেকে কেনার নীতি বজায় রেখেছে। গতকাল আন্তঃব্যাংকে গড়ে ১২২ টাকা ৩২ পয়সা ধরে ৯ কোটি ৫১ লাখ ডলার বেচাকেনা হয়। গত বুধবার ৪ কোটি ৫৫ লাখ ডলার বিক্রি হয় একই দরে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী বৈদেশিক মুদ্রার গ্রস রিজার্ভ বেড়ে গত বুধবার ৩২ দশমিক ৮০ বিলিয়ন ডলার হয়েছে। আইএমএফের হিসাব পদ্ধতি বিপিএম৬ অনুযায়ী রিজার্ভ উঠেছে ২৮ দশমিক ১১ বিলিয়ন ডলার; যা প্রায় তিন বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, চলতি ডিসেম্বর মাসের ২৭ দিনে প্রবাসীরা ব্যাংকিং চ্যানেলে প্রায় ২৭৫ কোটি ডলার দেশে পাঠিয়েছেন। সব মিলিয়ে চলতি অর্থবছরের এ পর্যন্ত রেমিট্যান্স এসেছে এক হাজার ৫৭৯ কোটি ডলার। আগের অর্থবছরের একই সময়ের চেয়ে যা ১৭ শতাংশ বেশি। গত অর্থবছরে রেকর্ড ৩০ বিলিয়ন বা তিন হাজার কোটি ডলারের বেশি রেমিট্যান্স আসে, যা আগের অর্থবছরের চেয়ে ২৭ শতাংশ বেশি। রেমিট্যান্সে শক্তিশালী অবস্থা বৈদেশিক মুদ্রাবাজারে ডলারের সরবরাহ অনেক বাড়িয়েছে।
রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) হিসাবে, চলতি অর্থবছরের পাঁচ মাসে (জুলাই-নভেম্বর) রপ্তানি আয় বেড়েছে এক শতাংশেরও কম। মাসওয়ারি হিসাবে শেষের টানা চার মাস গত বছরের একই মাসের চেয়ে রপ্তানি আয় কমেছে। শুধু জুলাইতে উচ্চহারে বৃদ্ধির কারণে পাঁচ মাসে বেশি দেখাচ্ছে। রপ্তানি আয়ে এই নিম্নগতি ডলার কেনার ক্ষেত্রে বাংলাদেশ ব্যাংকের সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত করছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর ড. আহসান এইচ মনসুর সম্প্রতি সমকালকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে বলেন, বৈদেশিক মুদ্রাবাজার স্থিতিশীল রাখার জন্য শক্তিশালী রিজার্ভ দরকার। নিজস্ব সক্ষমতা বাড়ানোর মাধ্যমেই রিজার্ভ বাড়াতে হবে। ডলারের দাম কমতে না দেওয়ার পেছনে তিনি ভারতের উদাহরণ টানেন। ভারতে ডলারে বিপরীতে রুপির সাম্প্রতিক সময়ের পতন সে দেশের রপ্তানিকারকদের সুবিধা দিচ্ছে। ফলে এই মুহূর্তে ডলারের দাম কমলে বাংলাদেশের রপ্তানিকারকরা প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে যেতে পারেন বলে মনে করেন গভর্নর। তিনি জানান, চলতি অর্থবছরের মধ্যে বৈদেশিক মুদ্রার মোট রিজার্ভ ৩৫ বিলিয়ন ডলারে উন্নীত করার লক্ষ্যমাত্রা হাতে নেওয়া হয়েছে। গত বছরের আগস্টে তিনি দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকে রিজার্ভ প্রায় ১০ বিলিয়ন ডলার বাড়ানো সম্ভব হয়েছে।
গত সরকারের সময়ে ২০২১ সালের মাঝামাঝি থেকে ডলার বাজার নিয়ে অস্বস্তি শুরু হয়। বাজারে ডলারের জোগান দিতে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের রিজার্ভ থেকে ধারাবাহিকভাবে ডলার বিক্রি করা হয়। যে কারণে গত সরকারের শেষ সময়ে রিজার্ভের বড় পতন হয়। আর ডলারের দর ১২০ টাকা ছাড়ায়। ডলারের সংকট এবং ধারাবাহিকভাবে দর বৃদ্ধিকে উচ্চ মূল্যস্ফীতির বড় কারণ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। আন্তঃব্যাংক ডলারের দর এখন ১২২ টাকায় স্থিতিশীল রয়েছে। আবার ডলার পেতেও কোনো সমস্যা হচ্ছে না। এর ইতিবাচক প্রভাব আমদানির ওপর রয়েছে। গত বছরের তুলনায় মূল্যস্ফীতির হার কমেছে। গত নভেম্বর শেষে যা দাঁড়িয়েছে ৮ দশমিক ২৯ শতাংশে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরের এ পর্যন্ত ব্যাংকগুলো থেকে মোট ৩০৪ কোটি ৬৫ লাখ ডলার কিনেছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। এর বিপরীতে বাজারে ছাড়া হয়েছে ৩৭ হাজার ২৪০ কোটি টাকার মতো। এর মধ্যে শুধু চলতি ডিসেম্বর মাসে ৯২ কোটি ৫ লাখ ডলার কিনেছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। এর বিপরীতে বাজারে দেওয়া হয়েছে ১১ হাজার ২৫০ কোটি টাকার বেশি। মূলত গত জুনে বিভিন্ন উৎস থেকে ঋণের প্রায় ৫ বিলিয়ন ডলারের বেশি যোগ হওয়ার পর জুলাইতে ডলারের দর ১১৯ টাকা ৫০ পয়সায় নেমে যায়। এরপর থেকে ডলার কেনা শুরু করে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। এতে করে ব্যাংকগুলোতে টাকার সরবরাহ কিছুটা বেড়েছে।
- বিষয় :
- কেন্দ্রীয় ব্যাংক
- ডলার ক্রয়
- বাংলাদেশ ব্যাংক
