ঢাকা শুক্রবার, ০৫ জুন ২০২৬

সংকোচনমূলক মুদ্রানীতিই থাকল

সংকোচনমূলক মুদ্রানীতিই থাকল
×

বিশেষ প্রতিনিধি

প্রকাশ: ১০ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ | ০৭:৫৩

| প্রিন্ট সংস্করণ

মূল্যস্ফীতি কাঙ্ক্ষিত পর্যায়ে না নামায় নীতি সুদহার অপরিবর্তিত রেখে সংকোচনমূলক মুদ্রানীতি ঘোষণা করল কেন্দ্রীয় ব্যাংক। বিতর্ক সত্ত্বেও মূল্যস্ফীতি ৭ শতাংশে না আসা পর্যন্ত সংকোচনমূলক মুদ্রানীতির ধারা বজায় রাখা হবে বলে স্পষ্টভাবে জানিয়েছেন গভর্নর ড. আহসান এইচ মনসুর। গতকাল সোমবার বাংলাদেশ ব্যাংকের সভাকক্ষে চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের দ্বিতীয়ার্ধের মুদ্রানীতি ঘোষণার সময় তিনি সুদহার পরিবর্তন না করার যুক্তি তুলে ধরেন।

বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান বাড়াতে ব্যবসায়ীরা সুদহার কমানোর দাবি জানিয়ে আসছেন। সম্প্রতি পরিকল্পনা উপদেষ্টা ড. ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদ এক অনুষ্ঠানে নীতি সুদহার না কমানোর সমালোচনা করেন। এছাড়া অর্থ উপদেষ্টাও নীতি সুদহার কমানোর পক্ষে অবস্থান নিয়েছেন।
সুদহার না কমানোর সমালোচনার জবাবে গভর্নর বলেন, সুদহার কমানোর সময় হয়েছে কিনা তা নিয়ে অনেক কথাই বলা হচ্ছে। মতপার্থক্য থাকতে পারে। তবে সুদহারের নীতির কারণেই বেশির ভাগ লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করা সম্ভব হয়েছে। শুধু মূল্যস্ফীতির লক্ষ্যমাত্রা অর্জন হয়তো সম্ভব হয়নি। ট্রেজারি বিল, বন্ডের সুদহার কিন্তু আগের বছরের তুলনায় কমেছে। সরকারের ঋণ চাহিদার কারণে ব্যক্তি খাতের ঋণ প্রবাহ হয়তো দেখা যাচ্ছে না। ঋণ চাহিদা থাকলে মূল্যস্ফীতির ঊর্ধ্বমুখী চাপ থাকা স্বাভাবিক। নীতি সুদহার উচ্চ রাখার কারণে বিনিময় হার স্থিতিশীল হয়েছে। এটা বিশাল অর্জন। সুদহারের নীতির কারণেই বৈদেশিক লেনদেনের আর্থিক হিসাবে ইতিবাচক ধারা আছে।

তিনি বলেন, অভ্যন্তরীণ ঋণ ১১ শতাংশ বেড়েছে। সমস্যাটা হচ্ছে সরকার বেশি ঋণ নিচ্ছে। গত ডিসেম্বর পর্যন্ত সরকারের ঋণ প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা ছিল ২০ দশমিক ৫০ শতাংশ। অথচ হয়েছে ২৮ দশমিক ৯০ শতাংশ। আগামীতেও বেশি নিতে হবে। সরকার বেশি ঋণ নিলে মুদ্রাবাজারে টাকার সংকট থাকবে। তাতে সুদহার কমবে না। তবে এ সময়ে সরকারের ঋণ না নিয়েও উপায় নেই। কেননা, সরকারের রাজস্ব আয়ে প্রবৃদ্ধি কম। অথচ ব্যয়ের চাপ অনেক বেশি।  বেসরকারি খাতে আগামীতে ঋণ বাড়বে।
মুদ্রানীতিতে প্রধান নীতি সুদহার ১০ শতাংশ এবং নীতি সুদহার করিডোরের ঊর্ধ্বসীমা এসএলএফ সাড়ে ১১ শতাংশে অপরিবর্তিত রাখা হয়েছে। তবে কেন্দ্রীয় ব্যাংকে ব্যাংকগুলোর টাকা রাখায় ব্যবহারিত এসডিএফ ৮ শতাংশ থেকে কমিয়ে সাড়ে ৭ শতাংশ করা হয়েছে। এ বিষয়ে গভর্নর বলেন, ‘আমরা চাই ব্যাংকগুলো কেন্দ্রীয় ব্যাংকে টাকা না রেখে বাজারে তারল্য সৃষ্টি করুক। বিনিয়োগ, আন্তঃব্যাংক বাজারে নিয়ে যাক।’

বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রক্ষেপণ
নতুন মুদ্রানীতিতে আগামী জুন নাগাদ বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধির প্রাক্কলন বাড়িয়ে ধরা হয়েছে ৮ দশমিক ৫০ শতাংশ। আগের মুদ্রানীতিতে যা ৮ শতাংশ ছিল। গত ডিসেম্বর পর্যন্ত ৭ দশমিক ২০ শতাংশ লক্ষ্যমাত্রা থাকলেও অর্জিত হয় ৬ দশমিক ১০ শতাংশ। সরকারি খাতের ঋণ চাহিদা বিবেচনায় আগামী জুন নাগাদ ২১ দশমিক ৬০ শতাংশ ধরা হয়েছে। মুদ্রা সরবরাহ গত ডিসেম্বরে ৭ দশমিক ৮০ শতাংশ লক্ষ্যমাত্রার বিপরীতে অর্জিত হয়েছে ৯ দশমিক ৬০ শতাংশ। আগামী জুনে ১১ দশমিক ৫০ শতাংশে উন্নীত করার লক্ষ্য ঠিক করা হয়েছে।
গভর্নর বলেন, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বাড়ানোর জন্য বাজার থেকে ডলার কিনতে হচ্ছে। এরই মধ্যে ৪৩০ কোটি ডলার কিনে ৫০ হাজার কোটি টাকা বাজারে দেওয়া হয়েছে। যে কারণে মুদ্রা সরবরাহ বেড়েছে। আইএমএফের কর্মসূচির লক্ষ্যের তুলনায় রিজার্ভ এখন অনেক বেশি রয়েছে। মূল্যস্ফীতির লক্ষ্যমাত্রা ৭ শতাংশ এবং জিডিপি প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা ৫ শতাংশ। এমনিতেই মুদ্রা সরবরাহ ১২ শতাংশের বেশি হয়ে যায়।

গভর্নর বলেন, অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে ব্যাংক খাতে অনেক সংস্কার হয়েছে। এটা একটা চলমান প্রক্রিয়া। কয়েকটি আইন প্রণয়ন হয়েছে। আরও কয়েকটি করতে পারলে ভালো হতো। তবে এতগুলো আইন এক বছরে করা কম কিছু না। ৫ ব্যাংক মিলে সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক গঠন করা হয়েছে। এ নিয়ে আমানতকারীদের বিভিন্ন বক্তব্য থাকলেও আদতে তারাই লাভবান হয়েছেন। পরবর্তী সরকারের সময়ে সংস্কার কাজ এগিয়ে নিতে না পারলে দায়িত্বপালন করবেন কিনা এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, ‘এটা তখন বোঝা যাবে। ব্রিজের কাছে গিয়ে বলা যাবে, ব্রিজ পার হবো কিনা। যে সরকারই আসুক আর্থিক খাতের শৃঙ্খলা রক্ষায় তাদের কাজ করতে হবে। বর্তমানে প্রভিশন ঘাটতি রেখে কোনো ব্যাংক আর লভ্যাংশ দিতে পারছে না। এ ধারা কয়েক বছর চালিয়ে নিতে পারলে ব্যাংক খাতের পরিস্থিতি বদলে যাবে।’ 
অপর এক প্রশ্নের উত্তরে গভর্নর বলেন, পাচার হওয়া অর্থ ফেরত আনতে বিভিন্ন উদ্যোগ চলমান আছে। যে ১১টি গ্রুপের বিষয়ে সরকার তদন্ত করছিল, দুদকের মাধ্যমে কয়েকটি মামলা হয়েছে। দেশের বাইরে আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য একটি করে লিড ব্যাংক নির্বাচন করে ১২টি বিদেশি আইনি পরামর্শক প্রতিষ্ঠান নিয়োগ দেওয়া হয়েছে।

আরও পড়ুন

×