আলোচনা সভায় বক্তারা
ব্যাংক লুটেরাদের ফেরার সুযোগ অর্থনীতিকে ঝুঁকিতে ফেলেছে
গতকাল শনিবার ব্যাংক রেজল্যুশন আইন নিয়ে আলােচনায় অতিথিরা ফটাে রিলিজ
বিশেষ প্রতিনিধি
প্রকাশ: ২৬ এপ্রিল ২০২৬ | ০৭:৩৩
| প্রিন্ট সংস্করণ
ব্যাংক চলে আস্থার ওপর। এ খাতের আস্থা ধরে রাখতে স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা ও অপরাধীদের শাস্তি নিশ্চিত করা জরুরি। তা না করে ব্যাংক রেজল্যুশনে নতুন ধারা যুক্ত করার মাধ্যমে আগের মালিকদের ফিরে আসার সুযোগ রাখা হয়েছে। এ ধরনের পরিস্থিতি জনমনে আস্থাহীনতা তৈরি করে পুরো অর্থনীতিকে ঝুঁকির মধ্যে ফেলেছে। গতকাল ভয়েস ফর রিফর্ম আয়োজিত এক গোলটেবিল বৈঠকে বক্তারা এসব কথা বলেন।
ঢাকার কারওয়ান বাজারে বিডিবিএল ভবনে ‘সংশোধিত ব্যাংক রেজল্যুশন আইন-২০২৬ : আবারও ঝুঁকির মুখে ব্যাংকিং খাত’ শীর্ষক এ গোলটেবিল বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। ভয়েস ফর রিফর্মের সমন্বয়ক ফাহিম মাশরুর অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করেন।
সুজন সম্পাদক ড. বদিউল আলম মজুমদার বলেন, ‘এস আলম গ্রুপের ২০১৭ সালে ইসলামী ব্যাংক দখলের সময় জেএমসি বিল্ডার্সের প্রতিনিধি পরিচালক হিসেবে লুটের সহযোগী ছিলেন বর্তমান রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন। লুটেরার সহযোগী হিসেবে এখন উনার থাকার কথা জেলে। অথচ আছেন বঙ্গভবনে। এ নিয়ে জাতি হিসেবে আমরা আত্মমর্যাদাসম্পন্ন হতে পারি কিনা, মাথা উঁচু করে কথা বলতে পারি কিনা– সে প্রশ্ন রেখে গেলাম।’
তিনি বলেন, ব্যাংক খাতের প্রতি আস্থা ফেরানোর জন্য তিনটি বিষয় গুরুত্ব দিতে হবে। প্রথমত, চোর ধরে দৃষ্টান্তমূলক কঠোর শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে। দ্বিতীয়ত, আবার যেন অনিয়মের পুনরাবৃত্তি না করতে পারে সে জন্য পদ্ধতিগত সংস্কার আনতে হবে। তৃতীয়ত, প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার করতে হবে।
আলোচনার বিষয়ের বাইরে তিনি বলেন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে সম্প্রতি সহিংসতা শুরু হয়েছে। চট্টগ্রামে দীর্ঘদিন ধরে চলছে। এর সমাধান করতে না পারলে বিশ্ববিদ্যালয়গুলো রণক্ষেত্রে পরিণত হবে।
বিআইবিএমের সাবেক মহাপরিচালক ড. তৌফিক আহমদ চৌধুরী বলেন, বিগত সরকারের সময়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের চোখের সামনে সব লুট হয়েছে। ফলে ব্যাংক রেজল্যুশন না করে বাংলাদেশ ব্যাংকের জন্যও একটা রেজল্যুশন দরকার। তিনি বলেন, এখন হয়তো বলা হচ্ছে, সরকার যে অর্থ দিয়েছে তার সাড়ে ৭ শতাংশ দিয়ে আগের পরিচালকরা মালিকানা নিতে পারবে। এস আলমদের ফিরিয়ে আনতে এক পর্যায়ে দেখা যাবে এই শর্ত শিথিল করে শূন্যে নামিয়ে আনা হয়েছে।
তিনি বলেন, দেশে একের পর এক ব্যাংকের লাইসেন্স দিলেও কোনো এক্সিট পলিসি করা হয়নি। যে কারণে এখন জনগণের টাকায় ব্যাংক একীভূত করা হচ্ছে। মানুষ টাকা রেখেছে তার শতভাগ টাকা ফেরত দিতে হবে– এটিই নিয়ম। আমানতকারীর জন্য ‘বেইল আউট’ থাকতে হবে। তা না করে আমাদের এখানে কেবল ঋণখেলাপিদের জন্য ‘বেইল আউট’ করা হয়।
লন্ডনের সোয়াস বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. মোসতাক খান বলেন, অন্য দুর্নীতির সাথে ব্যাংক খাতের তুলনা করা যাবে না। ব্যাংক জাতীয় নিরাপত্তার মতো ইস্যু। এখানে দুর্নীতি ঢুকে পড়লে পুরো দেশ ধসে পড়তে পারে। ব্যাংক চলে আস্থার ওপরে। আস্থা ধরে রাখতে হলে এ খাতের স্বচ্ছতা বাড়াতে হবে। অপরাধীদের শাস্তি দেওয়ার মাধ্যমে কঠোর বার্তা দিতে হবে। তা না করে আগের লুটেরাদের ফিরে আসার ধারা যুক্ত করে পুরো অর্থনীতিকে ঝুঁকির মধ্যে ফেলা হয়েছে। আস্থাহীনতার কারণে দেশের সবচেয়ে ভালো ব্যাংক থেকেও টাকা তুলতে শুরু করলে যে কোনো সময় ধসে পড়তে পারে। তিনি বলেন, কয়েকটি ব্যাংক দখল করে চুরির বিষয়টি গভর্নর থেকে একটা পিয়ন পর্যন্ত জানত। রাষ্ট্রীয় সহযোগিতায় সেই টাকা তারা বিদেশে পাচার করেছে। এখন দেশ-বিদেশের সম্পদ উদ্ধারের জোর চেষ্টা করতে হবে।
নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যবসা বিভাগের ডিন ড. ওয়ারেসুল করিম বলেন, রেজল্যুশন আইনে নতুন ধারা ব্যবহার করে এস আলম ও তাঁর সংশ্লিষ্টদের রুগ্ণ ব্যাংকে ফিরিয়ে আনা নয়, বরং দেশের ইসলামী ব্যাংকের দখল নেওয়া এর উদ্দেশ্য হতে পারে। এমনভাবে আইন করা হবে, চাইলে তারা এক টাকা দিয়েও মালিকানায় আসতে পারবে। তিনি বলেন, মুদি দোকান বা অন্য ব্যবসার মতো করে ব্যাংক ব্যবসাকে ভাবলে হবে না। এখানে আস্থা ধরে রাখতে না পারলে পুরো দেশের অর্থনীতি ঝুঁকিকে পড়তে পারে।
এনসিপির যুগ্ম আহ্বায়ক সারোয়ার তুষার বলেন, সরকার ব্যাংক রেজল্যুশন অধ্যাদেশই বাতিল করতে চেয়েছিল। তবে আইএমএফের প্রশ্নের মুখে পারেনি। যে ধারা যুক্ত করেছে, তা মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা। এস আলমদের ফিরিয়ে আনার সুযোগ রেখে আইন সংশোধন করা হয়েছে। তিনি বলেন, এখন কৃষক কার্ডের নামে বাড়তি খরচ করা হচ্ছে। শুধু এই কার্ডের প্রচারের বিল বোর্ডের জন্য ৪১২ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে। তাঁর মতে, জ্বালানি খাতের সংকট সৃষ্টির বিষয়টি সরকারি দলের লোকদের ব্যবসার সুযোগ ছাড়া কিছুই নয়।
ডিসিসিআইর সাবেক সভাপতি শামস মাহমুদ বলেন, দেশের একটি সিকিউরিটি গার্ডেরও যোগ্যতা নির্ধারণ করা থাকলেও ব্যাংকের পরিচালকের জন্য তা নেই। শেয়ারবাজার থেকে ২ শতাংশ শেয়ার কিনে দেশের সবচেয়ে বড় ইসলামী ব্যাংক দখল করা হয়েছিল। এসব ঠিক করা দরকার।
প্রথম আলোর হেড অব অনলাইন শওকত হোসেন মাসুম বলেন, কিছু ব্যাংক পরিকল্পিতভাবে চলতে দেওয়া হয়নি। আর কিছু ব্যাংক যে দেউলিয়ার পর্যায়ে যাবে, আগেই বোঝা গিয়েছিল। এখন পাঁচটি দুর্বল ব্যাংক একীভূত করে সফল হওয়া খুবই দুরূহ ব্যাপার। সবাই যখন ভুলে যাবে এক পর্যায়ে হয়তো আগের মালিকদের ফিরিয়ে আনা হবে।
সিএফএ অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি আসিফ খান বলেন, ব্যাংকের আমানতকারীরা জানেন না, আদৌ তারা টাকা ফেরত পাবেন কিনা। এটি আস্থাহীনতা তৈরি করেছে। এ জন্য আমানতকারীদের দীর্ঘমেয়াদি বন্ড দেওয়া যেতে পারে।
- বিষয় :
- আলোচনা সভা
