ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

জাইকার ঋণে সুদের হার ৩ শতাংশ ছাড়াল

জাইকার ঋণে সুদের হার ৩ শতাংশ ছাড়াল
×

আবু হেনা মুহিব

প্রকাশ: ০৫ মে ২০২৬ | ০৭:১৪

| প্রিন্ট সংস্করণ

জাপান সরকারের আন্তর্জাতিক সহযোগিতা সংস্থা জাইকা বাংলাদেশের অন্যতম বড় উন্নয়ন সহযোগী। দেশের প্রথম মেট্রোরেল, প্রথম গভীর সমুদ্রবন্দর মাতারবাড়ী সমুদ্রবন্দর ও হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের টার্মিনালের মতো মেগা প্রকল্প নির্মাণ করা হয়েছে জাইকার ঋণ ও কারিগরি সহায়তায়। দীর্ঘদিন নমনীয় সুদে জাইকার ঋণ পাওয়া গেছে। এই সুযোগ সীমিত হয়ে এসেছে। জাইকার ঋণে সুদহার বেড়েছে ৩০ শতাংশ। গত ১৫ এপ্রিল থেকে নতুন সুদহার কার্যকর হয়েছে।

অর্থ মন্ত্রণালয়ের অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগ (ইআরডি) সূত্রে জানা গেছে, জাইকার ঋণের সুদের নতুন হার এখন ৩ দশমিক শূন্য ৫ শতাংশ। গত ১৪ এপ্রিল পর্যন্ত এ হার ছিল ২ দশমিক ৩৫ শতাংশ। অন্যদিকে পরামর্শক-সংক্রান্ত ঋণে সুদের হার বেড়ে এখন ১ শতাংশ, যা এতদিন শূন্য দশমিক ৭৫ শতাংশের মতো ছিল। ২০১৫ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশের জন্য জাইকার ঋণের সুদের হার ছিল মাত্র শূন্য দশমিক ১ শতাংশ। এরপর ২০২২ সাল পর্যন্ত এ হার ছিল শূন্য দশমিক ৭ শতাংশ। এরপর ক্রমে অন্যান্য উন্নয়ন সহযোগী দেশ ও সংস্থার মতো জাইকার ঋণেও সুদ বাড়ছে। 

জাইকার ঋণে সুদের হার বাড়লেও ঋণ পরিশোধে সময়সীমা আগের মতো আছে। পাঁচ বছরের রেয়াতকালসহ ২৫ বছরে পরিশোধ করার সুযোগ বহাল থাকছে। অফিসিয়াল ডেভেলপমেন্ট অ্যাসিস্ট্যান্স (ওডিএ) ঋণ ও কারিগরি সহায়তা স্কিমের আওতায় ঋণ দিয়ে থাকে জাইকা। এ ছাড়া কিছু অনুদানও রয়েছে সংস্থার। দ্বিপক্ষীয় উন্নয়ন সহযোগী দেশ হিসেবে জাপানের কাছ থেকে বড় ধরনের সহায়তা পেয়ে থাকে বাংলাদেশ।

মূলত ২০১৫ সালে নিম্ন আয়ের দেশ থেকে নিম্ন মধ্যম আয়ের দেশে উন্নীত হওয়ার পর থেকে উন্নয়ন সহযোগীদের দেওয়া ঋণের ওপর সুদ বাড়তে শুরু করে। মাথাপিছু আয় বেড়ে যাওয়াসহ আরও কিছু বিষয় বিবেচনায় নিয়ে বিভিন্ন পর্যায়ে ঋণে সুদের হার বাড়িয়ে থাকে উন্নয়ন সহযোগীরা। করোনা-পরবর্তী অর্থনীতি পুনর্গঠনে সারাবিশ্বেই ঋণের চাহিদা বেড়েছে। এ কারণে অন্য দেশগুলোর জন্যও সুদের হার বাড়িয়েছে উন্নয়ন সহযোগীরা। তবে স্বল্পোন্নত দেশের (এলডিসি) তালিকা থেকে উত্তরণকে কেন্দ্র করে উল্লেখযোগ্য হারে কমছে নমনীয় ঋণ; বাড়ছে বাজারভিত্তিক হারের ঋণ। 

ইআরডির একাধিক কর্মকর্তা সমকালকে বলেন, এলডিসি থেকে উত্তরণের আনুষ্ঠানিক ঘোষণা না এলেও মাথাপিছু আয়, মোট দেশজ উৎপাদন (জিডিপি) ও অর্থনৈতিক অন্যান্য সূচকের অগগ্রতির বিবেচনা থেকে নমনীয় ঋণের পরিমাণ উল্লেখযোগ্য হারে কমছে। বিপরীতে বাড়ছে বাজারভিত্তিক ঋণ। এ ছাড়া বাজারভিত্তিক সিকিউরড ওভারনাইট ফাইন্যান্সিং রেটের (সোফর) সঙ্গে যুক্ত ঋণগুলো এখন অনেক বেশি ব্যয়বহুল হয়ে উঠেছে। বৈশ্বিক সুদের হার বাড়ার কারণে এসব ঋণ আর আগের মতো স্বল্পসুদের গণ্য হচ্ছে না। বৈশ্বিক সুদহার নির্ধারণের অন্যতম মাপকাঠি লন্ডন ইন্টার ব্যাংক অফারড রেটের (লাইবর) পরিবর্তে সোফর নামে নতুন ঋণ ব্যবস্থা চালুর ফলেও সুদহারে পরিবর্তন এসেছে। রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের প্রভাবে সোফর রেট বেড়ে ৫ শতাংশের বেশি হয়েছে। এ কারণে বাজারভিত্তিক ঋণের জন্য বাংলাদেশকে এখন গড়ে ৫ শতাংশ সুদ পরিশোধ করতে হচ্ছে।

ইআরডির তথ্য-উপাত্ত বলছে, ২০২২-২৩ অর্থবছর থেকেই নমনীয় ঋণ কমে আসার বিপরীতে বাজারভিত্তিক ঋণের হার উল্লেখযোগ্য হারে বাড়তে শুরু করে। ওই অর্থবছর সরকারের মোট বিদেশি ঋণের মধ্যে বাজারভিত্তিক সুদে ঋণ ছিল ২৫ দশমিক ৯ শতাংশ। কর্মকর্তারা মনে করছেন, আগামী অর্থবছরে বাজারভিত্তিক ঋণের হার আরও বাড়তে পারে এবং তা মোট বৈদেশিক ঋণের দুই-তৃতীয়াংশ হতে পারে।
ইআরডির আমেরিকা ও জাপান অনুবিভাগের ঊর্ধ্বতন একজন কর্মকর্তা গতকাল সমকালকে বলেন, বাংলাদেশ সরকার অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে যে হারে ঋণ নিয়ে থাকে, তার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে উন্নয়ন সহযোগীরা সুদের হার নির্ধারণ করছে এখন। সার্বিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতিও বিবেচনায় নিয়ে থাকে তারা। এ জন্য অর্থনীতির গতি-প্রকৃতির ওপর সার্বক্ষণিক নজর রাখে তারা। জাইকাও একই পদ্ধতিতে ঋণদান এবং সুদের হার নির্ধারণ করছে। জাইকা শুধু বাংলাদেশের জন্য নয়; বিশ্বের যেসব দেশে ঋণ রয়েছে, সব দেশের জন্যই ঋণে সুদের হার ইতোমধ্যে বাড়িয়েছে। নাম প্রকাশ না করার অনুরোধ জানিয়ে ওই কর্মকর্তা বলেন, জাইকা নতুন করে সুদের হার বাড়ালেও অনেক উন্নয়ন সহযোগী দেশ এবং সংস্থার তুলনায় এখনও তা কম। 

৫০ কোটি ডলার বাজেট সহায়তা
বাংলাদেশকে বাজেট সহায়তা বাবদ আরও ৫০ কোটি ডলার অর্থ সহায়তা দিচ্ছে জাইকা। এখনও চূড়ান্ত না হলেও আলোচনার পর এই অর্থ পাওয়ার বিষয়ে সরকার অত্যন্ত আশাবাদী। চলতি অর্থবছরের বাকি দুই মাসের কম সময়ের মধ্যেই এই অর্থ পাওয়া যেতে পারে বলে জানিয়েছেন ইআরডি কর্মকর্তারা। 
জ্বালানি সংকটে জরুরি আমদানি ব্যয়, সরকারের সামাজিক সুরক্ষা ব্যয়সহ অন্যান্য ব্যয় নির্বাহে উন্নয়ন সহযোগীদের কাছে বাজেট সহায়তা চেয়েছে সরকার। অর্থমন্ত্রী ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী এবং প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনা উপদেষ্টা ড. রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর দুই দফা উন্নয়ন সহযোগীদের সঙ্গে এ বিষয়ে বৈঠক করেছেন। সূত্র জানায়, ওই বৈঠকে কিছু সংস্থা নির্বাচনী ইশতেহার বাস্তবায়ন এবং সংকট কাটিয়ে উঠতে সরকারকে সহযোগিতার আশ্বাস দিয়েছে।
এর আগে উন্নয়ন সহযোগীদের কাছে আনুষ্ঠানিক চিঠি দেওয়া হয় সরকারের পক্ষ থেকে। বিশ্বব্যাংক, এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি), জাইকা, এশীয় অবকাঠামো বিনিয়োগ ব্যাংক (এআইআইবি), জার্মান ঋণদাতা সংস্থা কেএফডব্লিউ ও ওপেক ফান্ড ফর ইন্টারন্যাশনাল ডেভেলপমেন্টের (ওএফআইডি) মতো উন্নয়ন সহযোগীরা রয়েছে এই তালিকায়।

আরও পড়ুন

×