ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

ঋণ জালিয়াতি ও অর্থ পাচারে অভিযুক্তরা সুবিধা পাবে না

ঋণ জালিয়াতি ও অর্থ পাচারে অভিযুক্তরা সুবিধা পাবে না
×

ওবায়দুল্লাহ রনি

প্রকাশ: ০৬ মে ২০২৬ | ০৭:৩৬

| প্রিন্ট সংস্করণ

বন্ধ কারখানা সচলের জন্য কম সুদে ঋণ দিতে বিশেষ পুনঃঅর্থায়ন তহবিল গঠনের উদ্যোগ প্রায় চূড়ান্ত করে এনেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। এ সম্পর্কিত নীতিমালার খসড়া অনুসারে, তহবিল থেকে বাজারভিত্তিক সুদে ব্যাংকগুলো ঋণ দেবে। এর বিপরীতে সরকার থেকে ৫ শতাংশ হারে সুদ ভর্তুকি দেওয়া হতে পারে। এ জন্য ২০ হাজার কোটি টাকার তহবিল গঠনের বিষয়ে ভাবা হচ্ছে। তবে ঋণ জালিয়াতি, অর্থ পাচারে অভিযুক্ত কেউ এ সুবিধা নিতে পারবে না। তহবিল চূড়ান্ত হবে সুদ ভর্তুকির বিষয়ে সরকারের সম্মতিপত্র পাওয়ার পর।

জানা গেছে, ব্যাংকগুলো থেকে প্রাথমিকভাবে বন্ধ কারখানার একটি তালিকা নিয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। এ সম্পর্কিত খসড়া নীতিমালা অনুসারে, নিয়ন্ত্রণবহির্ভূত কারণে যেসব কারখানা বন্ধ হয়ে গেছে, কেবল তারা অর্থায়ন সুবিধার আবেদন করতে পারবে। এ ক্ষেত্রে ওই কারখানার বিদ্যুৎ ও গ্যাস সংযোগ আছে কিনা, যন্ত্রপাতি ভালো রয়েছে কিনা এবং আগে ঋণ নিয়ে তহবিল স্থানান্তরের অভিযোগ নেই– তা নিশ্চিত হতে হবে। এরপর ব্যাংকার-গ্রাহক সম্পর্কের ভিত্তিতে সুবিধা দেওয়া যাবে। স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘ মেয়াদে তহবিল সুবিধা নিতে পারবেন গ্রাহক। বিশেষ করে ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পকারখানা এ তহবিল থেকে প্রাধান্য পাবে। প্রথম বছরের জন্য সরকার থেকে এই ঋণের বিপরীতে ৫ শতাংশ হারে ভর্তুকি দেওয়ার প্রস্তাব করা হয়েছে। বাকি সুদ গ্রাহককে দিতে হবে।

বিএনপির নির্বাচনী ইশতেহারে সরকারের প্রথম ১৮ মাসে এক কোটি কর্মসংস্থান সৃষ্টির প্রতিশ্রুতি ছিল। তারই অংশ হিসেবে বন্ধ কারখানা সচল করার এ উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। অর্থায়ন সুবিধার পাশাপাশি এলসি খোলাসহ অন্যান্য ব্যাংকিং সুবিধার বিষয়ও নীতিমালায় উল্লেখ থাকবে। বাংলাদেশ ব্যাংকের ডেপুটি গভর্নর ড. মো. কবির আহাম্মদের নেতৃত্বে গঠিত ১৯ সদস্যের কমিটির সুপারিশের ভিত্তিতে এসব উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এই কমিটি বিভিন্ন ব্যবসায়ী নেতা, ব্যাংকারসহ নানা পর্যায়ের সঙ্গে বৈঠকের পর নীতিমালার খসড়া প্রস্তুত করেছে।

বাংলাদেশ ব্যাংক সূত্র জানিয়েছে, ১০টি ব্যবসায়ী গ্রুপের অর্থ পাচার, ঋণ জালিয়াতি, কর ফাঁকিসহ বিভিন্ন অনিয়ম তদন্তে চার সংস্থার সমন্বয়ে যৌথ তদন্ত দল কাজ করছে। তদন্তের আওতায় থাকা গ্রুপগুলোসহ যাদের বিষয়ে জালিয়াতি বা অর্থ পাচারের মামলা হয়েছে কিংবা যাদের বিরুদ্ধে তদন্ত চলমান রয়েছে, তাদের কেউ বিশেষ এ তহবিল থেকে সুবিধা নিতে পারবে না। বর্তমানে এস আলম গ্রুপ, সাবেক ভূমিমন্ত্রী সাইফুজ্জামান চৌধুরী জাভেদ পরিবারের আরামিট, সাবেক প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টার মালিকানাধীন বেক্সিমকো, নজরুল ইসলাম মজুমদারের নাসা, সিকদার, নাবিল, বসুন্ধরা, সামিট, ওরিয়ন ও জেমকন গ্রুপের বিষয়ে তদন্ত চলছে। এরই মধ্যে এসব গ্রুপের পাচার করা অর্থ ফেরত আনার জন্য একটি করে লিড ব্যাংক নির্বাচন করে দেওয়া হয়েছে। ওই ব্যাংক বিদেশি আইনি সহায়তাকারী প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে অপ্রকাশযোগ্য চুক্তি (এনডিএ) সম্পন্ন করেছে। এর মাধ্যমে দেশের ঋণ জালিয়াতি ও অর্থ পাচারের বিভিন্ন তথ্য বিনিময় করা হবে।

বাংলাদেশ ব্যাংক সূত্র জানিয়েছে, তহবিলের বিশেষ সুবিধা পাওয়ার ক্ষেত্রে ব্যাংক কোম্পানি আইন মানতে হবে। এ জন্য ঋণ নিয়মিত থাকা বাধ্যতামূলক। যে কারণে ঋণ নিয়মিত করে কারখানা সচলের জন্য ডাউনপেমেন্ট জমা দেওয়ার শর্ত শিথিল করা হতে পারে। কারখানা চালুর পর তহবিল সহায়তা এবং আমদানি-রপ্তানি কার্যক্রমের জন্য ব্যাংকিং সুবিধা দেওয়া হবে। তবে ব্যাংকগুলো কাকে এসব সুবিধা দেবে না দেবে, সেটা সংশ্লিষ্ট ব্যাংকের নিজস্ব বিষয়। কেননা পুনঃঅর্থায়ন তহবিল আদায় হোক বা না হোক ব্যাংক তহবিলের জন্য দায়বদ্ধ থাকে। পুনঃঅর্থায়নের মেয়াদ শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে কেন্দ্রীয় ব্যাংক সংশ্লিষ্ট ব্যাংকের চলতি হিসাব থেকে সমপরিমাণ টাকা কেটে নেয়। ফলে অর্থায়নের ক্ষেত্রে ব্যাংকার-গ্রাহক সম্পর্ক প্রাধান্য পাবে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তারা জানান, পুনঃঅর্থায়ন তহবিল সুবিধা দেওয়ার ক্ষেত্রে নিরুৎসাহিত করে আসছে আইএমএফ। সংস্থাটির চলমান ৫৫০ কোটি টাকার ঋণ কর্মসূচির অন্যতম একটি শর্ত নতুন করে পুনঃঅর্থায়ন তহবিল গঠন করা যাবে না। বরং বিদ্যমান তহবিল ধীরে ধীরে কমিয়ে আনতে হবে। যে কারণে এরই মধ্যে রপ্তানি উন্নয়ন তহবিলের (ইডিএফ) আকার কমিয়ে আনা হয়েছে। অন্য বিভিন্ন পুনঃঅর্থায়ন তহবিলের মেয়াদ না বাড়ানো কিংবা আকার কমানো হয়েছে। কেননা, কেন্দ্রীয় ব্যাংক সরাসরি টাকা দিলে মূল্যস্ফীতিকে উস্কে দেয়। তবে দেশ ও বৈশ্বিক বর্তমান অর্থনৈতিক বাস্তবতায় এ তহবিলের প্রয়োজনীয়তার বিষয়টি আইএমএফের সঙ্গে ভালোভাবে আলোচনা করে নেওয়া হচ্ছে বলে জানা গেছে।

আরও পড়ুন

×