শেয়ারবাজারে ব্যাপক দর পতন
সমকাল প্রতিবেদক
প্রকাশ: ০৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ১১:২৯
ব্যাপক দর পতন হয়েছে শেয়ারবাজারে। গতকাল রোববার সপ্তাহের প্রথম কর্মদিবসে লেনদেনযোগ্য ৩৫২ কোম্পানির মধ্যে ৩২৪টিই দর হারিয়েছে, যা মোটের ৯১ শতাংশের বেশি। এতে প্রধান শেয়ারবাজার ডিএসইর প্রধান মূল্য সূচক ১০৩ পয়েন্ট হারিয়ে ৫৫৫৮ পয়েন্টে নেমেছে। সূচক পতনের হার ১ দশমিক ৮৩ শতাংশ। এ দর পতন বর্তমান কমিশনের (বিএসইসির নতুন নেতৃত্ব) সময়তো বটেই, গত ৫ এপ্রিলের বা সর্বশেষ পাঁচ মাসের সর্বোচ্চ।
দিনের লেনদেন পর্যবেক্ষণে দেখা যায়, সকাল ১০টায় লেনদেন শুরুর প্রথম তিন মিনিটে সূচকটি ৬ পয়েন্ট বেড়েছিল। এর পর থেকে পতন শুরু হলে দুপুর ২টা পর্যন্ত টানা পতন হয়েছে। এমন দর পতনে সাধারণ বিনিয়োগকারীদের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়েছে। ফলে কেউ কেউ লোকসানে শেয়ার বিক্রি করেছে। অবশ্য লেনদেন আগের দিনের তুলনায় পৌনে দুইশ কোটি টাকা কমে ৫৪৫ কোটি টাকায় নেমেছে।
পর্যালোচনায় দেখা গেছে, চার সপ্তাহ ধরে ক্রমাগত দর পতন হচ্ছে। এর আগে টানা প্রায় দুই মাসে শেয়ারদর বৃদ্ধিতে ভর করে ডিএসইএক্স সূচক ৫২০০ পয়েন্ট থেকে গত ১৪ জুলাই ৫৯০০ পয়েন্ট পার করে। এর পর টানা প্রায় এক মাস সূচকটি ৫৯০০ পয়েন্টের মধ্যে ওঠানামা করার পর ১২ আগস্ট থেকে ফের নিম্নমুখী হয়।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একটি ব্রোকারেজ হাউসের কর্মকর্তা জানান, দুই মাস ধরে খলিল, হিরো– এমন কয়েকজনের শেয়ার লেনদেনের তথ্য নিচ্ছে ডিএসই ও এসইসি। এতে তাদের কারণে যেসব শেয়ারের দর বাড়ছিল, সেগুলো ক্রমাগত দর হারাচ্ছে। এদের অনুসরণ করে যারা শেয়ার কেনাবেচা করেন, তারা আরও দর হারানোর ভয়ে শেয়ার বিক্রি করছে বলে শুনছি। এতে দর পতন বাড়ছে।
এ বিষয়ে ডিএসইর কর্মকর্তাদের কোনো ভাষ্য পাওয়া যায়নি। তবে নিয়ন্ত্রক সংস্থা বিএসইসির নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র আবুল কালাম সমকালকে বলেন, এটা ঠিক যে, কোনো শেয়ারের অস্বাভাবিক দর ওঠানামা করলে স্টক এক্সচেঞ্জ খোঁজ নেয়। এটা এক্সচেঞ্জের রুটিন দায়িত্ব। তবে এ মুহূর্তে বিএসইসি থেকে এভাবে কোনো তথ্য নেওয়া হচ্ছে না।
সাম্প্রতিক দর পতন প্রসঙ্গে জানতে চাইলে ডিএসই ব্রোকার্স অ্যাসোসিয়েশন (ডিবিএ) সভাপতি সাইফুল ইসলাম সমকালকে বলেন, প্রথমত জ্বালানি সংকট অর্থনীতিতে বড় চাপ তৈরি করেছে। এর নেতিবাচক প্রভাব থাকতে পারে। এর বাইরে বাজারে পরিচিত কিছু কারসাজিকারীর (গ্যাম্বলার) বিরুদ্ধে খোঁজখবর নেওয়া এবং তাদের বিরুদ্ধে ফৌজদারি মামলা করার খবরও একটা কারণ হতে পারে– এমনটা কাউকে বলতে শুনছি।
ডিবিএ সভাপতি বলেন, বাজারে এমন আলোচনা ছড়িয়ে পড়েছে, নির্দিষ্ট কিছু শেয়ারের দর পতনের কারণ হলো সংশ্লিষ্টদের অ্যাকাউন্ট ও লেনদেনের খোঁজ নেওয়া হচ্ছে, তালিকা তৈরি করা হচ্ছে বা তাদের ডেকে পাঠানো হচ্ছে। এটা সত্যও হতে পারে, আবার গুজবও হতে পারে। তবে বিষয়টি অনুসন্ধান করে দেখেছি, শীর্ষ পাঁচ ব্রোকারেজ হাউসের কোথাও এ ধরনের কোনো নির্দিষ্ট জিজ্ঞাসাবাদের নোটিশ আসেনি।
সাইফুল ইসলাম বলেন, অস্বাভাবিক কোনো লেনদেন বা কারসাজি হলে নিয়ন্ত্রক সংস্থা বা স্টক এক্সচেঞ্জ তদন্ত করবে, এটাই স্বাভাবিক প্রক্রিয়া। তিনি আশ্বস্ত করেন, যদি কারও বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট অভিযোগে কোনো তদন্ত বা ব্যবস্থা নেওয়াও হয়, তবে সাধারণ বিনিয়োগকারীদের তাতে আতঙ্কিত হওয়ার কোনো কারণ নেই। বাজারের শৃঙ্খলার জন্য এটাই তাদের কাজ।
অবশ্য বড় দর পতনের পেছনে নিয়ন্ত্রক সংস্থার নীতি এবং তাদের জনসমক্ষে দেওয়া বক্তব্যকে দায়ী করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজনেস স্টাডিজ অনুষদের ডিন ড. আল আমীন। তিনি বলেন, দেশে এমন বড় কোনো অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটেনি, যার কারণে শেয়ারবাজারে এত বড় ধস নামতে পারে। বরং নিয়ন্ত্রক সংস্থার শীর্ষ চেয়ার থেকে নানা সংবেদনশীল বিষয়ে নানা মন্তব্য করা হচ্ছে। এতে মানুষ বিভ্রান্ত হচ্ছে। আমরা জানি, এ বাজারে সচেতন বিনিয়োগকারী কম। ফলে এমন কোনো কথা বলা উচিত নয়, যা সাধারণ বিনিয়োগকারীরা স্বাভাবিকভাবে নিতে পারবে না। নিয়ন্ত্রক সংস্থার উচিত ঢালাও মন্তব্য না করে, বাজারে যদি কোনো অস্বাভাবিকতা থেকে থাকে, তবে প্রকৃত দায়ীদের খুঁজে বের করে বিচারের আওতায় আনা।
বাজার সংক্ষেপ
গতকাল ডিএসইতে সর্বোচ্চ সাড়ে ১০ শতাংশ দর হারিয়েছে আমরা নেটওয়ার্কস কোম্পানির শেয়ার। এ ছাড়া সাম্প্রতিক সময়ের আলোচিত শেয়ারগুলোর মধ্যে ডমিনেজ, সায়হামটেক্স, সায়হাম কটন, শার্প ইন্ডাস্ট্রিজ, সী পার্ল, মেঘনা পেটসহ বেশ কিছু শেয়ারের দর ৭ থেকে ৯ শতাংশ পর্যন্ত দর হারিয়েছে।
খাতওয়ারি পর্যালোচনায় দেখা গেছে, প্রতিটি খাতে উল্লেখযোগ্য দর পতন হয়েছে। এর মধ্যে গড়ে সর্বাধিক পৌনে ৫ শতাংশ হারে দর হারিয়েছে বস্ত্র এবং ভ্রমণ ও অবকাশ খাতের শেয়ার। এ ছাড়া বীমা, সিরামিক, তথ্যপ্রযুক্তি, কাগজ ও ছাপাখানা খাতের গড়ে ৩ থেকে পৌনে ৪ শতাংশ দর পতন হয়েছে।
- বিষয় :
- শেয়ারবাজার