বাংলাদেশের ঋণমানের পূর্বাভাসে ইতিবাচক পরিবর্তন আনল মুডিস
সমকাল প্রতিবেদক
প্রকাশ: ১৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ০৮:১৪ | আপডেট: ১৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ০৯:৪৬
| প্রিন্ট সংস্করণ
আন্তর্জাতিক ক্রেডিট রেটিং সংস্থা মুডিস রেটিং বাংলাদেশের ঋণমান পর্যালোচনায় সার্বিক অর্থনৈতিক পূর্বাভাস বা আউটলুক ‘নেতিবাচক’ থেকে পরিবর্তন করে ‘স্থিতিশীল’ ঘোষণা করেছে। এর পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদি রেটিং মান ‘বি২’ এবং স্বল্পমেয়াদি রেটিং ‘নট প্রাইম’ হিসেবে অপরিবর্তিত রেখেছে।
মুডিস বলেছে, ২০২৪ সাল পর্যন্ত আগের কয়েক বছরে রাজনৈতিক সংকট থেকে সৃষ্ট অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা এবং বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ নিয়ে উদ্বেগ সাময়িকভাবে হলেও কেটেছে। এর ফলে নিকট ভবিষ্যতে দেশের ক্রেডিট রেটিং আরও অবনতি হওয়ার আশঙ্কা নেই।
দেশে অপ্রতুল রাজস্ব আয় এবং ব্যাংকিং খাতের উচ্চ খেলাপি ঋণের মতো মৌলিক দুর্বলতা থাকায় বৈশ্বিক বা অভ্যন্তরীণ কোনো ধাক্কায় দীর্ঘ মেয়াদে ঝুঁকি তৈরি হতে পারে, এমন ধারণায় এই ঋণমান বি২ বা ‘উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ’ ক্যাটেগরিতে অন্তর্ভুক্ত রেখেছে মুডিস। পাশাপাশি স্বল্পমেয়াদি রেটিং ‘নট প্রাইম’ এর অর্থ হলো– এক বছর বা তার কম সময়ে জরুরি ভিত্তিতে দেনা মেটানোর ক্ষেত্রে সরকারের আর্থিক অবস্থান প্রথম সারির (প্রাইম) নয়।
গতকাল মঙ্গলবার মুডিসের আঞ্চলিক কার্যালয় সিঙ্গাপুর থেকে এ রেটিং প্রকাশ করা হয়। তাদের প্রতিবেদনে বলা হয়, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক অস্থিরতা কাটিয়ে বাংলাদেশ তার বৈদেশিক লেনদেন ব্যবস্থাকে স্থিতিশীল জায়গায় নিয়ে আসতে সক্ষম হয়েছে। তবে দীর্ঘ মেয়াদে অর্থনৈতিক গতি ধরে রাখতে হলে ব্যাংকিং খাতের স্থায়ী সমাধান ও রাজস্ব আদায় বাড়ানো অত্যন্ত জরুরি।
ব্যাংকিং খাতের ধারাবাহিক দুর্বলতার পাশাপাশি বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারের অস্থিরতা ও আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের ঝুঁকিকে কারণ হিসেবে উল্লেখ করে গত জুনে আরেক ক্রেডিট রেটিং এজন্সি এসঅ্যান্ডপি গ্লোবাল বাংলাদেশের দীর্ঘমেয়াদি আউটলুক ‘স্থিতিশীল’ থেকে পরিবর্তন করে ‘নেতিবাচক’ করে। এর এক মাস আগে আরেক সংস্থা ফিচ রেটিংস মধ্যপ্রাচ্য সংঘাতের প্রভাবে সৃষ্ট সামষ্টিক অর্থনৈতিক ঝুঁকির কথা জানিয়ে বাংলাদেশের দীর্ঘমেয়াদি রেটিংয়ের আউটলুক ‘স্থিতিশীল’ থেকে ‘নেতিবাচক’ বলে ঘোষণা করে।
‘স্থিতিশীল’ হওয়ার মূল কারণ
মুডিসের মূল্যায়নে বলা হয়েছে, গত ফেব্রুয়ারিতে অনুষ্ঠিত জাতীয় নির্বাচনের মাধ্যমে নতুন সরকার একটি শক্তিশালী ম্যান্ডেট পেয়েছে। এই রাজনৈতিক পরিবর্তনের ফলে নীতিগত অনিশ্চয়তা এবং সংস্কার কার্যক্রম থমকে যাওয়ার ঝুঁকি অনেক কমে গেছে। সরকারের বিনিয়োগবান্ধব এজেন্ডা, আটকে থাকা প্রকল্প বাস্তবায়নের উদ্যোগ এবং ব্যবসার পরিবেশ উন্নত করার চেষ্টা অর্থনীতিতে গতি ফেরাচ্ছে।
এর পাশাপাশি বৈদেশিক লেনদেনের ভারসাম্যে স্থিতিস্থাপকতা এবং রিজার্ভের বৃদ্ধি পূর্বাভাস পরিবর্তনের পেছনে বড় ভূমিকা রেখেছে। ২০২৪ সালের শেষ দিকে বাংলাদেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ কমে প্রায় ২১ দশমিক ৪ বিলিয়ন ডলারে নামে। চলতি বছরের মাঝামাঝিতে এসে সেই রিজার্ভ বেড়ে প্রায় ৩২ দশমিক ৯ বিলিয়ন ডলারে উন্নীত হয়েছে।
বৈধ ব্যাংকিং চ্যানেলে রেকর্ড পরিমাণ প্রবাসী আয় বা রেমিট্যান্স আসা রিজার্ভ বৃদ্ধিতে সবচেয়ে বড় সাহায্য করেছে। মুদ্রামান ধরে রাখতে বাংলাদেশ ব্যাংক এখন আর রিজার্ভ থেকে ডলার বিক্রি করছে না, বরং কিনছে। ফলে বিশ্ববাজারে জ্বালানির উচ্চ মূল্যের প্রভাব সামাল দেওয়া সহজ হচ্ছে।
আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) এবং অন্যান্য আন্তর্জাতিক আর্থিক প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে বাংলাদেশের ধারাবাহিক সম্পৃক্ততাকে মুডিস সংস্কারের অন্যতম ভিত্তি হিসেবে উল্লেখ করেছে।
অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও মূল্যস্ফীতির পূর্বাভাস
মুডিসের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, নিকট মেয়াদে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ধীরে ধীরে বাড়বে এবং ২০২৮ অর্থবছর থেকে তা আবার শক্তিশালী হবে। ২০২৪-২০২৫ অর্থবছরে বাংলাদেশের জিডিপি প্রবৃদ্ধি ছিল ৩ দশমিক ৫ শতাংশ। গত অর্থবছরে ৪ দশমিক ১ শতাংশে উন্নীত হয়েছে। চলতি অর্থবছরে তা বেড়ে ৪ দশমিক ৩ শতাংশ হতে পারে। আগামী অর্থবছর থেকে বিনিয়োগ ও শিল্প খাতের উৎপাদন স্বাভাবিক হয়ে প্রবৃদ্ধি প্রায় ৪ দশমিক ৯ শতাংশে পৌঁছাবে।
আগের রেটিং বহাল রাখার কারণ
মুডিস বাংলাদেশের ‘বি২’ রেটিং বহাল রাখার ক্ষেত্রে দেশের দীর্ঘমেয়াদি সম্ভাবনার পাশাপাশি বর্তমান ঝুঁকিগুলোকে সমভাবে বিবেচনা করেছে। তাদের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশের অনুকূল জনসংখ্যা তাত্ত্বিক সুবিধা এবং বৈশ্বিক বাজারে প্রতিযোগিতামূলক তৈরি পোশাক খাতকে দীর্ঘমেয়াদি প্রবৃদ্ধির ইতিবাচক চালিকাশক্তি হিসেবে দেখা হচ্ছে।
মুডিস বলেছে, সহজ বা নমনীয় শর্তে আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো থেকে বৈদেশিক ঋণ পাওয়ার সুযোগ বাংলাদেশ সরকারকে ঋণ পরিশোধের ঝুঁকি কমাতে সাহায্য করছে। দেশের মোট ঋণের পরিমাণ জিডিপির প্রায় ৪০ শতাংশের মধ্যে রয়েছে, যাকে মুডিস একটি মাঝারি বা সহনীয় ঋণভার হিসেবে উল্লেখ করেছে।
ঝুঁকি ও চ্যালেঞ্জ
মুডিসের প্রতিবেদনে বাংলাদেশের অর্থনীতির বেশ কিছু গভীর ও দীর্ঘমেয়াদি কাঠামোগত দুর্বলতার কথা তুলে ধরা হয়েছে। সবচেয়ে বড় দুর্বলতা হলো সরকারের অত্যন্ত কম রাজস্ব ভিত্তি। রাজস্ব আয় কম হওয়ায় উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে সরকারের ব্যয়ের সক্ষমতা কম। অর্জিত রাজস্বের প্রায় ৩০ শতাংশই চলে যায় ঋণের সুদ পরিশোধে। দেশের ব্যাংকিং খাতের নাজুক পরিস্থিতিকেও অন্যতম বড় উদ্বেগের জায়গা বলে মনে করে মুডিস।
- বিষয় :
- ঋণ