মেট্রোরেল প্রকল্পে কোরিয়ার অর্থায়ন নিয়ে জটিলতা
সমকাল
আবু হেনা মুহিব
প্রকাশ: ২৯ অক্টোবর ২০২৬ | ০৯:৫২ | আপডেট: ২৯ অক্টোবর ২০২৬ | ০৯:৫৪
| প্রিন্ট সংস্করণ
রাজধানীর পশ্চিম অংশ গাবতলী থেকে পূর্ব অংশ দাশেরকান্দি পর্যন্ত মেট্রোরেল যোগাযোগ উন্নয়নে নেওয়া প্রকল্প এমআরটি-৫ (দক্ষিণ) বাস্তবায়ন নিয়ে সংকট তৈরি হয়েছে। এর কারণ, প্রকল্পের যৌথ অর্থায়নকারী দক্ষিণ কোরিয়া সরকারের ইকোনমিক ডেভেলপমেন্ট কোঅপারেশন ফান্ড (ইডিসিএফ) থেকে ঋণ পাওয়ার ক্ষেত্রে জটিলতা তৈরি হয়েছে।
অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগ (ইআরডি) সূত্রে জানা গেছে, বাংলাদেশের পক্ষ থেকে বারবার যোগাযোগ করার পরও ঋণচুক্তির বিষয়ে কোনো সাড়া দিচ্ছে না কোরিয়া। এই জটিলতা কাটাতে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী কোরিয়া যাচ্ছেন আগামী শনিবার। অর্থমন্ত্রী বর্তমানে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে জাপান সফরে রয়েছেন। সেখান থেকে সিউলে যাওয়ার কর্মসূচি রয়েছে তাঁর।
এমআরটি-৫ (দক্ষিণ) প্রকল্পে ১১০ কোটি ডলার ঋণ দেওয়ার কথা ইডিসিএফের। স্থানীয় মুদ্রায় যার পরিমাণ প্রায় ১৩ হাজার ৫৫০ কোটি টাকা। সম্ভাব্য ৪৭ হাজার ৬৪৫ কোটি টাকা ব্যয়ের প্রকল্পে ৩০০ কোটি ডলার দিচ্ছে এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি)। এডিবি ঋণচুক্তির জন্য প্রস্তুত রয়েছে। প্রকল্পের নির্মাণ ব্যয়ের বাকি অর্থ ১৫ হাজার ৩১৪ কোটি টাকা সরকারের নিজস্ব জোগান থেকে দেওয়ার কথা।
প্রকল্পের সম্ভাব্যতা যাচাই, মৌলিক প্রকৌশল নকশা, দরপত্র, ভূমি অধিগ্রহণ পরিকল্পনা ও ক্ষতিগ্রস্তদের পুনর্বাসন-সংক্রান্ত পরিকল্পনার কাজ শেষ হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সভাপতিত্বে গত ১৬ সেপ্টেম্বর একনেক বৈঠকে প্রকল্পটি অনুমোদন দেওয়া হয়। অবশ্য এর নির্মাণকাজ শুরু হওয়ার কথা ছিল ২০২৩ সালে। ২০২২ সালে সম্ভাব্যতা যাচাই শেষ করা হয়। সম্ভাব্যতা যাচাই ও বিস্তারিত নকশার জন্য মোট ২০০ কোটি টাকা ব্যয় হয়েছিল।
আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর প্রকল্পটির অনুমোদন আটকে যায়। পরে ব্যয় কমিয়ে একনেকে উপস্থাপনের জন্য প্রস্তুত করা হলেও অন্তর্বর্তী সরকারের সর্বোচ্চ পর্যায় থেকে সাড়া না পাওয়ায় একনেকে ওঠানো যায়নি। অবশ্য, ওই সময় প্রকল্পের প্রাক্কলিত ব্যয় ধরা হয় ৫৫ হাজার কোটি টাকা। একনেকে অনুমোদনের আগে সাত হাজার ৩৬৫ কোটি টাকা কমিয়ে ৪৭ হাজার ৬৪৫ কোটি টাকা করা হয়।
ইআরডি সূত্র জানায়, এমআরটি লাইন-৫ (দক্ষিণ) প্রকল্পে এডিবির সঙ্গে সহঅর্থায়নকারী হওয়ার জন্য কোরিয়া আগ্রহ দেখিয়েছিল। ইআরডির সঙ্গে আলোচনায় ১১০ কোটি ডলার ঋণ দেওয়ার বিষয়ে নীতিগত সিদ্ধান্তের কথা জানায়। নিয়ম অনুযায়ী একটি কাঠামো চুক্তিও হয়। সেভাবেই প্রকল্প তৈরি করা হয়েছিল। কিন্তু এখন আর তারা সাড়া দিচ্ছে না। কোরিয়ার প্রস্তাবিত ঋণ নমনীয় বা সহজ শর্তের। সুদের হার মাত্র শূন্য দশমিক শূন্য ৫ শতাংশ। ১৫ বছরের রেয়াতকালসহ ৪০ বছরে এই ঋণ পরিশোধের কথা।
ইআরডির পক্ষে ইডিসিএফের সঙ্গে যোগাযোগ করে থাকে সংস্থার এশিয়া উইং। এই উইংয়ের ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তা গত সোমবার সমকালকে বলেন, ঋণচুক্তির বিষয়ে গত কয়েক মাসে অন্তত চার দফা চিঠি দেওয়া হয়েছে ইআরডির পক্ষ থেকে। কিন্তু কোনো জবাব আসেনি কোরিয়ার কাছ থেকে। ঢাকায় ইডিসিএফ বাংলাদেশ আবাসিক মিশনেও যোগাযোগ করা হয়। তবে মিশনের পক্ষ থেকে জানানো হয়, প্রধান কার্যালয় থেকে কোনো জবাব না আসা পর্যন্ত তারা কিছু বলতে পারছে না। এ রকম একটা পরিস্থিতিতে অর্থমন্ত্রী কোরিয়া সফরে যাচ্ছেন। অর্থমন্ত্রী এখন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে জাপান সফরে রয়েছেন। ২৯ অক্টোবর সরকারি সফর শেষ করার পরদিন তিনি দক্ষিণ কোরিয়া যাবেন। এর পর ৩১ অক্টোবর থেকে তাঁর সরকারি সফর শুরু হবে।
জানা গেছে, অর্থমন্ত্রী কোরিয়ার প্রেসিডেন্ট ও অর্থমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠক করবেন। মেট্রোরেল প্রকল্পের ঋণ নিয়ে আলোচনা ছাড়াও কোরিয়া সরকারের কাছ থেকে বাজেট সহায়তা নিয়ে আলোচনা করবেন। তিনি স্যামসাং, এলজির মতো দক্ষিণ কোরিয়ার কয়েকটি বড় কোম্পানির প্রতিনিধিদের সঙ্গে বৈঠক করবেন।
মেট্রোরেল-৫ (দক্ষিণ) লাইন প্রকল্প প্রস্তাব অনুযায়ী গাবতলী থেকে দাশেরকান্দিতে যাওয়া যাবে মাত্র ২৮ মিনিটে। পরিবহন ব্যয়ও কমবে। রুটে প্রতিদিন যাতায়াত করবেন ৯ লাখ ২৪ হাজার যাত্রী। প্রতিটি ট্রেনে যাত্রী ধারণক্ষমতা থাকবে দুই হাজার ৩১২ জন। মোট স্টেশন থাকবে ১৫টি।
গাবতলী থেকে টেকনিক্যাল, কল্যাণপুর, শ্যামলী, কলেজগেট, আসাদ গেট, শুক্রাবাদ, কারওয়ান বাজার, হাতিরঝিল, তেজগাঁও, আফতাবনগর, আফতাবনগর সেন্টার, আফতাবনগর পূর্ব, নাছিরাবাদ ও সর্বশেষ স্টেশন হবে দাশেরকান্দি। দৈর্ঘ্য হবে ১৭ দশমিক ২০ কিলোমিটার। এর মধ্যে ১৩ দশমিক ১০ কিলোমিটার পাতালপথ। উড়ালপথ ৪ দশমিক ১০ কিলোমিটার। পাতাল স্টেশন হবে ১১টি। উড়াল স্টেশন হবে চারটি।
এই প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে সড়কে গাড়ি চলাচল কমবে এক হাজার ৪৯টি। জীবাশ্ম জ্বালানির ব্যবহার কমিয়ে বাতাসে দুই লাখ আট হাজার টন কার্বন নিঃসরণ কমাতে পারবে। ২০৩০ সালের জুনে এই মেট্রোরেল নগরবাসীর ব্যবহারের জন্য খুলে দেওয়ার কথা। তবে প্রকল্পের মেয়াদ ধরা হয়েছে ২০৩২ সাল পর্যন্ত। এটি মেট্রো লাইন-৫ (উত্তর) ও মেট্রো লাইন-২-কে সংযুক্ত করবে। এর ফলে গোটা রাজধানীই মেট্রোরেল অবকাঠামোর আওতায় আসবে।