মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ কর্মকর্তা ও তার স্ত্রীর ব্যাংক হিসাব তলব
ছবি-সমকাল
বিশেষ প্রতিনিধি
প্রকাশ: ২৮ অক্টোবর ২০২৬ | ২১:৫২
বাংলাদেশ ব্যাংকের মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ বিভাগের যুগ্ম পরিচালক মোশাররফ হোসেন ও তাঁর স্ত্রী উম্মে হাসান ডলির ব্যাংক হিসাব তলব করেছে বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিট (বিএফআইইউ)। তাঁদের ব্যাংক হিসাবের পাশাপাশি শেয়ার, সঞ্চয়পত্রসহ অন্যান্য আর্থিক হিসাবের লেনদেনের তথ্যও চাওয়া হয়েছে।
গতকাল মঙ্গলবার সমকালে ‘মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ কর্মকর্তার ব্যাংক হিসাবে সন্দেহজনক লেনদেন’ শিরোনামে প্রকাশিত অনুসন্ধানী প্রতিবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে এ পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। আজ বুধবার সব ব্যাংক, আর্থিক প্রতিষ্ঠান ও মোবাইল ফিন্যান্সিয়াল সার্ভিস (এমএফএস) সেবাদাতা প্রতিষ্ঠানের কাছে চিঠি পাঠিয়ে এসব তথ্য চেয়েছে বিএফআইইউ।
বিএফআইইউর চিঠিতে মোশাররফ হোসেন ও তাঁর স্ত্রী উম্মে হাসান ডলির হিসাব খোলার ফরম, লেনদেন বিবরণীসহ সংশ্লিষ্ট সব তথ্য চাওয়া হয়েছে। চিঠি পাওয়ার দুই কর্মদিবসের মধ্যে এসব তথ্য পাঠাতে বলা হয়েছে। মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ আইনের আওতায় এ তথ্য চাওয়া হয়েছে।
সমকালের অনুসন্ধানে উঠে আসে, মোশাররফ হোসেন ও তাঁর স্ত্রীর আয়কর নথিতে উল্লেখ নেই, এমন ব্যাংক হিসাবে নগদ টাকা জমা ও উত্তোলনের ঘটনা ঘটেছে। এ ছাড়া গাজীপুরে তাঁর নামে থাকা ৬৩ শতাংশ জমির তথ্য আয়কর নথিতে নেই বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়। গত মার্চে তাঁর স্ত্রীও ৪৮ লাখ টাকা দিয়ে জমি কেনেন। নিজের ও স্ত্রীর নামে বড় অঙ্কের সঞ্চয়পত্র ও স্থায়ী আমানত (এফডিআর) করার পাশাপাশি শেয়ারবাজারেও বিনিয়োগ করেছেন তিনি। নিজের পরিচয় গোপন করে মুদি দোকানদার পরিচয়ে বিকাশ অ্যাকাউন্ট খোলার অভিযোগও রয়েছে তাঁর বিরুদ্ধে।
বাংলাদেশ ব্যাংকে ২০১৩ সালে যোগ দেওয়া মোশাররফ হোসেন বর্তমানে পঞ্চম গ্রেডের কর্মকর্তা। তাঁর মূল বেতন ৫৬ হাজার ৩০ টাকা। অন্যান্য ভাতাসহ মাসিক আয় প্রায় ৯০ হাজার টাকা। প্রতিবেদনে বলা হয়, গৃহনির্মাণ ও গাড়ির ঋণের কিস্তি এবং বাংলাদেশ ব্যাংকের আবাসিক কোয়ার্টারের ভাড়া বাবদ টাকা কাটার পর তাঁর বেতন-ভাতার অর্থ ব্যাংক হিসাবে জমা থাকে না। তা সত্ত্বেও তাঁর হিসাবে নগদ অর্থ জমা হওয়ার বিষয়টি প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে।
নিজ ও স্ত্রীর ব্যাংক হিসাবে বড় অঙ্কের লেনদেন এবং সমিতির হিসাবের বাইরে নগদ টাকা জমা ও উত্তোলনের বিষয়ে জানতে চাইলে মোশাররফ হোসেন এগুলো সহকর্মীদের কাছ থেকে নেওয়া ঋণ বলে দাবি করেন। তাঁর ভাষ্য, গত তিন থেকে চার মাসে সহকর্মীদের কাছ থেকে প্রায় ২০ লাখ টাকা ধার নিয়েছেন।
এদিকে, বাংলাদেশ ব্যাংকের উচ্চপর্যায়ে মোশাররফ হোসেনের আচরণ নিয়েও একাধিক অভিযোগ রয়েছে। এর মধ্যে দুটি ঘটনার তদন্ত চলছে বলে জানা গেছে।
অভিযোগ অনুযায়ী, গত ২৬ ফেব্রুয়ারি নতুন গভর্নর নিয়োগের দিন মানবসম্পদ বিভাগের দায়িত্বে থাকা ডেপুটি গভর্নর ড. কবির আহম্মদ ও নির্বাহী পরিচালক সিরাজুল ইসলামকে কয়েকটি আদেশে সই করতে বাধ্য করেন মোশাররফের নেতৃত্বে কয়েক কর্মকর্তা। এ ঘটনায় বাংলাদেশ ব্যাংকে তদন্ত চলছে।
আরেকটি অভিযোগ, আওয়ামী লীগ নেতা ও প্রিমিয়ার ব্যাংকের সাবেক চেয়ারম্যান ডা. এইচবিএম ইকবালের বিরুদ্ধে বিএফআইইউ যাতে কোনো ব্যবস্থা না নেয়, সে জন্য একজন নির্বাহী পরিচালকের কাছে তদবির করেন মোশাররফ। এ সময় তিনি বিএনপির এক কেন্দ্রীয় নেতার রেফারেন্স দেন বলে অভিযোগ রয়েছে। এ ঘটনায় বিএফআইইউর পক্ষ থেকে বাংলাদেশ ব্যাংকের মানবসম্পদ বিভাগে তাঁর বিরুদ্ধে লিখিত অভিযোগ দেওয়া হয়।
এ ছাড়া গত মাসে এক বিতর্কিত ব্যবসায়ীকে সঙ্গে নিয়ে বিএফআইইউ প্রধানের কক্ষে প্রবেশ এবং বিশেষ ঋণ পুনঃতপশিলের আওতায় কিছু গ্রাহককে সুবিধা পাইয়ে দিতে তৎপর থাকার অভিযোগও রয়েছে তাঁর বিরুদ্ধে। তাঁর আচরণ নিয়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের বিএনপিপন্থি কর্মকর্তাদের সংগঠনের পক্ষ থেকে গভর্নরের হস্তক্ষেপ চেয়ে মৌখিক অভিযোগ জানানো হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।
- বিষয় :
- ব্যাংক হিসাব তলব
- বাংলাদেশ ব্যাংক