ঢাকা বুধবার, ২৮ অক্টোবর ২০২৬

আইন দিয়ে নয়, নৈতিকতা ছাড়া ব্যাংক খাতের সংস্কার সম্ভব নয়: ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদ

আইন দিয়ে নয়, নৈতিকতা ছাড়া ব্যাংক খাতের সংস্কার সম্ভব নয়: ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদ
×
×

ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদ

সমকাল প্রতিবেদক ‎

প্রকাশ: ২৮ অক্টোবর ২০২৬ | ১৩:৩৩ | আপডেট: ২৮ অক্টোবর ২০২৬ | ১৫:২৮

কেবল কঠোর আইন দিয়ে ব্যাংক খাতের সংস্কার সম্ভব নয়। এ জন্য ব্যাংকার ও শিল্পোদ্যোক্তাদের ন্যূনতম নৈতিকতা ও মূল্যবোধের পরিচয় দিতে হবে বলে মন্তব্য করেছেন বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক অধ্যাপক ড. ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদ।

তিনি বলেন, আর্থিক খাত পুরো অর্থনীতির ‘হৃদপিণ্ড’। তাই রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে এ খাতকে সুবিধা বিতরণের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার বন্ধ করতে হবে।

রাজধানীর মিরপুরে বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ব্যাংক ম্যানেজমেন্টের (বিআইবিএম) মিলনায়তনে আয়োজিত ‘১১তম বার্ষিক ব্যাংকিং কনফারেন্স ২০২৬’-এর উদ্বোধনী অধিবেশনে বিশেষ অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। ব্যাংকিং ও আর্থিক খাতের গতিশীলতা, সামষ্টিক অর্থনীতির স্থিতিশীলতা এবং নীতিগত সমন্বয়ের বিভিন্ন দিক নিয়ে আলোচনা করতে দুই দিনব্যাপী এ সম্মেলনের আয়োজন করা হয়েছে।

ব্যাংক খাতের ঐতিহাসিক ভুলের কথা উল্লেখ করে ড. ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদ বলেন, ১৯৮০-এর দশকের শেষভাগে কার্যকর নিয়ন্ত্রণ কাঠামো তৈরি না করেই বেসরকারি ব্যাংক প্রতিষ্ঠার সুযোগ দেওয়া হয়েছিল। এর খেসারত এখনো দিতে হচ্ছে। ২০০৩ সালের দিকে নিয়ন্ত্রণ কাঠামো জোরদার ও কয়েকটি ব্যাংকের পর্ষদ পুনর্গঠনের মাধ্যমে পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হয়েছিল। তবে পরবর্তী সময়ে পরিস্থিতি আবার ভিন্ন রূপ নেয়।

বিগত ১৫ বছরে ব্যাংক খাত ‘ঋণখেলাপি সংস্কৃতি’ থেকে আরও ভয়াবহ ‘ব্যাংক লুটপাটের সংস্কৃতিতে’ প্রবেশ করেছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, বর্তমান অর্থনৈতিক পরিস্থিতিতে ব্যবসা ও ব্যাংক টিকিয়ে রাখতে কিছু বিধিনিষেধ শিথিল করার প্রয়োজন হতে পারে। তবে এতে অতীতের ভুলের পুনরাবৃত্তি হবে না, সেই নিশ্চয়তা থাকতে হবে। রাজনৈতিক সরকারগুলোর প্রভাবে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোতে অন্যায্য সুযোগ-সুবিধা বিতরণের যে সংস্কৃতি গড়ে উঠেছে, তা থেকে বেরিয়ে এসে অতীতের অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিতে হবে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের ডেপুটি গভর্নর কবির আহমেদ বলেন, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ পুনর্গঠন ও বিনিময় হার স্থিতিশীল রাখা ছিল কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রধান লক্ষ্য। ৩৬ বিলিয়ন ডলারের রিজার্ভ অর্জনের ফলে ছয় মাসের আমদানি ব্যয় মেটানোর সক্ষমতা তৈরি হয়েছে। ব্যাংক খাতের ওপর আস্থা ফেরাতে বিশ্বব্যাংকের সহায়তায় ১৫টি ব্যাংকে ‘অ্যাসেট কোয়ালিটি রিভিউ’ (একিউআর) করা হয়েছে। এ কার্যক্রম অব্যাহত থাকবে।

তিনি জানান, ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে অনাদায়ি ঋণের (এনপিএল) হার ছিল ৩৬ শতাংশ। চলতি বছরের শেষ নাগাদ এ হার উল্লেখযোগ্যভাবে কমবে বলে আশা করা হচ্ছে। এ লক্ষ্যে ‘স্পেশাল অ্যাসেট ম্যানেজমেন্ট অ্যাক্ট’ ও ‘মানি অ্যাক্ট’ প্রণয়নের কাজ চলছে। ব্যাংকগুলোর মূলধন ঘাটতি পূরণে অর্থ মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে সমন্বিত পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। এ ছাড়া স্বাধীন পরিচালনা পর্ষদ, নগদ প্রবাহভিত্তিক ঋণদান ও সাইবার সুরক্ষার ওপর গুরুত্ব দেন তিনি।

আঞ্চলিক অর্থনীতি শক্তিশালী করতে ব্যাংকিং কার্যক্রমের বিকেন্দ্রীকরণ এবং আগামী বছর ব্যক্তি-পর্যায়ে লেনদেনের (পিটুপি) জন্য সমন্বিত ডিজিটাল ইকোসিস্টেম চালুর ঘোষণাও দেন তিনি।

অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকার্স বাংলাদেশের (এবিবি) সভাপতি এবং সিটি ব্যাংক পিএলসির ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মাসরুর আরেফিন বলেন, অতীতে ব্যাংক খাতে যে অবাধ লুটপাট চলেছে, তা বন্ধ হয়েছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংক পরিচালনা পর্ষদ পুনর্গঠনের মাধ্যমে সুশাসন ফিরিয়ে আনতে কাজ করছে।

তবে বেসরকারি খাতে প্রকৃত ঋণপ্রবাহ প্রায় শূন্যের কোঠায় নেমে আসা এবং মূলধনি যন্ত্রপাতি আমদানি ও কারখানা সম্প্রসারণে স্থবিরতা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন তিনি। পারচেজিং ম্যানেজার্স ইনডেক্স (পিএমআই) ৪৮-এ নেমে আসাকে অর্থনৈতিক সংকোচনের ইঙ্গিত হিসেবে উল্লেখ করেন মাসরুর আরেফিন। তিনি বলেন, উচ্চ মূল্যস্ফীতি (৮ দশমিক ৫ শতাংশ) ও নীতি সুদহার (৯ দশমিক ৫ শতাংশ) সংকোচনমূলক নীতির প্রভাব তৈরি করছে। একই সঙ্গে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নীতিতে একধরনের দ্বিধাদ্বন্দ্ব দেখা যাচ্ছে।

ব্যাংক একীভূতকরণের পরও আমানতকারীদের আস্থা বজায় থাকাকে ইতিবাচক হিসেবে উল্লেখ করেন তিনি। বাজারে গতি ফেরাতে সরকারি মেগা প্রকল্পগুলো চালু করার আহ্বানও জানান।

বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকসের (বিএবি) সভাপতি ও ঢাকা ব্যাংক পিএলসির চেয়ারম্যান আবদুল হাই সরকার বলেন, দেশের অর্থনীতির সিংহভাগ অর্থায়ন আসে বেসরকারি ব্যাংকগুলোর মাধ্যমে। ব্যাংক খাত সংস্কারে এমন নীতি নিতে হবে, যাতে প্রকৃত ব্যবসায়ী ও শিল্পোদ্যোক্তারা অর্থায়নের সুযোগ পান এবং ব্যাংকগুলোর পরিচালন সক্ষমতা সুরক্ষিত থাকে।

সম্মেলনের মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউট অব বাংলাদেশের (পিআরআই) চেয়ারম্যান ড. জায়েদী সাত্তার। তিনি বলেন, সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা অর্জনে মুদ্রানীতি, রাজস্বনীতি ও বাণিজ্যনীতির মধ্যে সমন্বয় জরুরি। সরকার অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে প্রায় ৬০ শতাংশ ঋণ নেওয়ায় মুদ্রানীতির কার্যকারিতা বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। তাই নীতিগুলোর মধ্যে অধীনতামূলক সম্পর্কের পরিবর্তে সমন্বয় নিশ্চিত করতে হবে।

মুন্ডেল-ফ্লেমিং কাঠামোর উল্লেখ করে তিনি প্রস্তাব করেন, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে মুদ্রানীতি, প্রবৃদ্ধিতে সহায়তার জন্য রাজস্বনীতি এবং নমনীয় বিনিময় হারনীতি অনুসরণ করা উচিত। ২০২২ সালের মে মাস থেকে টাকার প্রায় ৪০ শতাংশ অবমূল্যায়নের প্রভাব মোকাবিলায় শুল্ক হ্রাস বা ‘কমপেনসেটেড ডেপ্রিসিয়েশন’ গ্রহণের সুপারিশ করেন তিনি। তাঁর মতে, এতে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি রপ্তানি ও আমদানি প্রবৃদ্ধিতেও গতি আসতে পারে।

সম্মেলনের উদ্বোধনী পর্বে স্বাগত বক্তব্য দেন বিআইবিএমের অধ্যাপক ও কনফারেন্স অর্গানাইজিং কমিটির চেয়ারম্যান ড. প্রশান্ত কুমার ব্যানার্জি। বিশেষ অতিথি বিশ্বব্যাংকের বাংলাদেশ ও ভুটান প্রধান জিন পেসমে ব্যাংক খাতের সম্পদ পর্যালোচনা ও খেলাপি ঋণ নিয়ন্ত্রণে আন্তর্জাতিক সহযোগিতার ওপর গুরুত্ব দেন। উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন বিআইবিএমের মহাপরিচালক ড. মো. এযাজুল ইসলাম।

আরও পড়ুন

×