বিদ্যুতের ব্যবহার বেড়েছে, বিলের চাপে ৬৯% পরিবার
গণসংলাপে প্রধান অতিথি হিসেবে বক্তব্য দেন প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টা ও শিল্প মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা রুহুল কবির রিজভী। ছবি: সংগৃহীত
সমকাল প্রতিবেদক
প্রকাশ: ২৮ অক্টোবর ২০২৬ | ২২:৫৯
এক দশকে নিম্ন আয়ের পরিবারে বিদ্যুতের ব্যবহার, শিক্ষা ও জীবনমানে উন্নতি হয়েছে। বেড়েছে টেলিভিশন, ফ্রিজ ও কম্পিউটারের মতো বৈদ্যুতিক যন্ত্রপাতির ব্যবহার। তবে এ অগ্রগতির পাশাপাশি আয়ের তুলনায় বিদ্যুৎ বিলের চাপও বেড়েছে। রাজশাহী সিটি করপোরেশন ও ঝিনাইদহের শৈলকুপা পৌরসভার ৫৫৬টি পরিবারের ওপর পরিচালিত এক সমীক্ষায় এ চিত্র উঠে এসেছে।
সমীক্ষায় অংশ নেওয়া ৮৭ শতাংশ পরিবার জানিয়েছে, গত ১০ বছরে তাদের মাসিক বিদ্যুৎ ব্যবহার বেড়েছে। ৭৭ শতাংশ পরিবারের বিদ্যুৎচালিত যন্ত্রপাতির সংখ্যা ও বৈচিত্র্য বেড়েছে। অন্যদিকে ৬৯ শতাংশ পরিবার জানিয়েছে, আয়ের তুলনায় বিদ্যুৎ বিলের চাপ বেড়েছে।
বুধবার রাজধানীর ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটিতে কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ক্যাব) ও ক্যাব যুব সংসদ আয়োজিত গণসংলাপে সমীক্ষার ফলাফল তুলে ধরা হয়। এতে মূল বক্তব্য উপস্থাপন করেন ক্যাবের জ্বালানি উপদেষ্টা অধ্যাপক এম শামসুল আলম।
সমীক্ষা অনুযায়ী, গত ১০ বছরে পরিবারে টেলিভিশনের মালিকানা ৩৪ শতাংশ থেকে বেড়ে ৪৮ শতাংশ, ফ্রিজের মালিকানা ১০ শতাংশ থেকে ৪০ শতাংশ এবং কম্পিউটার বা ল্যাপটপের মালিকানা ২ শতাংশ থেকে ১৪ শতাংশ হয়েছে।
বিদ্যুতের ব্যবহারে পড়াশোনা ও ডিজিটাল সেবার সুযোগও বেড়েছে। ৭৬ শতাংশ পরিবার জানিয়েছে, বিদ্যুতের কারণে ঘরে পড়াশোনার পরিবেশ উন্নত হয়েছে। ৪৮ শতাংশ পরিবার অনলাইন শিক্ষা এবং ৬৫ শতাংশ পরিবার ঘরে ইন্টারনেট ব্যবহার করে। ৪৪ শতাংশ পরিবার নিয়মিত সামাজিক মাধ্যম বা অনলাইন প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করে। শিক্ষার্থী রয়েছে– এমন পরিবারে দৈনিক এক ঘণ্টার বেশি পড়াশোনার হার ৪০ শতাংশ থেকে বেড়ে ৪৯ শতাংশ হয়েছে।
পরিবারগুলোর আয়ের ক্ষেত্রেও পরিবর্তন দেখা গেছে। মাসে ১০ হাজার টাকার কম আয় করা পরিবারের হার ৪১ শতাংশ থেকে কমে ২১ শতাংশ হয়েছে। বিপরীতে ২০ হাজার টাকার বেশি আয় করা পরিবারের হার ৩১ শতাংশ থেকে বেড়ে ৫৩ শতাংশ হয়েছে। সমীক্ষায় ২১ শতাংশ পরিবার জানিয়েছে, তাদের আয়ের উৎস পরিবর্তিত হয়েছে এবং তারা নতুন আয়ের কাজ শুরু করেছে। তবে বিদ্যুতের সহায়তায় নতুন আয়ের কাজ বা ব্যবসা শুরু করেছে মাত্র ১০ শতাংশ পরিবার।
সমীক্ষায় অংশ নেওয়া ৮৯ শতাংশ পরিবার মনে করে, বিদ্যুৎ তাদের জীবনমান উন্নত করেছে। ৮২ শতাংশের মতে, রাতে সামাজিক ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড বেড়েছে। ৮১ শতাংশ পরিবার জানিয়েছে, বিদ্যুতের ব্যবহারে নারীদের গৃহস্থালি কাজের সময় কমেছে। ৬২ শতাংশ উত্তরদাতার মতে, নারীদের সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতাও বেড়েছে।
আলোর উৎস হিসেবেও পরিবর্তন এসেছে। ১০ বছর আগে ৪২ শতাংশ পরিবার কেরোসিনের বাতি ব্যবহার করত। বর্তমানে মাত্র ২ শতাংশ পরিবার নিয়মিত কেরোসিন বা মোমবাতি ব্যবহার করে। ৫৬ শতাংশ পরিবার জানিয়েছে, তারা এখন আর এসব ব্যবহার করে না। তবে ৬৩ শতাংশ পরিবার বিদ্যুৎসেবার আরও উন্নতি চায় এবং বিদ্যুতের ভর্তুকি পর্যাপ্ত নয় বলে মনে করে।
সমীক্ষায় ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের সম্ভাবনাও তুলে ধরা হয়েছে। অধ্যাপক এম শামসুল আলমের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, সরকারি বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় ৫২ দশমিক ৫০ মেগাওয়াট, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত ১৫০টি কলেজ এলাকায় ৫১ দশমিক ১২ মেগাওয়াট, রাজশাহী সিটি করপোরেশন এলাকায় ২৪ দশমিক ৬৩ মেগাওয়াট এবং শৈলকুপা পৌরসভা এলাকায় ৪ দশমিক ৩৬ মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের সম্ভাবনা রয়েছে। সব মিলিয়ে সম্ভাব্য উৎপাদনক্ষমতা ১৩২ দশমিক ৬১ মেগাওয়াট।
অধ্যাপক এম শামসুল আলম বলেন, আগে মূলত ঘরে আলোর জন্য বিদ্যুৎ ব্যবহার করা হলেও এখন গৃহস্থালি কাজ, শিক্ষা, বিনোদন ও যোগাযোগে এর ব্যবহার বেড়েছে। তবে উৎপাদনশীল কাজে বিদ্যুতের ব্যবহার এখনও সীমিত।
গণসংলাপে প্রধান অতিথির বক্তব্যে প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টা রুহুল কবির রিজভী বলেন, শুধু বিদ্যুৎ ব্যবহারের তথ্য দিয়ে হতদরিদ্র পরিবার শনাক্ত করা কঠিন। অনেক দরিদ্র পরিবার অন্যের সঙ্গে ভাগাভাগি করে বিদ্যুৎ ব্যবহার করে। তাই দারিদ্র্য নিরূপণে বিদ্যুৎ ব্যবহারের পাশাপাশি পরিবারের আর্থসামাজিক অবস্থাও বিবেচনায় নিতে হবে।
অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন ক্যাবের সাধারণ সম্পাদক হুমায়ুন কবির ভূঁইয়া।