শেয়ারবাজারে নামমাত্র লভ্যাংশের ছড়াছড়ি
১ থেকে ৭৫ পয়সা লভ্যাংশ ঘোষণা ২৪ কোম্পানির
৩৩ কোম্পানির লভ্যাংশ ঘোষণা শুধু সাধারণ বিনিয়োগকারীদের জন্য
ফাইল ছবি
সমকাল প্রতিবেদক
প্রকাশ: ০৫ নভেম্বর ২০২৬ | ০৭:৫৬ | আপডেট: ০৫ নভেম্বর ২০২৬ | ০৮:০৬
| প্রিন্ট সংস্করণ
বস্ত্র খাতের শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত মুন্নু ফেব্রিক্স কোম্পানির পরিশোধিত মূলধন ১১৫ কোটি টাকা। এ বছর কোম্পানিটি শূন্য দশমিক ১ শতাংশ বা প্রতি শেয়ারে মাত্র এক পয়সা হারে নগদ লভ্যাংশ ঘোষণা করেছে। নামমাত্র লভ্যাংশ শুধু সাধারণ বিনিয়োগকারীদের জন্য। উদ্যোক্তাদের সিদ্ধান্ত, তারা এ বছরও লভ্যাংশ নেবেন না। ফলে লভ্যাংশ হিসেবে কোম্পানিটি দেবে মাত্র সাত লাখ ৯৪ হাজার টাকা।
শুধু মুন্নু ফেব্রিক্স নয়, তালিকাভুক্ত সিলভা ফার্মা ও ভিএফএস থ্রেডও শেয়ারপ্রতি ১ শতাংশ লভ্যাংশ ঘোষণা করেছে। জুনে হিসাব বছর শেষ হয় শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত এমন ৬ কোম্পানি শেয়ারপ্রতি এক থেকে আড়াই পয়সা লভ্যাংশ ঘোষণা করেছে। আরও অন্তত ১৯ কোম্পানির শেয়ারপ্রতি ১০ থেকে ৭৫ পয়সা লভ্যাংশ দেবে।
অন্য এক পর্যালোচনায় দেখা গেছে, এমন নামকাওয়াস্তে লভ্যাংশ করা কোম্পানিগুলোর বাইরে অন্তত আট কোম্পানি ১০ থেকে ১৫ শতাংশ নগদ লভ্যাংশ ঘোষণা করেছে। তবে তা কেবল সাধারণ বিনিয়োগকারীদের জন্য।
সাধারণ বিনিয়োগকারীদের জন্য নামমাত্রসহ লভ্যাংশ ঘোষণা করা কোম্পানির সংখ্যা ৩৩টি। এসব কোম্পানি চার হাজার ৫৫ কোটি টাকার পরিশোধিত মূলধনের বিপরীতে মাত্র ৮১ কোটি টাকা লভ্যাংশ বিতরণ করতে যাচ্ছে। যা মূলধনের ২ শতাংশ। অবশ্য এই ৮১ কোটি টাকার মধ্যে ৯ কোম্পানি পৌনে ৬৪ কোটি টাকা লভ্যাংশ দিতে যাচ্ছে।
বিশ্লেষকদের মতে, নামকাওয়াস্তে এমন লভ্যাংশ ঘোষণার উদ্দেশ্য শেয়ারের ‘মার্কেট ক্যাটেগরি’ অপেক্ষাকৃত ভালো অবস্থায় বজায় রেখে সেকেন্ডারি শেয়ারবাজারে শেয়ার কেনাবেচার বাড়তি সুযোগ নেওয়া। বছরের পর বছর এ অবস্থা চললেও নিয়ন্ত্রক সংস্থা বিএসইসি বা স্টক এক্সচেঞ্জ এ ব্যবস্থা মেনে নিয়েছে। ক্যাটেগরি অবনমন থেকে রক্ষা পেতেও কোম্পানিগুলোর মধ্যে নামমাত্র লভ্যাংশ দেওয়ার এই কৌশল সাম্প্রতিক সময়ে অত্যন্ত প্রকট হয়ে উঠেছে।
আইন অনুযায়ী কোনো কোম্পানি পরপর দুই বছর লভ্যাংশ না দিলে সেটিকে ‘জেড’ ক্যাটেগরিতে নামিয়ে দেওয়া হয়। ‘জেড’ ক্যাটেগরির শেয়ারের লেনদেন নিষ্পত্তি হতে তিন কর্মদিবস লাগে, যেখানে ‘এ’ বা ‘বি’ ক্যাটেগরির শেয়ারে লাগে দুই কর্মদিবস। কোনো শেয়ার ‘জেড’ ক্যাটেগরিতে গেলে মার্জিন ঋণ সুবিধা বন্ধ এবং লেনদেনে বিধিনিষেধ আরোপ হয়।
সংশ্লিষ্ট কোম্পানির মূলধন সংগ্রহসহ উদ্যোক্তা-পরিচালকদের শেয়ার কেনাবেচা বিষয়ে নিয়ন্ত্রণমূলক শাস্তিমূলক ব্যবস্থা কার্যকর হয়। এই প্রশাসনিক কড়াকড়ি ও নেতিবাচক ভাবমূর্তি এড়াতে বিশাল পরিশোধিত মূলধনের কোম্পানিও বিনিয়োগকারীদের নামকাওয়াস্তে কয়েক পয়সা লভ্যাংশ বুঝিয়ে দিয়ে নিজেদের ‘এ’ বা ‘বি’ ক্যাটেগরিতে টিকিয়ে রাখছে।
যেসব কোম্পানির লভ্যাংশ ২ শতাংশের কম
তালিকাভুক্ত কোম্পানিগুলোর সর্বশেষ লভ্যাংশ থেকে প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, অন্তত ২৪টি কোম্পানি গত ৩০ জুন সমাপ্ত হিসাব বছরের জন্য ২ শতাংশ বা তার কম লভ্যাংশ ঘোষণা করেছে। এর মধ্যে সবচেয়ে কম শূন্য দশমিক ১০ শতাংশ বা প্রতি শেয়ারে মাত্র ১ পয়সা লভ্যাংশ দেওয়া ছয় কোম্পানি হলো– মুন্নু ফেব্রিক্স, সিলভা ফার্মা, ভিএফএস থ্রেড, কাট্টালি টেক্সটাইল, এমএল ডাইং ও ফার কেমিক্যাল। এ ছাড়া অ্যাডভেন্ট ফার্মা ঘোষণা করেছে দেড় পয়সা, আমরা নেটওয়ার্কস ও ড্রাগন সোয়েটার দুই পয়সা এবং এবং বিবিএস কেবলস ও আমরা টেকনোলজিসের পর্ষদ আড়াই পয়সা হারে লভ্যাংশ সুপারিশ করেছে।
সিলকো ফার্মাসিউটিক্যালস ও জিবিবি পাওয়ারের লভ্যাংশের হার শূন্য দশমিক ৫০ শতাংশ। অন্যদিকে ১ শতাংশ লভ্যাংশ দেওয়া ১০টি কোম্পানি হলো– আফতাব অটোমোবাইলস, জেনেক্স ইনফোসিস, ই-জেনারেশন, আরডি ফুড, অলটেক্স ইন্ডাস্ট্রিজ, দুলামিয়া কটন, গোল্ডেন হারভেস্ট অ্যাগ্রো, আল-হাজ টেক্সটাইল, নাভানা সিএনজি এবং লিগ্যাসি ফুটওয়্যার। এ ছাড়া তসরিফা ইন্ডাস্ট্রিজ দেড় শতাংশ লভ্যাংশ ঘোষণা করেছে। এই কোম্পানিগুলোর ঘোষিত লভ্যাংশের হার এতই নগণ্য যে, বিও অ্যাকাউন্ট পরিচালন ফি বা ব্যাংক চার্জের তুলনায় বিনিয়োগকারীদের জন্য খুবই কম।
এক কোটি টাকার কম লভ্যাংশ
শতাংশের হার যাই হোক না কেন, চূড়ান্ত বিচারে লভ্যাংশ বাবদ মোট ব্যয়ের অঙ্ক বিচারে অন্তত ২১টি কোম্পানি তাদের শেয়ারহোল্ডারদের জন্য সামগ্রিকভাবে এক কোটি টাকার কম লভ্যাংশ বরাদ্দ করেছে। পরিশোধিত মূলধন ছোট হওয়া বা অতিক্ষুদ্র লভ্যাংশ হারের কারণে এই পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে।
যেমন– ১০ শতাংশ লভ্যাংশ দেওয়া সত্ত্বেও রহিম টেক্সটাইল সাধারণ শেয়ারহোল্ডারদের জন্য মাত্র ২৭ লাখ ৪৮ হাজার টাকা নগদ লভ্যাংশ অনুমোদন করেছে। কেঅ্যান্ডকিউ ৫ শতাংশ লভ্যাংশ ঘোষণা করলেও এর মোট আর্থিক মূল্য মাত্র ৩৪ লাখ ৯৬ হাজার টাকা। বঙ্গজ ৩ শতাংশ নগদ লভ্যাংশ ঘোষণা করেছে, টাকার পরিমাণ ১৭ লাখ। হাক্কানি পাল্প ৩ শতাংশ লভ্যাংশ হিসেবে ৫৭ লাখ টাকা দেবে।
২ শতাংশ লভ্যাংশ দেওয়া কোম্পানিগুলোর মধ্যে বাংলাদেশ অটোকারস সাধারণ বিনিয়োগকারীদের দেবে মাত্র ছয় লাখ পাঁচ হাজার টাকা। দেশ গার্মেন্টস দেবে সাত লাখ ৪৬ হাজার টাকা।
বিএসইসির মুখপাত্র ও নির্বাহী পরিচালক আবুল কালাম বলেন, কোনো কোম্পানি কত শতাংশের নিচে লভ্যাংশ দিতে পারবে না, তা আইনে নির্দিষ্ট করা নেই।
- বিষয় :
- শেয়ারবাজার