ভাবিয়া করিও চাল রপ্তানি
আব্দুল বায়েস
প্রকাশ: ০৯ ফেব্রুয়ারি ২০২০ | ১৫:২০ | আপডেট: ০৯ ফেব্রুয়ারি ২০২০ | ১৫:২২
চাল রপ্তানিকে উৎসাহিত করতে প্রথমবারের মতো ভর্তুকি দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। রপ্তানি করা চালের দামের বিপরীতে ১৫ শতাংশ হারে নগদ সহায়তা দেওয়া হবে। দেশে উৎপাদিত ধান সংগ্রহ করে দেশেই প্রক্রিয়াকরণ করে সেই চাল রপ্তানি করলে ব্যবসায়ীরা ১০০ টাকার বিপরীতে ১৫ টাকা ভর্তুকি পাবেন। সমকালের একটি প্রতিবেদনে এসব তথ্য উঠে এসেছে।
চাল রপ্তানির কথা এর আগেও আমরা শুনেছি। জানি না কবে থেকে রপ্তানি শুরু হবে। সার্বিক বিবেচনায় সরকারের চাল রপ্তানির চিন্তা ইতিবাচক। এ ক্ষেত্রে সাধারণ ভোক্তা ও সাধারণ কৃষকের লাভ-ক্ষতিসহ বেশ কিছু বিষয় বিবেচনায় রেখে সিদ্ধান্ত নিতে হবে। শুধু সিদ্ধান্ত নিলেই হবে না, যে উদ্দেশ্যে চাল রপ্তানি তা যেন আলোর মুখ দেখে।
আমরা জানি, বিগত কয়েক বছর দেশে ধানের বাম্পার ফলন হয়েছে। এতে দেশে চালের চাহিদা মিটলেও কৃষকরা ধানের ন্যায্যমূল্য পাননি। অনেক ক্ষেত্রে উৎপাদন খরচই তুলতে পারেননি কৃষকরা। ধানের মূল্য কম থাকলেও তার প্রভাব দেশের চালের বাজারে লক্ষ্য করা যায়নি। অধিক উৎপাদনের সুযোগ নিয়ে ব্যবসায়ীরা সিন্ডিকেটের মাধ্যমে অল্প মূল্যে ধান কিনে বাজারে উচ্চমূল্যে চাল বিক্রি করেছে। আমার মনে হয়, কৃষকদের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করতেই সরকার চাল রপ্তানির মতো সাহসী উদ্যোগ নিয়েছে। এ ক্ষেত্রেও যাতে কৃষকরা উপেক্ষিত না হন এবং রপ্তানির সুফল যেন শুধু ব্যবসায়ী ও মিল মালিকদের হাতে না যায়, সে বিষয়ে সরকারকে সজাগ থাকতে হবে।
চাল রপ্তানির বিষয়টি খুবই স্পর্শকাতর। রপ্তানির ক্ষেত্রে কয়েকটি বিষয় লক্ষণীয়- প্রথমত, চাল রপ্তানির প্রথম শর্ত হলো, ভালো পরিমাণে উদ্বৃত্ত থাকতে হবে। দেশে অধিক পরিমাণে চাল উদ্বৃত্ত থাকলেই কেবল আমরা আন্তর্জাতিক বাজারে বিক্রি করতে পারি। তবে এখানে চাহিদা ও জোগানের হিসাবটা পরিস্কার হওয়া উচিত যে, আমাদের চাহিদা মেটানোর পর ঠিক কী পরিমাণ চাল উদ্বৃত্ত রয়েছে। চাহিদা ও জোগানের বর্তমান হিসাব করলেই হবে না, কয়েক মাস পর পরিস্থিতি কেমন হতে পারে, সেটাও হিসাবে নিতে হবে। আমাদের দেশ দুর্যোগপ্রবণ; সুতরাং বন্যা বা খরার মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগের আশঙ্কার বিষয়গুলোও রপ্তানির ক্ষেত্রে বিবেচনায় রাখতে হবে। কোনো সংশয় বা আশঙ্কা থাকলে চাল রপ্তানি না করাই ভালো হবে। অন্যথায় অভ্যন্তরীণ বাজার অস্থিতিশীল হওয়ার আশঙ্কা থাকবে। তবে সার্বিক বিবেচনার পর যদি দেখা যায় যে, প্রকৃত অর্থেই চাল উদ্বৃত্ত আছে, তাহলে রপ্তানি করা যেতে পারে। এতে কৃষকরা চাল উৎপাদনে আরও আগ্রহী হবেন। আন্তর্জাতিক অঙ্গনে একসময় চালের বাজার অস্থিতিশীল ছিল। এখন আর সে অবস্থা নেই। বাজার মোটামুটি স্থিতিশীল। চাল উৎপাদনে অন্যান্য দেশেও তেমন বিঘ্ন ঘটছে না। সে ক্ষেত্রে বাংলাদেশ থেকে চাল রপ্তানিতে তেমন ঝুঁকি নেই। তবে বাজার যে সবসময়ই স্থিতিশীল থাকবে, তা নিশ্চিত করে বলার অবকাশ নেই। সুতরাং আন্তর্জাতিক বাজার টালমাটাল হলে রপ্তানি দ্রুত বন্ধ করতে হবে।
এরপর দেখতে হবে, কোন ধরনের চাল রপ্তানি করা হলে ভালো মূল্য পাওয়া যাবে এবং রপ্তানির ফলে অভ্যন্তরীণ বাজার অস্থিতিশীল হবে না। আমি মনে করি, উৎকৃষ্টমানের চিকন চাল রপ্তানির জন্য বিবেচনায় আনা উচিত হবে। কারণ, আন্তর্জাতিক বাজারে এই চালের ব্যাপক চাহিদা রয়েছে। এই চালের মূল্য তুলনামূলক বেশি হওয়ায় সাধারণ মানুষ এই চালের ভোক্তা নন। সাধারণত আমাদের দেশে ধনাঢ্য শ্রেণির মানুষ এই চালের ভোক্তা। সুতরাং এ ধরনের চাল রপ্তানি করা হলে সাধারণ কৃষক বা সাধারণ মানুষের ওপর তেমন কোনো প্রভাব পড়বে না। বরং যে কৃষকরা এই চাল উৎপাদন করেন, তারা কিছুটা লাভবান হবেন। এ ছাড়াও যদি মধ্যম মানের চাল দেশের চাহিদা মেটানোর পর উল্লেখযোগ্য পরিমাণে উদ্বৃত্ত থাকে, সেগুলো রপ্তানি করাই ভালো হবে। কারণ, সাধারণ কৃষক চালের ন্যায্যমূল্য পাচ্ছেন না। কাজেই রপ্তানিতে যদি কৃষকের আয় বাড়ে, তাহলে কারও আপত্তি থাকার কথা নয়। কিন্তু আমাদের দেশের বেশিরভাগ মানুষ যে চালের ওপর নির্ভরশীল, সেই মোটা চাল রপ্তানি করা হলে বাজারে বিপর্যয় নেমে আসবে। এতে চালের দাম সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে চলে যাবে। দেশে অস্থিতিশীল পরিস্থিতি তৈরি হবে। আমাদের দেশের সাধারণ কৃষকরা চাল উৎপাদন করে খুব বেশি লাভের মুখ দেখেন না। অনেক ক্ষেত্রেই লোকসান গুনতে হয় তাদের। একদিকে উৎপাদন খরচ অনেক বেশি, অন্যদিকে স্টোরেজ খরচও চড়া। এই দুই খরচ মিটিয়ে তাদের আর লাভের মুখ দেখা হয় না। চাল রপ্তানি হলে কৃষকদের স্টোরেজ খরচও কমে আসবে অনেকাংশে। 
চাল রপ্তানি হবে ভালো কথা; কিন্তু কোথায় হবে! গত বছরের শেষে কৃষিমন্ত্রী বলেছিলেন, আন্তর্জাতিক বাজারে আমাদের চাল প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে আছে। ফলে আমাদের আফ্রিকান দেশগুলোতে চাল রপ্তানি করতে হবে। সেখানেও যেতে হয় ডোনারদের মাধ্যমে। আমরা মনে করি, এ ক্ষেত্রে আমাদের আন্তর্জাতিক বাজারে প্রবেশের বিকল্প নেই। সেটা অবশ্য খুব ভেবেচিন্তেই করতে হবে। কারণ, আমাদের কিন্তু স্থায়ীভাবে রপ্তানির অবস্থা নেই। একই সঙ্গে কৃষিকে বহুমুখী করার বিষয় ভাবতে হবে। কারণ, আমাদের জমি কিন্তু বাড়ছে না। নতুন নতুন শিল্প কারখানা, রাস্তাঘাট তৈরির কারণে জমি কমে যাচ্ছে। তাই কম জমি ব্যবহার করে বেশি উৎপাদন করা যায়, সে প্রযুক্তি নিয়ে ভাবতে হবে।
আমি আগেই বলেছি, চাল রপ্তানিতে সরকারের চিন্তা বাস্তবসম্মত ও যুগোপযোগী। রপ্তানি উৎসাহিত করতে সরকার ১৫ শতাংশ প্রণোদনাও দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছে। সাধারণত রেডিমেট গার্মেন্টে এ ধরনের প্রণোদনা দেওয়া হয়। তবে মনে রাখতে হবে, রপ্তানি যেন হিতে বিপরীত না হয়। এখানে অব্যবস্থাপনা ও অস্বচ্ছতা ভর করলে কৃষক যেমন ক্ষতিগ্রস্ত হতে থাকবে, তেমনি ভোক্তাসাধারণও অস্বস্তিতে পড়বেন। একই সঙ্গে এ সুযোগকে কাজে লাগিয়ে যেসব অসাধু ব্যবসায়ী চালের দাম বাড়াচ্ছে, তাদেরও কাঠগড়ায় দাঁড় করাতে হবে।
সাবেক উপাচার্য, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়
- বিষয় :
- বাজার
- আব্দুল বায়েস
