মনুষ্যত্ব অর্জনের দীক্ষা
মুহাম্মদ মাহমুদুল হাসান
প্রকাশ: ২২ ফেব্রুয়ারি ২০২০ | ১৪:৫৭
সবার সঙ্গে মিলেমিশে জীবন ধারণ এবং সুখে-দুঃখে একে অপরের পাশে এসে দাঁড়ানোর মধ্যেই জীবনের যথার্থ সার্থকতা। নিজের স্বার্থের জন্যই কেবল জীবন নয়। মানুষ সমাজের সহানুভূতিশীল জীব বলেই আত্মস্বার্থে মগ্ন থাকা তার স্বভাববিরুদ্ধ। মানুষ হয়ে জন্মালেই মানুষ হওয়া যায় না। চাই মনুষ্যত্ব অর্জনের দীক্ষা। জনসেবা সামাজিক মানুষের সেই দীক্ষার যথার্থ মন্ত্র। সমাজের সহায়-সাহায্যহীন, সর্বহারা, হতাশাগ্রস্তকে প্রাণবন্ত করে তোলাই মানুষের ধর্ম। স্বার্থপর ব্যক্তি বৃহত্তর জীবনাঙ্গন থেকে স্বেচ্ছানির্বাসিত। পৃথিবীর ভালো-মন্দ, সুখ-দুঃখ, মঙ্গল-অমঙ্গল তার হৃদয়-মন স্পর্শ করে না। এ ধরনের স্বার্থপর মানুষ সমাজ থেকে বিচ্ছিন্ন এবং সমাজের কোনো উপকারে আসে না। সেই মানুষ মহৎ, যে নিজের জন্য নয়, অন্যের জন্য নিবেদিত।
পরার্থে জীবন উৎসর্গ করার মাধ্যমে মানবজীবন সার্থকতায় উজ্জ্বল হয়ে ওঠে। ফুলের সঙ্গে মানবের তুলনা করা চলে। ফুল যেমন তার সৌরভে চারদিক আমোদিত করে, তেমনি অপরের কল্যাণে নিজেকে নিয়োজিত করতে পারলেই জীবন সুখময় ও আনন্দঘন হয়ে ওঠে। যে জাতিতে জনসেবকের সংখ্যা যত বেশি, সে জাতির ঐক্য, জাতীয়তাবোধ এবং উন্নয়ন ত্বরান্বিত হয়েছে তত বেশি। সমাজের উন্নতির মূলে যেসব বিষয় গুরুত্বপূর্ণ, সেগুলোর মধ্যে শিক্ষা, সময়োপযোগী চেতনা, অর্থনৈতিক অগ্রগতি এবং সাংস্কৃৃতিক বিকাশ উল্লেখযোগ্য। কিন্তু সমাজের সচেতন ও যোগ্য ব্যক্তিরা এ বিষয়ে জনগণকে সচেতন না করলে তারা তা যথাসময়ে অর্জন করতে পারে না। এ ক্ষেত্রে দেশ ও জাতির সার্বিক অগ্রগতির জন্য কাউকে না কাউকে সমাজসেবার মহৎ ব্রত নিয়ে এগিয়ে আসতে হবে। আধুনিক জ্ঞান-বিজ্ঞানের সঙ্গে সঙ্গতি রক্ষা করে স্কুল-কলেজ প্রতিষ্ঠা করতে হবে; প্রাকৃতিক দুর্যোগের সময় জনসাধারণের পাশে দাঁড়াতে হবে ও সাধ্যমতো সাহায্য করতে হবে। স্ব স্ব অবস্থান থেকে জনসেবায় মনোনিবেশ করলে সমাজ থেকে দুঃখ-কষ্ট, অশান্তি দূরীভূত হবে। রজনীকান্ত সেনের অষ্টাদশ দানের মধ্যে প্রকৃত জনসেবার পরিচয় ফুটে উঠেছে। যারা বিত্তবান তারা দীন-দুঃখীর ক্লেশ মোচনে প্রভূত অর্থ ব্যয় করতে পারেন। যাদের সে সামর্থ্য নেই, তারা তাদের সাধ্যমতো শ্রম দিয়ে হোক, ভালোবাসা দিয়ে হোক, সান্ত্বনা দিয়ে হোক; অপরের কল্যাণে নিজেকে নিবেদিত করতে পারলে তবেই জীবনের সার্থকতা। জনসেবায় কায়িক শ্রমের মূল্য অপরিসীম। এই ব্রত উদযাপনে ব্যক্তিগত প্রচেষ্টার চেয়ে সম্মিলিত বা সংঘবদ্ধ প্রচেষ্টার গুরুত্ব বেশি।
জনসেবায় রাজনৈতিক দলগুলোর ভূমিকা অপরিহার্য। রাজনৈতিক দলগুলো সংঘবদ্ধ শক্তি। তবে কোনো কোনো রাজনীতিকের ধারণা, জনসেবার মাধ্যমে মানুষের কল্যাণ চিরস্থায়ী কোনো সমাধান নয়। সমাজের বুকে দীর্ঘদিনের যে অন্যায়-অনাচারের পাহাড় সঞ্চিত; তা দূর করার জন্য তারা বিপ্লবের স্বপ্ন দেখেন। কিন্তু যতদিন সমাজে দারিদ্র্য, শোষণ-বৈষম্য থাকবে ততদিন জনসেবার প্রয়োজনীয়তা অপরিহার্য। কিছু রাজনৈতিক দল জনসেবাকেই একমাত্র মহৎ ব্রত মনে করলেও ক্ষমতা দখল এবং অধিকৃত ক্ষমতা বজায় রাখার দিকেই তাদের প্রাণান্ত প্রয়াস। ফলে দুর্গত, বিপন্নের সেবাতেও দেখা যায় সংকীর্ণ দলীয় মনোভাব।
জনসেবা প্রত্যেক মানুষেরই এক মহৎ ও সৎ হৃদয়বৃত্তি। এই হৃদয়বৃত্তির জাগরণই মনুষ্যত্বের পরিচায়ক। মানুষ কেবল স্বার্থ আর সম্পদের যন্ত্র নয়। মানুষ সুন্দরের আরাধনা করে। বিরাট মহিমার উপলব্ধিতে সে জীবনকে সার্থক ও অর্থময় করে তুলতে চায়। যে মানুষ নিজের আত্মার মধ্যে অন্যের আত্মাকে ও অন্যের আত্মার মধ্যে নিজের আত্মাকে জানে, প্রকৃতপক্ষে সে-ই জানে সত্যকে। মানুষের জীবনে যদি মহৎ সেবাব্রতের পূর্ণ দীক্ষা থাকে, যদি দিকে দিকে ছড়িয়ে পড়ে সেই মহাপ্রাণতার অঙ্গীকার, তবেই এই ধুলার ধরণীতে একদিন প্রেমের দেবতার হবে অভিষেক। আজ দিকে দিকে যেখানে হীনস্বার্থবাদিতা, কপটতা-ভণ্ডামির ছদ্মবেশ, যেখানে আত্মসর্বস্ব ধ্যান-ধারণায় মানুষ নিয়ত কুণ্ঠিত, যেখানে হিংসায় উন্মত্ত পৃথিবী, সেই হিংস্র প্রলাপের মধ্যে এই সহায়-সম্বলহীন, আর্ত, দুর্গতদের সেবাই যেন হয় সভ্যতার শেষ পুণ্যবাণী।
উপজেলা সমাজসেবা অফিসার জুরাছড়ি, রাঙামাটি
- বিষয় :
- অন্যদৃষ্টি
- মুহাম্মদ মাহমুদুল হাসান
