চালুনি বলে সুচ, তোর কেন এত বড় ফুটো
আবদুল গাফ্ফার চৌধুরী
প্রকাশ: ২২ ফেব্রুয়ারি ২০২০ | ১৫:০১ | আপডেট: ২৩ ফেব্রুয়ারি ২০২০ | ০১:৩৮
গত সপ্তাহে বর্তমান সরকারের বিরুদ্ধে ডান ও বামের জোটবদ্ধতা এবং এই জোটের দু'জন প্রধান নেতার দু'জনেরই এই বিরোধিতার মূলে কোনো নীতিপরায়ণতার বদলে ব্যক্তি-বিদ্বেষ তথা হাসিনা-বিদ্বেষ কাজ করছে; সে কথা লিখেছিলাম। এটা বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক ও অসাম্প্রদায়িক রাজনীতির জন্য ভয়ানক ক্ষতিকর। একজন ভারতীয় কলামিস্ট দীর্ঘদিন আগে তার কলামে লিখেছিলেন, 'অবিভক্ত ভারতের রাজনীতিতে নেহরু তার এত বিদ্যাবুদ্ধি ও পাণ্ডিত্য নিয়ে যদি ব্যক্তিগতভাবে জিন্নাহ-বিদ্বেষে এবং জিন্নাহ যদি গান্ধী-বিদ্বেষে না ভুগতেন, তাহলে ভারত হয়তো ভাগ হতো না। কোটি কোটি মানুষ বাস্তু ও দেশছাড়া হতো না। দাঙ্গায় প্রাণ হারাত না। লাখ লাখ নারী সল্ফ্ভ্রম হারাত না। প্রাণ হারাত না। পাকিস্তানে সামরিক ও সাম্প্রদায়িক ফ্যাসিবাদ এবং ভারতে হিংস্র হিন্দুত্ববাদ মাথা তুলতে পারত না। কাশ্মীর সমস্যার সৃষ্টি হতো না।'
আমার মতে, বাংলাদেশেও তথাকথিত বামদের সঙ্গে আসল বামেরাও বিভ্রান্ত হয়ে এবং ব্যক্তিগত মুজিব-বিদ্বেষের দরুন পরাজিত ডানদের পুনরুজ্জীবনে সহায়ক শক্তি না হতেন তাহলে সামরিক ও ধর্মীয় ফ্যাসিবাদ মাথা তুলতে পারত না। ১৯৫৭ সালে যদি বামেরা শহীদ সোহরাওয়ার্দীর মার্কিনঘেঁষা পররাষ্ট্র নীতির অজুহাতে আওয়ামী লীগ ভেঙে ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি গঠন না করতেন এবং মজবুত জাতীয় ঐক্যে ভাঙন না ধরাতেন, তাহলে আইয়ুবের নেতৃত্বে সামরিক জান্তা ক্ষমতা দখলে সাহসী হতো কিনা সে বিষয়ে অনেকের সন্দেহ আছে।
পুরোনো কথায় যাব না। বর্তমানে আসি। এ কথা সত্য, বামেরা দেশে অসাম্প্রদায়িক রাজনীতির শক্তি গঠনে অসামান্য অবদান রেখেছেন। আবার নিজেদের বিভ্রান্ত, সুবিধাবাদী নীতি ও কোনো কোনো নেতার ব্যক্তিগত বিদ্বেষের রাজনীতির দরুন গণতন্ত্র ও অসাম্প্রদায়িকতা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। গত সপ্তাহে এই কলামে এককালের মধ্যবাম এবং বর্তমানে চরম ডানপন্থি ড. কামাল হোসেনের হাসিনা-বিদ্বেষের রাজনীতির কথা বলেছি। এ সপ্তাহে বাম নেতা এবং বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি নেতা কমরেড মুজাহিদুল ইসলাম সেলিমের মুজিব-বিদ্বেষ বর্তমানে হাসিনা-বিদ্বেষে রূপান্তরিত হয়ে আওয়ামী লীগের সঙ্গে তার দলের অতীতের অঙ্গাঙ্গী সখ্যকে কীভাবে বর্তমানে জ্ঞাতিশত্রুতায় পরিণত করেছে, সে সম্পর্কে লিখব।
১৯৭৩ সালের কথা। দেশ স্বাধীন হয়েছে মাত্র। যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশ পুনর্গঠনে এবং পরাজিত শত্রুদের নানা ষড়যন্ত্র ও সন্ত্রাস দমনে সরকার ব্যস্ত। এ সময় ভিয়েতনাম যুদ্ধ চলছে। এই যুদ্ধে মার্কিন সৈন্যদের বর্বরতার প্রতিবাদে মোজাফফর ন্যাপ বাংলাদেশে ভিয়েতনাম দিবস পালনের ডাক দেয়। ন্যাপের সহযোগী কমিউনিস্ট পার্টি তাতে প্রকাশ্য সম্মতি না জানালেও সায় দেয়। মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম তখন তরুণ কমিউনিস্ট এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্র ইউনিয়নের (ডাকসু) নেতা।
মুজিব সরকার সম্পূর্ণভাবে ভিয়েতনামে মার্কিন সাম্রাজ্যবাদী নীতির বিরোধী জেনেও ন্যাপ ও কমিউনিস্ট পার্টি এ দিন ঢাকা শহরে ভাঙচুর শুরু করে। এ সময় কমিউনিস্ট পার্টির কোনো কোনো নেতা একটি অদ্ভুত থিয়োরি প্রচার করেন। মুক্তিযুদ্ধে তারা ছিলেন আওয়ামী লীগের সহায়ক শক্তি। এখন স্বাধীন হতেই এই প্রচারণার মূল কথা ছিল, আওয়ামী লীগ হচ্ছে মেনশেভিক পার্টি এবং কমিউনিস্ট দল হচ্ছে বলশেভিক পার্টি। রাশিয়ায় মেনশেভিক ও বলশেভিকরা মিলে জারের পতন ঘটিয়েছিল। সরকার গঠন করেছিল মেনশেভিকরা। ক্ষমতায় বসে তারা শক্তি সঞ্চয় করার আগেই লেনিনের নেতৃত্বে বলশেভিকরা বিদ্রোহ করে মেনশেভিক সরকারের পতন ঘটায় এবং ক্ষমতা দখল করে।
এই দৃষ্টান্ত তুলে একশ্রেণির কমিউনিস্ট নেতা প্রচার করতে শুরু করেন, বাংলাদেশে আওয়ামী লীগ হচ্ছে মেনশেভিক এবং কমিউনিস্ট দল হচ্ছে বলশেভিক পার্টি। মেনশেভিকরা ক্ষমতায় বসে শক্তি সংহত করার আগেই আঘাত হেনে তাদের ক্ষমতা থেকে সরিয়ে দিয়ে বলশেভিকদের (ন্যাপ ও কমিউনিস্ট পার্টি) ক্ষমতায় বসতে হবে। এই থিয়োরিতে বিশ্বাস করেই কিনা জানি না, ভিয়েতনাম দিবসে শান্তিপূর্ণভাবে সভা ও শোভাযাত্রা দ্বারা ভিয়েতনামের সঙ্গে সংহতি প্রকাশের বদলে ন্যাপ, কমিউনিস্ট পার্টি ও ছাত্র ইউনিয়ন শহরে ভয়ানক সন্ত্রাস চালায়।
মতিঝিলে এক বিশাল শোভাযাত্রা বের হয়। তাতে নেতৃত্ব দেন স্বয়ং অধ্যাপক মোজাফফর আহমদ। এই শোভাযাত্রার একটি বড় স্লোগান ছিল- 'মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের দালাল আওয়ামী লীগ সরকারকে ক্ষমতা থেকে হটাও।' এখানেই শেষ নয়, তোপখানা রোডে অবস্থিত মার্কিন তথ্যকেন্দ্রে হামলা চালিয়ে তারা আমেরিকার পতাকা পুড়িয়ে দেয় এবং ভবনের দরোজা ভেঙে ভেতরে ঢোকার চেষ্টা করে। পুলিশ প্রথমে কাঁদানে গ্যাস ছোড়ে। জনতা তাতে ছত্রভঙ্গ না হওয়ায় পরে গুলি ছুড়তে বাধ্য হয়। 
গুলিতে দু'জনের মৃত্যু হয়। বামপন্থিরা দিনটিকে শহীদ দিবস ঘোষণা করে কেন্দ্রীয় সেক্রেটারিয়েটের সামনে তোপখানা রোডের মাঝখানে (শহরের প্রধান কেন্দ্রস্থলে প্রধান রাজপথের মাঝখানে) শহীদ স্তম্ভ তৈরি করে। এমনকি প্রধানমন্ত্রী শেখ মুজিব তোপখানা রোডের সেক্রেটারিয়েট থেকে বাসায় ফেরার পথে তার গাড়িতে হামলা চালায়। দৈনিক বাংলা (অধুনালুপ্ত) তখন সরকার দ্বারা পরিচালিত পত্রিকা। তারা উস্কানিমূলক ব্যানার হেডিং দিয়ে খবরটি ছাপে। ফলে পত্রিকার প্রধান ও নির্বাহী সম্পাদককে তাদের পদ থেকে অপসারণ করা হয়। বেদিটি ভেঙে ফেলা হয়।
মজার কথা, বঙ্গবন্ধু এই দুই সম্পাদককে পত্রিকা থেকে অপসারণ করলেও চাকরিচ্যুত করেননি। বরং দু'জনকেই প্রোমোশন দিয়ে একজনকে মস্কোতে বাংলাদেশ দূতাবাসে উচ্চপদে চাকরি দিয়ে পাঠান এবং অন্যজনকে নিজের প্রেস সেক্রেটারির চাকরি দিয়ে গণভবনে নিয়ে আসেন। ন্যাপ-কমিউনিস্ট পার্টি সরকারবিরোধী আন্দোলনটি চালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করে। কিন্তু জনসমর্থনের অভাবে ব্যর্থ হয়। কেবল দলের ইয়ংটার্ক মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম বঙ্গবন্ধুকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র সংসদের আজীবন সদস্য পদ দিয়ে যে সম্মাননা দেখানো হয়, তার সনদপত্রটি প্রকাশ্য সভায় ছিঁড়ে ফেলেন। বঙ্গবন্ধুর বিরুদ্ধে তার প্রচণ্ড বিদ্বেষ প্রকাশ করে বক্তৃতা দেন।
বাংলাদেশ অবজারভার (তখনও টিকে ছিল) পত্রিকার রিপোর্টে কমরেড সেলিমের বক্তৃতা সম্পর্কে বলা হয়, 'হি স্পোক উইথ পারসোনাল ভেনম' (তিনি ব্যক্তিগত বিদ্বেষপূর্ণ বক্তৃতা দেন)। কমিউনিস্ট পার্টি তখন আকস্মিকভাবে নীতি পাল্টায়। তারা মেনশেভিক সরকার অর্থাৎ বাংলাদেশের আওয়ামী লীগ সরকারকে শুধু সমর্থন নয়, পূর্ণ আনুগত্য জানানোর সিদ্ধান্ত নেয়। তারা সেলিমকে নির্দেশ দেয় বঙ্গবন্ধুর কাছে অবিলম্বে ক্ষমা প্রার্থনা করার। শোনা যায়, এই ব্যাপারে সেলিম গড়িমসি করছিলেন। কিন্তু পার্টির কঠোর নির্দেশে মাফ চাইতে বাধ্য হন। বঙ্গবন্ধুকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র সংসদের আজীবন সদস্য পদ দানের সনদটি যথাস্থানে আবার পুনঃস্থাপন করা হয়।
আমি জানি না, বঙ্গবন্ধুর প্রতি কমরেড সেলিমের এই বিদ্বেষই পরবর্তীকালে হাসিনা-বিদ্বেষে পরিণত হয়েছে কিনা? তা না হলে আওয়ামী লীগের স্বায়ত্তশাসন থেকে স্বাধীনতা যুদ্ধ পর্যন্ত যে কমিউনিস্ট পার্টি ছিল তার সর্বক্ষণের সহযোগী; কমরেড সেলিমের নেতৃত্বে আসার সঙ্গে সঙ্গে সেই পার্টি কী করে গণতন্ত্র ও অসাম্প্রদায়িক রাজনীতির নিভুনিভু বাতি যে দল টিকিয়ে রেখেছে, সেই আওয়ামী লীগকে ক্ষমতা থেকে সরানোর রাজনীতিতে লেগে থাকতে পারেন এবং সাম্প্রদায়িক অপশক্তি যখন আওয়ামী লীগ সরকারকে ক্ষমতা থেকে হটানোর ষড়যন্ত্র করছে, তখন তিনিও বলতে পারেন, বর্তমানে আওয়ামী লীগ সরকারের দুর্বল মুহূর্ত। এটাই তাকে হটানোর সুবর্ণ সুযোগ?
চরম প্রতিক্রিয়াশীল ডানের নেতা ড. কামাল হোসেনের কথা, বর্তমান সরকার একদলীয় এবং স্বৈরাচারী। এই একই কথা সেলিমের কণ্ঠেও। সেলিমের কণ্ঠেও আওয়ামী লীগ একদলীয় এবং ফ্যাসিস্ট সরকার! ওয়ার্কার্স পার্টি নেতা রাশেদ খান মেননের সতর্কবাণীটি সঠিকই মনে হয়। 'গণতন্ত্র ও অসাম্প্রদায়িক রাজনীতির বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রে ডানদের সঙ্গে তথাকথিত বামেরা যুক্ত হয়েছে।' আমার কথা, আওয়ামী লীগ একদলীয় সরকার- এ কথাটি বলা কমরেড সেলিমের মুখে শোভা পায় কি? একদলীয় ও ফ্যাসিবাদী সরকার সম্পর্কে শিগগিরই একটু বিস্তারিত আলোচনার ইচ্ছা রইল।
[লন্ডন, ২১ ফেব্রুয়ারি, শুক্রবার, ২০২০]
- বিষয় :
- কালের আয়নায়
- আবদুল গাফ্ফার চৌধুরী
