করোনাভাইরাস
আরেকটি মন্দার দ্বারপ্রান্তে বিশ্ব?
সিমন জেনকিংস
প্রকাশ: ১১ মার্চ ২০২০ | ১২:৫২
বিশ্ব একটি অর্থনৈতিক মন্দার দ্বারপ্রান্তে পৌঁছেছে! করোনাভাইরাসের কারণে সৃষ্ট অর্থনৈতিক বিপর্যয়ের ফলে ২০০৮ সালের মতো আরেকটি সংকটে পড়তে পারে বৈশ্বিক আর্থিক খাত। এর ফলে ঋণ বাড়তে পারে, সুদহার কমে যেতে পারে, ধসে পড়তে পারে বৈশ্বিক বাজার। বর্তমানে করোনাভাইরাসের কারণে বিশ্বব্যাপী বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার ও পাউন্ড ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। মনে হচ্ছে, আরেকটি 'ব্ল্যাক মানডের' পরিস্থিতি সৃষ্টি হতে যাচ্ছে।
গত কয়েক বছর ধরে বাজার নিম্নমুখী এবং বিনিয়োগে স্থবিরতার কারণে বেকারত্ব বেড়েছে। এই পরিস্থিতি বিশ্ব নতুন আরেকটি বিপর্যয় প্রত্যক্ষ করতে যাচ্ছে। ইতোপূর্বে মন্দাগুলো একটি বা দুটি মহাদেশের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল। কিন্তু বিশ্বায়ন, বিশেষত চীনের উত্থান, দেশটির বাণিজ্য সম্প্রসারণ, অভিবাসন, পর্যটন শিল্পের বিকাশ- জাতীয় এমনকি মহাদেশীয় সীমান্ত বিলীন করে দিয়েছে। গত বছরের ডিসেম্বরে চীনের উহানে সৃষ্ট করোনাভাইরাস ইতোমধ্যে শতাধিক দেশে ছড়িয়ে পড়েছে। ফলে বেশ কিছু দেশ বিশ্ব থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়ার উপক্রম হয়েছে। এতে আমদানি-রপ্তানি খাত, যোগাযোগ ও পর্যটন খাত থমকে গেছে। বিশ্বজুড়ে এয়ারলাইন্স ও শিল্পকারখানাগুলো বন্ধের ঝুঁকিতে পড়ায় আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দামও কমেছে সাংঘাতিক হারে। বিশ্ব অর্থনীতি যখন দিক হারায়, তখন তার নেতিবাচক প্রভাব সবকিছুর ওপরই পড়ে।
আমরা জানি, আধুনিক পুঁজিবাদ চাহিদা ও উৎপাদন গতিশীলতার ওপর নির্ভর করে। আর এটা নির্ভর করে লাখ লাখ স্বতন্ত্র সিদ্ধান্তের ওপর, যা সরকারের সঙ্গে যোগাযোগের মাধ্যম হয়ে ওঠে। সরকারের সেই সিদ্ধান্ত রাজনীতি ও আদর্শ দ্বারা প্রভাবিত বা নিয়ন্ত্রিত হয়; কিন্তু ভাইরাসকে কেউ নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা রাখে না।
মধ্যযুগে যখন প্লেগ মহামারির আকার ধারণ করেছিল, তখন উপদেশ গ্রহণ, আরোগ্য লাভ ও ভবিষ্যদ্বাণী শুনতে মানুষ ছুটেছিল ধর্মীয় গুরুদের কাছে। আজ আমরা ছুটে যাচ্ছি বিজ্ঞানী ও চিকিৎসকদের কাছে। এতেও সমাধান না পেয়ে আমরা যাচ্ছি অর্থনীতিবিদদের কাছে। মহামারির কারণে সৃষ্ট মন্দার সহজ উত্তর হলো- প্রাকৃতিক ভারসাম্য নষ্ট করা। পরিস্থিতি যাই হোক, মানুষকে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড থেকে বিরত থাকতে চাপ প্রয়োগ করবেন না। আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি থাকলেও চাহিদা জোগানের ভারসাম্য ঠিক রাখা জরুরি। কারণ অর্থনৈতিক মন্দা দেখা দিলে মানুষ অনাহারে-অর্ধাহারে এমনিতেই মারা যাবে। তাই সব দিকেই ভারসাম্য বজায় রাখার চেষ্টা করুন।
বৈশ্বিকভাবে সম্ভাব্য এ মন্দাকে শক্তভাবে মোকাবিলা করতে হবে। মন্দা মোকাবিলা করার সব উপাদান প্রত্যেক দেশেরই আছে। এটা আন্তর্জাতিক কোনো সংস্থার হাতে নেই। আমরা জানি, চাহিদা উৎসাহিতকরণ, নগদ অর্থ সঞ্চালন, কর্মসংস্থান সৃষ্টি, ভর্তুকি প্রদান ও বিনিয়োগ বজায় রাখার জন্য বৈশ্বিক কোনো কোষাগার নেই। কিন্তু সরকারগুলো করোনাভাইরাসের ভয়ে নিজ থেকেই বিশ্ব হতে বিচ্ছিন্ন হয়ে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড ও বাণিজ্য সংকুচিত করছে। এর নেতিবাচক প্রভাব হয়তো দ্রুতই প্রত্যক্ষ করা যাবে।
অসুস্থতার ভয় দেখিয়ে করোনাভাইরাস পৃথিবীকে দুর্বল করে তুলেছে। আমরা সেই ভয়ের অর্থনৈতিক পরিণতির কথা চিন্তা করতে পারছি না। বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থা এ বিষয়ে সতর্ক রয়েছে। এখন মন্দা মোকাবিলায় বিশ্বব্যাংক, আইএমএফ ও জি-৮কে এগিয়ে আসতে হবে। মনে রাখতে হবে, অসুস্থ অর্থনীতি অসুস্থ মানুষের মতোই বিষাদগ্রস্ত। তাই বৈশ্বিক মন্দার চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় অর্থনীতিবিদদের দাঁড়ানোর সময় এসেছে।
গার্ডিয়ানের কলাম লেখক
- বিষয় :
- করোনাভাইরাস
