বিনিয়োগ খরার দেশে অর্থ পাচার
এম হাফিজউদ্দিন খান
প্রকাশ: ০৫ নভেম্বর ২০১৯ | ১৩:১১
বিদেশে অর্থ পাচার ও খেলাপি ঋণ সমৃদ্ধকামী একটি দেশের অর্থনীতির জন্য
অত্যন্ত ক্ষতিকর। এক কথায় বলা চলে বিষফোড়া। বিদেশে অর্থ পাচার যেমন বড়
দুর্নীতি, তেমনি ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়ে শর্ত অনুযায়ী ঋণ পরিশোধ না করাও
দুর্নীতি। এই দুই ব্যাধি আমাদের অর্থনীতির জন্য ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
শুধু বাংলাদেশই নয়, স্বল্পোন্নত অন্যান্য দেশ থেকেও বিদেশে অর্থ পাচার হয়ে
থাকে; কিন্তু বাংলাদেশের প্রেক্ষাপট ভিন্ন। নানারকম বৈরী পরিস্থিতি
মোকাবিলা করে বাংলাদেশ এগোচ্ছে। ইতোমধ্যে উন্নয়নও যা হয়েছে, তাও কম নয়। যদি
দুর্নীতির মূলোৎপাটন করা যেত, তাহলে আমরা আরও সুফল পেতাম। উন্নয়ন-অগ্রগতির
চিত্রও আরও পুষ্ট হতো। বিভিন্ন দেশের ব্যাংকে বাংলাদেশি কতসংখ্যক
ক্ষমতাবানের কত অর্থ জমা আছে, তা এ মুহূর্তে বলে দেওয়া সহজ নয়। তাছাড়া
বিভিন্ন দেশে রয়েছে অনেকেরই সেকেন্ড হোম। এই দুস্কর্মগুলো সব সরকারের আমলেই
কমবেশি ঘটেছে, ঘটে আসছে। বিদেশে অর্থ পাচার সম্পর্কে সংশ্নিষ্টরা একেবারে
অন্ধকারে থাকার কথা নয়। তারপরও কেন থামছে না বিদেশে অর্থ পাচার? তাহলে কি এ
ক্ষেত্রে সরকারের দায়িত্বশীলদের সদিচ্ছার ঘাটতি রয়েছে? নিকট অতীতে
অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল বলেছেন, 'ব্যাংক ব্যবস্থা এবং
আমদানি-রপ্তানির আড়ালে অর্থ পাচার ঠেকাতে সরকার কার্যকর পদক্ষেপ নিচ্ছে।
আমদানি-রপ্তানিকৃত পণ্য যথাযথভাবে স্ক্যানিং করা হবে। অর্থ পাচার মূলত
ব্যাংক ও এনবিআরের মাধ্যমে হয়। এর বাইরে বড় আকারে মানি লন্ডারিংয়ের
ব্যবস্থা নেই।' তিনি এ ব্যাপারে আরও কিছু আশা-জাগানিয়া কথা বলেছিলেন।
কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, মন্ত্রীর এমন বক্তব্যের পরও কি বিদেশে অর্থ পাচার
হয়নি? এমন প্রশ্ন সঙ্গত কারণেই দাঁড়ায়। বিদেশে অর্থ পাচার কখনও কখনও
রাজনৈতিক পরিস্থিতি, সরকারের অবস্থান ইত্যাদি বিষয়ের ওপর ভিত্তি করে এর
ব্যাপকতা বাড়ে-কমে। সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে অর্থায়নও আমাদের অন্যতম আর একটি
বড় সমস্যা। সংবাদমাধ্যমে বিদেশে অর্থ পাচারের যেসব তথ্য আমরা প্রায়ই পেয়ে
থাকি, তা আমাদের সামগ্রিক প্রেক্ষাপট বিবেচনায় বলা যায়- এ যেন জাতীয়
দুর্যোগ। যারা বিদেশের বিভিন্ন ব্যাংকে অর্থ জমা রাখছেন, বিদেশে আলিশান
বাড়ি-গাড়ি ও জমি কিনছেন, এক অর্থে তারা এ দেশের প্রবাসী। বিস্ময়ের ব্যাপার
হলো- একদিকে বিদেশের বিভিন্ন ব্যাংকে জমাকৃত অর্থের পরিমাণ বাড়ছে, অন্যদিকে
একশ্রেণির বলবান-দুর্নীতিবাজ ব্যাংকগুলো খালি করে ফেলছেন। সম্প্রতি
প্রধানমন্ত্রী এ ব্যাপারে প্রতিকারের যে দৃঢ় অঙ্গীকার-প্রতিশ্রুতি ফের
ব্যক্ত করেছেন, তাতে আমরা আশান্বিত। তবে একটা প্রবাদ আছে- 'বৃক্ষ তোমার নাম
কী; ফলে পরিচয়।' কাজেই এ ব্যাপারে অঙ্গীকার-প্রতিশ্রুতিই যথেষ্ট নয়, আমরা
দৃষ্টান্তযোগ্য প্রতিকারটাই দেখতে চাই।
অতীতে দেখা গেছে, নির্বাচনের বছর দেশ থেকে বিদেশে অর্থ পাচার বেড়েছে। যখনই
কিংবা যেভাবেই এই পাচার হয়ে থাকুক, তা আমাদের দেশের সামগ্রিক প্রেক্ষাপটের
জন্য খুবই ক্ষতিকর হয়ে দাঁড়িয়েছে। বড় রকমের আঘাত লেগেছে জাতীয় অর্থনীতিতে।
ব্যাংকগুলোর চিত্র ক্রমেই বিবর্ণ হচ্ছে। অসাধুদের আস্ম্ফালন বাড়ছে অথচ যারা
সৎভাবে ব্যবসা-বাণিজ্য করতে চান, তারা নানারকম প্রতিকূলতার মুখে পড়েন- এমন
অভিযোগও নতুন নয়। অনিয়ম যদি বন্ধ করা না যায়, তাহলে তা আরও বাড়বে- এটিই
খুব স্বাভাবিক। বিনিয়োগ পরিবেশের ঘাটতি এবং আর্থিক ব্যবস্থাপনার দুর্বলতাই
বিদেশে অর্থ পাচারের অন্যতম একটি কারণ- তাও অস্বীকার করা যাবে না। 
উন্নয়নশীল দেশগুলোর অবৈধ আর্থিক প্রবাহ বা মুদ্রা পাচার নিয়ে গবেষণা ও
বিশ্নেষণকারী ওয়াশিংটনভিত্তিক আন্তর্জাতিক অলাভজনক সংস্থা গ্লোবাল
ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টিগ্রিটির (জিএফআই) নিকট অতীতে দেওয়া তথ্য অনুযায়ী
বাংলাদেশ থেকে অর্থ বিদেশে পাচারের চিত্র পাওয়া গিয়েছিল, তা আমাদের জাতীয়
বাজেটের বেশি। শুধু তাই নয়, এই অপপ্রক্রিয়া তো থেমে নেই, বরং বাড়ছে এবং
সাম্প্রতিক এর প্রমাণও মিলেছে। বিদেশে অর্থ পাচার গুরুতর অপরাধ এবং এজন্য
শাস্তির বিধান রেখে আইনও প্রণয়ন করা হয়েছে। তারপরও অর্থ পাচার কেন বন্ধ
হচ্ছে না, এটি অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। দেশে বর্তমানে প্রায় সবকিছু
ডিজিটাল পদ্ধতিতে সম্পন্ন হচ্ছে। যদি বাংলাদেশ ব্যাংক, এনবিআর, দুর্নীতি
দমন কমিশন পাচারকারীদের শনাক্ত করতে যৌথ প্রয়াস চালায়, তাহলে এই সর্বনাশা
কাণ্ডের পথ রুদ্ধ হতে পারে। বস্তুত আইনানুগ তদন্ত এবং অর্থ পাচারকারীদের
শাস্তি নিশ্চিত করতে না পারলে কেবল পণ্য জাহাজীকরণের কাগজপত্র জাল করে অর্থ
পাচার নয়, চলমান অন্যান্য প্রক্রিয়ার মাধ্যমে অর্থ পাচার রোধ করা যাবে না।
দেশের বিপুল অর্থ বিদেশে পাচার হয়ে যাওয়ায় এর কুফল দেখা দিচ্ছে
অর্থনীতিতে। এই কর্মকাণ্ডে রাজনীতির সঙ্গে সংশ্নিষ্ট দুষ্টচক্রের জড়িত
থাকার খবর নিঃসন্দেহে উদ্বেগজনক।
বিদেশে অর্থ পাচারকারীদের মধ্যে আছেন অসৎ ব্যবসায়ী, রাজনীতিক, দুর্নীতিবাজ
সরকারি কর্মকর্তা এবং অপরাধ জগতের কুশীলবরা। ব্যাংক ঋণ নিয়ে লোপাট করে তা
পাঠিয়ে দেওয়া হচ্ছে বিদেশে- এই অভিযোগও রয়েছে। ভুয়া দলিলপত্র বন্ধক দিয়ে
ব্যাংক থেকে বড় অঙ্কের ঋণ নিয়ে তা লোপাট করা দেশের ব্যাংকিং খাতের জন্য
অন্যতম আর একটি ব্যাধি হয়ে দাঁড়িয়েছে। লোপাট করা অর্থের বড় অংশ পাচার হয়ে
যাচ্ছে বিদেশে। উল্লেখ্য, বিদেশে অর্থ পাচার রোধে সংশ্নিষ্ট দায়িত্বশীল
মহলগুলোর কখন কার কী কাজ, এসব বিষয়ে সংশ্নিষ্ট কর্মকর্তা ও বিশেষজ্ঞদের
মধ্যে মতভিন্নতাও কম নয়। এই পরিস্থিতির নিরসন না ঘটাতে পারলে এত বড়
দুস্কর্ম ঠেকানোর পথ কোনোভাবেই রুদ্ধ করা যাবে না। তবে সংশ্নিষ্ট সব
বিভাগের মধ্যে সমন্বয় এ ক্ষেত্রে জরুরি। বিদ্যমান ব্যবস্থার পরিবর্তন করে
সবকিছু ঢেলে সাজানো জরুরি। অর্থনীতি ও রাজনীতির ওপর আস্থা না থাকলে আর্থিক
খাতে স্বচ্ছতার ঘাটতি বেশি দেখা দেয়, এমন অভিযোগ উড়িয়ে দেওয়া না গেলেও কারণ
শুধু এ ক্ষেত্রেই সীমাবদ্ধ নয়। যেসব কারণে খেলাপি ঋণ অনাদায়ী থাকে এবং
অর্থনৈতিক লুটপাটের বিচার হয় না, সেই একই কারণে অর্থ পাচারের সমাধানও হয়
না। এ ক্ষেত্রে রাজনৈতিক সদিচ্ছা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
আমাদের এখানে দেশি-বিদেশি বিনিয়োগের জন্য বারবার আহ্বান জানানো সত্ত্বেও
এখন পর্যন্ত আমরা এ ক্ষেত্রে কাঙ্ক্ষিত মাত্রা স্পর্শ করতে পারিনি। বিনিয়োগ
খরায় ভুগছে যে দেশ, সেখান থেকে এত বিপুল অর্থ পাচারের বিষয়টি সত্যিই খুব
বিস্ময়কর! তবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে, অর্থ পাচার রোধের ব্যাপারে
সবচেয়ে জরুরি হলো রাজনৈতিক সদিচ্ছা। একই সঙ্গে দরকার স্থিতিশীল রাজনৈতিক
প্রেক্ষাপটও। আমাদের সমাজে একটি বিষয় লক্ষণীয়, অনেকেই নীতি-নৈতিকতার কথা
বললেও তাদের জীবনাচারে দেখা যায় ঠিক এর বিপরীত চিত্র। দেশ থেকে অর্থ পাচার
রোধ, খেলাপি ঋণ আদায়, দুর্নীতি দমন অভিযান ইত্যাদি বিষয়ে দরকার একেবারে
নির্মোহ অবস্থান। এ ক্ষেত্রে যদি কোনো রকম রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গির প্রতিফলন
ঘটে, তাহলে সুফলের আশা মানে দুরাশা বৈ কিছু নয়। রাজনৈতিক দুর্বৃত্তায়ন রোধ
করতে হবে, রাজনীতির যে সংজ্ঞাসূত্র ও অঙ্গীকার এর বাস্তবায়নেও থাকতে হবে
নির্মোহ। এজেন্ডা হোক একটাই অর্থাৎ অনাচার-দূরাচার দূর করতে হবে।
দুর্নীতিবিরোধী আন্তর্জাতিক সনদ অনুযায়ী কয়েক বছর ধরে সুইস ব্যাংক জমাকৃত
অর্থের পরিমাণটা প্রকাশ করে থাকে, যা আগে করত না। এখনকার আন্তর্জাতিক
প্রেক্ষাপটে তথ্য দেওয়ার ব্যাপারে বিদেশি ব্যাংকগুলোর ওপর চাপ বাড়ছে। আমরা
অনেকেই জানি, জাতিসংঘের দুর্নীতিবিরোধী যে সনদ আছে, এর বাইরে বাংলাদেশ অর্থ
সরবরাহের তথ্য জানার জন্য আরও বেশ কিছু দেশের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় সমঝোতা
স্মারক সই করেছে। কাজেই আমি মনে করি, তথ্য জানার বিষয়টি এখন অনেক সহজ হয়ে
গেছে। এই তথ্যের ওপর ভিত্তি করেই করণীয় সম্পর্কে সিদ্ধান্ত নিতে হবে।
দুদককে এ ব্যাপারে আরও কার্যকর ভূমিকা পালন করতে হবে। অভিযুক্ত যে বা যিনিই
হোন না কেন, আইনের দৃষ্টিতে সবাই সমান। এই দৃষ্টিকোণ থেকে অভিযুক্তের
বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নিতে হবে। কোনোরকম পক্ষপাতমূলক আচরণ কিংবা
বৈষম্যমূলক দৃষ্টিভঙ্গি কাম্য নয়। অর্থ পাচার প্রতিরোধে সরকারের সংশ্নিষ্ট
দায়িত্বশীল মহলকে আরও সুনির্দিষ্ট করে দায়িত্ব ভাগ করে দিতে হবে এবং এর
মনিটরিং ব্যবস্থাও জোরদার করতে হবে। দায়িত্বপ্রাপ্ত সব মহলের মধ্যে
সমন্বয়ের বিষয়টি অত্যন্ত জরুরি। যারা অর্থ পাচার করে তারা যাতে রাজনৈতিক
প্রভাবশালী মহলের ছায়া না পায়, তাও নিশ্চিত করা জরুরি। সরকারের রাজনৈতিক
কোনো সদিচ্ছার অভাব নেই- সরকারের এমন অঙ্গীকারের ব্যাপারে কেউ কেউ প্রশ্ন
তোলেন। দুদককে শক্তিশালী করার কথা সরকারের তরফে বারবার বলা হলেও এর
কার্যকারিতা প্রমাণিত হবে তাদের অবস্থান ও কার্যক্রমের মধ্য দিয়ে। আইনের
যথাযথ প্রয়োগ তো বটেই, পাশাপাশি দেশে বিনিয়োগের উপযুক্ত পরিবেশও গড়ে তুলতে
হবে। অর্থ পাচার রোধ করতেই হবে। দেশের অর্থনীতিসহ জাতীয় সামগ্রিক স্বার্থ
সুরক্ষায় এর বিকল্প নেই। একই সঙ্গে আমাদের রাজনৈতিক ক্ষেত্রে
স্বচ্ছতা-দায়বদ্ধতা-জবাবদিহি নিশ্চিত করাও সমভাবেই জরুরি। রাজনৈতিক
ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা-দায়বদ্ধতা-জবাবদিহি নিশ্চিত হলে অনেক অনিয়ম-অনাচার সহজে
রোধ করা যাবে।
সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা ও সভাপতি সুশাসনের জন্য নাগরিক-সুজন
- বিষয় :
- অর্থনীতি
- এম হাফিজউদ্দিন খান
