নদী নিয়ে বাস্তবতা, বন্ধুত্ব ও সামান্য বিদ্বেষ
শেখ রোকন
প্রকাশ: ০৭ অক্টোবর ২০১৯ | ১৪:৫৬
আমার প্রিয় লেখক খুশবন্ত সিংয়ের আত্মজীবনীর নাম 'ট্রুথ, লাভ অ্যান্ড আ লিটল ম্যালাইস'। বাংলায় বললে- বাস্তবতা, বন্ধুত্ব ও সামান্য বিদ্বেষ। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার এবারের ভারত সফরের পর সীমান্তের দুই পাশের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও সংবাদমাধ্যমে প্রতিক্রিয়া দেখে এই গ্রন্থের শিরোনামটি বারবার মাথায় খাবি খাচ্ছে। বাংলাদেশ ও ভারতের নদী-সম্পর্ক যেন বাস্তবতা, বন্ধুত্ব ও সামান্য বিদ্বেষে ঘুরপাক খাচ্ছে। সীমান্তের দুই পাশেই আমরা কেউ কেউ বাস্তবতার কথা ভাবি। কেউ বলি নিঃশর্ত বন্ধুত্বের কথা। আবার অজান্তে বা জ্ঞাতসারেই মনের গভীরে যে পরস্পরের প্রতি সামান্য বিদ্বেষ কেউ কেউ লালন করি না, তা নয়। অথচ বাংলাদেশ-ভারত নদী সম্পর্ক এই তিনেরই মিশ্রণ।
এক. বাংলাদেশ-ভারত নদী-বাস্তবতা
বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে নদী-বাস্তবতার কথা বলি। আমাদের অভিন্ন প্রায় সব নদীর উজান ভারতের দিকে। প্রায় বলছি এই কারণে, দুই দেশের মধ্যে দাপ্তরিকভাবে স্বীকৃত ৫৪ আন্তঃসীমান্ত নদীর মধ্যে কেবল একটির উজান বাংলাদেশে। ঠাকুরগাঁও জেলার বালিয়াডাঙ্গীর বিল থেকে উৎপন্ন হয়ে ভারতে প্রবেশ করেছে ছোট্ট নদী কুলিক। এই সীমান্ত নির্ধারণে ব্রিটিশ ভারতের শেষ বড়লাট লর্ড মাউন্ট ব্যাটেন ও সীমান্ত আঁকার দায়িত্বপ্রাপ্ত সিরিল জন র্যাডক্লিফ ভারতের প্রথম প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহরুর দ্বারা নানাভাবে প্রভাবিত ছিলেন। ভূ-রাজনীতিতে দক্ষ নেহরু তৎকালীন ভারত ও পাকিস্তানের সীমারেখা এমনভাবে চেয়েছিলেন, যাতে করে পাকিস্তান পানিসম্পদের ক্ষেত্রে ভারতনির্ভর থাকে। আর পাকিস্তান নেতৃত্ব ভূ-রাজনীতি ভুলে গিয়ে তাৎক্ষণিক ও ব্যক্তিগত সুবিধার জন্য কীভাবে একের পর এক হঠকারী সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন, সেই আক্ষেপ আমরা দেখি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের অসমাপ্ত আত্মজীবনীতে।
ভূ-রাজনীতিতে নদীর গুরুত্ব বুঝেছিলেন বঙ্গবন্ধুও। তাই আমরা দেখি, স্বাধীনতার পরপরই তিনি প্রথম যে কয়েকটি বড় সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন, তার একটি নদীবিষয়ক। ১৯৭২ সালের নভেম্বর মাসে ভারতের সঙ্গে যৌথ নদী কমিশন গঠন করেন। মাত্র ১১ মাসের মাথায়! গোটা বিশ্বে যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশের নেতার অগ্রাধিকারে থাকে খাদ্য, নিরাপত্তা, যোগাযোগ, চিকিৎসা প্রভৃতি। কিন্তু বঙ্গবন্ধু তার দূরদর্শিতা দিয়ে ভবিষ্যতে বাংলাদেশে নদী সংকটের কথা ভেবেছিলেন এবং যৌথ নদী কমিশন গঠন করেছিলেন। দুর্ভাগ্যবশত পঁচাত্তরের পট পরিবর্তনের পর পরিস্থিতিও পরিবর্তন হয়ে যায়।
শেখ হাসিনাও প্রথমবার প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব গ্রহণ করে প্রথমেই নদী সংকট সমাধানে উদ্যোগী হয়েছিলেন। ১৯৯৬ সালের জুন মাসে আওয়ামী লীগ সরকার গঠন করে। মাত্র ছয় মাসের মাথায়, ওই বছরের ডিসেম্বরে ভারতের সঙ্গে গঙ্গার পানি বণ্টন চুক্তি সম্ভব হয়। তিনি দায়িত্ব গ্রহণ করার আগ পর্যন্ত নদী নিয়ে ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের একটি চুক্তিও ছিল না। আগের আড়াই দশক ধরে আলোচনা অনেক হয়েছে, সমাধান মেলেনি।
ভারতের সঙ্গে দাপ্তরিকভাবে স্বীকৃত ৫৪টির বাইরে আরও অর্ধশতাধিক 'অস্বীকৃত' অভিন্ন নদী রয়েছে। বাংলাদেশের যত নদ-নদী রয়েছে, সাড়ে চারশ' বলি আর তেরশ' বলি, প্রায় সব নদীরই চূড়ান্ত উৎস ওই শতাধিক আন্তঃসীমান্ত নদী। ফলে ভারতের সঙ্গে অভিন্ন নদী সংক্রান্ত আনুষ্ঠানিক ব্যবস্থা ছাড়া বাংলাদেশে নদীবিষয়ক পরিকল্পনা কীভাবে সম্ভব? আমরা পছন্দ করি বা না করি, এটাই বাংলাদেশের নদী-বাস্তবতা।
দুই. বাংলাদেশ-ভারত নদী-বন্ধুত্ব
বিদ্যমান বাস্তবতায় উজানের দেশ ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশ কীভাবে নদী-সুবিধা আদায় করতে পারে? উপায় একটিই, পারস্পরিক সহযোগিতা ও বন্ধুত্ব। শেখ হাসিনা তার চার মেয়াদের প্রধানমন্ত্রিত্বে নদীর প্রশ্নে সেই পথেই হেঁটেছেন। প্রথম মেয়াদে গঙ্গার পানি চুক্তির পর গত টানা তিন মেয়াদে তিনি তিস্তার পানি বণ্টন নিয়ে যথেষ্ট সিরিয়াস। কূটনৈতিক সম্পর্ক বিবেচনায় যতটুকু সম্ভব ঢাকা তিস্তার প্রশ্নে কঠোর অবস্থান নিয়েছে। ২০১৭ সালের এপ্রিলে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নয়াদিল্লি সফর প্রাকাশ্যে অন্তত তিনবার পিছিয়েছিল। এর অপ্রকাশ্য কারণ ছিল তিস্তা নিয়ে সুনির্দিষ্ট প্রতিশ্রুতি না পাওয়া। কঠোর ও কোমলে সবদিক থেকেই শেখ হাসিনা চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। ওই এপ্রিলেই ভারতের দ্য হিন্দু পত্রিকায় একটি নিবন্ধ লিখেছিলেন তিনি- 'ফ্রেন্ডশিপ ইজ আ ফ্লোয়িং রিভার'। নোবেল বিজয়ী মেক্সিকান কবি ও কূটনীতিক অক্টাভিও পাজের 'বন্ধুত্ব একটি নদী' থেকে এক ধাপ এগিয়ে প্রবহমানতার কথা বলেছিলেন।

বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক যদি দেখি, নদীপ্রবাহনির্ভরতা ছাড়া অন্যান্য সবদিকে বাংলাদেশ 'আপার হ্যান্ড'। ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের উন্নয়ন, শিল্পায়ন এবং ওই অঞ্চলের সঙ্গে কেন্দ্রের সড়ক ও রেল যোগাযোগ বাড়াতে নয়াদিল্লির প্রয়োজন ঢাকার সহযোগিতা। ওই অঞ্চলে বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলন ও সন্ত্রাসবাদী তৎপরতা নিয়ন্ত্রণেও বাংলাদেশকেই প্রয়োজন ভারতের। হিমালয় থেকে ভারত মহাসাগর ঘিরে দিল্লি ও বেইজিংয়ের যে ভূ-রাজনৈতিক ও কৌশলগত প্রতিযোগিতা, তাতে বাংলাদেশই গুরুত্বপূর্ণ খেলোয়াড়। সব ক্ষেত্রেই বন্ধুত্বের প্রশ্নে বাংলাদেশ উদার হস্ত বাড়িয়ে দিয়েছে; কিন্তু নদীর প্রশ্নে ভারত থেকে আশানুরূপ সাড়া আসেনি।
২০১১ সালের সেপ্টেম্বরেই তিস্তার পানি বণ্টন চুক্তির সবকিছু চূড়ান্ত হয়ে কেবল স্বাক্ষরের জন্য বাকি রয়ে গিয়েছিল। ভারতের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিং ঢাকা সফরে এসেছিলেন মূলত ওই চুক্তি স্বাক্ষর করতে। কিন্তু পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের আপত্তি ও আকস্মিক অনুপস্থিতিতে তা আটকে যায়। তারপর থেকে গত আট বছরে তিস্তার প্রশ্নে কেবল প্রতিশ্রুতিই এসেছে। এবারের সফরে আশা ছিল, তিস্তার প্রশ্নে একটা সুস্পষ্ট প্রতিশ্রুতি আসতে পারে। বরং ফেনী নদীর পানি উত্তোলন নিয়ে ভারতের জন্য সুবিধাজনক একটি সমঝোতা হয়েছে। নদীর প্রশ্নে ভারত কেন এগিয়ে আসছে না? নেপথ্যে কি 'সামান্য বিদ্বেষ'?
তিন. বাংলাদেশ-ভারত নদী-বিদ্বেষ
বাংলাদেশের সঙ্গে অভিন্ন নদীগুলোর পানি বণ্টনের প্রশ্নে সেখানকার রাজনীতিক, আমলাতন্ত্র ও সাধারণ মানুষের মানসিকতা একটি বড় প্রতিবন্ধকতা। আন্তর্জাতিক নিয়ম, নীতি ও রেওয়াজ অনুযায়ী অভিন্ন নদীতে অববাহিকার সব দেশের অভিন্ন অধিকার স্বীকৃত। কিন্তু ভারত মনে করে, সব নদী 'আমার'। তিস্তা চুক্তি স্বাক্ষর আটকে গিয়েছিল পশ্চিমবঙ্গের এই মানসিকতার কারণেই। যতবারই তিস্তা নিয়ে ভারতীয় পত্রিকায় খবর প্রকাশ হয়, তার নিচে সেখানকার পাঠকদের কমেন্ট দেখলে বাংলাদেশের প্রতি তাদের বিদ্বেষ বোঝা যায়।
ফেনী নদীর পানি উত্তোলনে সমঝোতার প্রশ্নে এপাশের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও কড়া প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে। বিবিসি বাংলার এক প্রশ্নের উত্তরে আমি যখন বলেছি যে, নদীটি থেকে ১ দশমিক ৮২ কিউসেক পানি উত্তোলন করলে প্রতিবেশ ও জীববৈচিত্র্যের খুব বেশি ক্ষতি হবে না, তখন আমার বন্ধুরাই অখুশি হয়েছেন। পানি উন্নয়ন বোর্ডের তথ্যমতে, নদীটিতে শুকনো মৌসুমে ৪৭-৪৮ কিউসেক প্রবাহ থাকে। সেখান থেকে বড় জোর দুই কিউসেকে কী আসে যায়? ফেনী নদীর পানি বণ্টন চুক্তিতে সমান সমান ভাগাভাগি ফর্মুলা হলেও কি ভারতের ভাগে এর চেয়ে অনেক বেশি পড়ে না? বিনয়ের সঙ্গে বলতে চাই, তাহলে অভিন্ন নদীর প্রশ্নে ভারতের মানসিকতার সঙ্গে আমাদের মানসিকতার পার্থক্য কী? এটাও ভুলে যাওয়া চলবে না, ফেনী নদীর এই পানি ভারতকে দেওয়া হচ্ছে ত্রিপুরার সাবরুম শহরের সুপেয় পানির অভাব মেটাতে। প্রতিবেশীকে অভিন্ন নদী থেকে পানি পান করতে দেব না? একই অবস্থান যদি ভারতের জনসাধারণ অন্য সব নদীর ক্ষেত্রে গ্রহণ করে, তাহলে কী হবে?
চার.
প্রশ্ন হচ্ছে, পারস্পরিক 'সামান্য বিদ্বেষ' কাটিয়ে ওঠার উপায় কী? জনসাধারণের পক্ষে দেশ বিভাগের তিক্ত অভিজ্ঞতা ভুলে যাওয়া কঠিন। কিন্তু বাংলাদেশ-ভারত নদী-বন্ধুত্ব যদি টেকসই করতে হয়, অতীত ভুলে সামনে এগিয়ে যাওয়ার কাজটি জনসাধারণের মধ্য থেকেই শুরু হতে হবে। এক্ষেত্রে বড় দেশ হিসেবে ভারতেরই দায় ও দায়িত্ব বেশি। যেমন ভারত এতদিন ধরে ঝুলে থাকা তিস্তা ইস্যু সমাধান না করেই ফেনীর সমঝোতা আদায় করেছে। অথচ তারা তিস্তার বিষয়টি সামাধান করে তারপর ফেনীর ইস্যু টেবিলে আনতে পারত। আর বাংলাদেশকেও বাস্তবতা আমলে নিতে হবে। মনে রাখতে হবে- বিদ্বেষ নয়, বন্ধুত্বই সমাধান। বন্ধুত্বে যদি কাজ না হয়, তাহলে প্রয়োজন আরও বেশি বন্ধুত্ব।
ভারতকে মনে করিয়ে দিতে চাই নদীবিষয়ক একটি আপ্তবাক্য- নদীকে সাগরের কাছে যেতে দিতে হয়। অন্যথায় সাগরই নদীর কাছে চলে আসে। সেটা সবার জন্য বিপর্যয়কর। গঙ্গায় পানি প্রত্যাহার, তিস্তায় প্রবাহ আটকানোসহ নদীবিরোধী তৎপরতার কুফল ভারতজুড়ে এখনই দৃশ্যমান। নদীগুলোকে বাংলাদেশের মধ্য দিয়ে বঙ্গোপসাগরে যেতে না দিলে যত দিন যাবে বিরূপ প্রতিক্রিয়া বাড়তেই থাকবে।
লেখক ও গবেষক; মহাসচিব, রিভারাইন পিপল
[email protected]
- বিষয় :
- বাংলাদেশ-ভারত
