ঢাকা শুক্রবার, ১৯ জুন ২০২৬

'পুশইন' নাকি এনআরসি বাস্তবায়নের ইঙ্গিত

'পুশইন' নাকি এনআরসি বাস্তবায়নের ইঙ্গিত
×

ড. আকমল হোসেন

প্রকাশ: ০৫ ডিসেম্বর ২০১৯ | ১৩:২২

বাংলাদেশ ও ভারতের দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলা একটা ইস্যু হচ্ছে ভারতের কথিত অবৈধ বাংলাদেশিদের বাংলাদেশে ফেরত পাঠানোর চেষ্টা, যা বাংলাদেশের দৃষ্টিতে বাংলাভাষী ভারতীয় নাগরিকদের বাংলাদেশে 'পুশইন' করার উদ্যোগ। গত শতাব্দীর নব্বই দশকে বিএনপি সরকার ক্ষমতায় থাকার সময় প্রথমবারের মতো ইস্যুটি দু'দেশের সম্পর্ককে নেতিবাচকভাবে প্রভাবিত করেছিল। সে সময় অভিন্ন সীমান্তে ভারতীয় অংশে বাংলাভাষীদের জড়ো করে বিএসএফের তত্ত্বাবধানে ভয় দেখিয়ে তাদের ঠেলে দেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছিল, যা ভারতের যুক্তিতে ছিল 'অবৈধ বাংলাদেশিদের পুশব্যাক' করা। বাংলাদেশের তরফ থেকে এ প্রচেষ্টায় বাধা দেওয়া হয়েছিল বিজিবি পাল্টা ব্যবস্থা গ্রহণ করে। বিষয়টিকে কূটনৈতিকভাবেও মোকাবিলা করার চেষ্টা করা হয়েছিল। সরকারের বিরোধী পক্ষ আওয়ামী লীগ অভিযোগ করেছিল যে, তখনকার প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া ভারত সফরে গিয়ে 'অবৈধ' বাংলাদেশিদের দেশে ফেরত নিতে অঙ্গীকার করে এসেছিলেন। এ বিষয়ে সরকারি ব্যাখ্যা ছিল যে, প্রধানমন্ত্রী ভারতে অবস্থানরত পাহাড়ি শরণার্থীদের ফেরত নেওয়ার জন্য সম্মত হয়েছিলেন। বেশ কিছুদিন ধরে পুশইন-পুশব্যাক ইস্যু দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কে নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছিল। আওয়ামী লীগ ১৯৯৬ সালে সরকার গড়লে ইস্যুটি তুলে ভারত নতুন সরকারকে বিব্রত করতে চায়নি সম্ভবত আওয়ামী সরকারের প্রতি তাদের বন্ধুত্বপূর্ণ দৃষ্টিভঙ্গির কারণে। কিন্তু ২০০১ সালে বিএনপি আবার সরকার গঠন করলে দুই প্রতিবেশীর সম্পর্কে আবারও 'অবৈধ বাংলাদেশি' এবং পুশইন-পুশব্যাক ইস্যুটি ফিরে আসে। ভারতে ক্ষমতাসীন বিজেপি সরকার কঠোর ভাষায় 'অবৈধ বাংলাদেশি' ইস্যুটি নিয়ে নতুন সরকারের বিরুদ্ধে অভিযোগ তুলেছিল। বিষয়টি দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কে যথেষ্ট উত্তাপ ছড়িয়েছিল।


গত মাসের শেষ দিকে হঠাৎ করে ঝিনাইদহ জেলার মহেশপুর সীমান্ত দিয়ে বাংলাদেশে অনুপ্রবেশের ঘটনা ঘটেছে। পরপর কয়েকদিন ধরে এ রকম অনুপ্রবেশ ঘটতে থাকে। বিজিবি অনুপ্রবেশকারীদের আটক করে থানায় সোপর্দ করেছে। আটকদের তথ্যমতে, তারা সবাই ভারতের ব্যাঙ্গালুরুতে বসবাস করত। আসাম রাজ্যের মতো ভারতের অন্যত্রও এনআরসি হতে পারে ধারণা করে তারা আতঙ্কিত এবং 'অন্যান্য' চাপের কারণে তাদের স্থাবর সম্পত্তি ফেলে বাংলাদেশের দিকে রওনা দিয়েছে বলে আটক ব্যক্তিরা জানায়। তাদের আটক শিবিরে রেখে পরে ট্রেনে করে পশ্চিমবঙ্গে পাঠানো হয়েছিল। সংবাদপত্রের খবর পাঠে বোঝা যায়, সরকারিভাবে চিন্তাভাবনা করেই এসব মানুষকে বাংলাদেশে ঠেলে দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। তবে তাদের পুশব্যাক বা পুশইন করা হচ্ছে বলে দুই সরকারের তরফ থেকে কোনো ভাষ্য এখন পর্যন্ত পাওয়া যায়নি। আনুষ্ঠানিকভাবে না বললেও বাংলাদেশ বিষয়টি এভাবে দেখছে, কোনো সন্দেহ নেই। বাংলাদেশের পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী প্রথমে গুজব বলে এর অস্তিত্বই অস্বীকার করেছিলেন, যা কোনো দায়িত্বের পরিচয় নয়। পররাষ্ট্রমন্ত্রী অবশ্য কিছু গুজব ও কিছু বাস্তব বলে পরিস্থিতিকে বর্ণনা করেছেন। উভয় মন্ত্রীর বক্তব্যেই দায়িত্বহীনতার সঙ্গে বিষয়টিকে যথাযথ গুরুত্ব না দেওয়ার ইচ্ছার প্রকাশ হয়েছে। অবশ্য স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বাছাই করে বাংলাদেশি হলে গ্রহণ করা হবে বলেছেন। তিন মন্ত্রীর তিন ধরনের বক্তব্যে সরকারের সুনির্দিষ্ট অবস্থানের কোনো তথ্য মেলেনি।

আসাম রাজ্যে প্রণীত জাতীয় নাগরিকপঞ্জি বা এনআরসি বাংলাদেশের জন্য অভিন্ন নদীর পানির ন্যায্য হিস্যা পাওয়ার মতো সমান গুরুত্বের দাবিদার। নাগরিক সমাজে এ ইস্যুতে উদ্বেগমিশ্রিত আলাপ-আলোচনা চললেও তত সোচ্চার নয়। এনআরসি প্রণয়ন প্রক্রিয়ার সময় বাংলাদেশ সরকারের কোনো উদ্বেগ-উৎকণ্ঠার বিষয়টি জানা না গেলেও এ বছর তা দ্বিপক্ষীয় বৈঠকে তোলা হয়েছে। বাংলাদেশ ও ভারতের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী পর্যায়ে বৈঠকে বিষয়টি নিয়ে আলোচনা হয়েছিল। ভারতীয় পক্ষ বারবার এনআরসিকে ভারতের অভ্যন্তরীণ ব্যাপার এবং বাংলাদেশের কোনো উদ্বেগ থাকার দরকার নেই বলে থাকে। গত সেপ্টেম্বরে সাধারণ পরিষদের বৈঠকের সময় দুই প্রধানমন্ত্রীর সাইড লাইন আলোচনা এবং ৬ অক্টোবর বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর দিল্লি সফরের সময় দুই সরকারপ্রধানের আলোচনায় ইস্যুটি নিয়ে বাংলাদেশ তার উদ্বেগ জানিয়েছে বলে বিশ্বাস করার কারণ আছে। ভারতের জবাব সে একই লাইনের ছিল যে, 'অভ্যন্তরীণ' বিষয় এবং 'ঢাকার চিন্তা করার কারণ নেই'। বাংলাদেশের সরকারি নেতারাও ভারতের বক্তব্যে আস্থা রেখে চলেছেন, যা নিতান্ত বিস্ময়কর। তিস্তা নদীর পানির ভাগ নিয়ে প্রতিটি আলোচনায় ২০১১-এর পর থেকে ভারতের প্রধানমন্ত্রীর পক্ষ থেকে 'সব পক্ষের সঙ্গে' আলোচনা করে চুক্তি করার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে। কোনো প্রতিশ্রুতি এখন পর্যন্ত বাস্তবায়ন হয়নি। তাই এনআরসি নিয়ে আশ্বস্ত হওয়ার কতটুকু ভিত্তি আছে, সে প্রশ্ন তোলা যেতে পারে। ঝিনাইদহ জেলার সীমান্ত দিয়ে যারা বাংলাদেশে 'অনুপ্রবেশ' করেছেন, ভারতে অবৈধ হলে কোনো প্রমাণ ছাড়া তাদের এভাবে ঠেলে দেওয়ার অর্থ কী বা এর মাধ্যমে ভিন্ন উপায়ে এনআরসি বাস্তবায়নের কোনো রিহার্সেল কিনা, তা বোঝা দরকার। বহু অতীত থেকেই বাংলাদেশ থেকে আসামে লোক গমন হয়েছে অর্থনৈতিক কারণে। দেশ বিভাগের পর রাজনৈতিক কারণ থেকে উদ্ভূত সাম্প্রদায়িক উত্তেজনায় সীমান্ত অতিক্রম হয়েছে। তাই আসামে 'অবৈধ বাংলাদেশি' প্রত্যয়টি চালু অনেকদিন ধরে। গত শতাব্দীর আশির দশকের মাঝামাঝি বিষয়টি রাজ্য রাজনীতিতে গুরুত্ব পেয়ে এসেছে। কিন্তু দক্ষিণ  ভারতে বাংলাদেশ থেকে অভিবাসন নিয়ে কোনো সমীক্ষা হয়নি। সেখানে রাজ্য পর্যায়ের রাজনীতিতে এটি কোনো ইস্যু নয়। তাই সে অঞ্চল থেকে অবৈধ বাংলাদেশি বিতাড়ন হঠাৎ করে শুরু হলো কেন? আসাম না হয়ে কর্ণাটক রাজ্যকে কেন এ ব্যাপারে বেছে নেওয়া হলো? এনআরসি বাস্তবায়নের আগে এটি কি কোনো টেস্ট কেস হতে যাচ্ছে?

সরকারিভাবে ভারত যতই বলুক না কেন, এনআরসির অভিঘাত নিশ্চিতভাবে বাংলাদেশের ওপর পড়বে। এ বিষয়ে যারা ভারতের আশ্বাসে প্রকাশ্যে আশ্বস্ত হচ্ছেন, তারাও তা জানেন। এনআরসির চূড়ান্ত তালিকার অধিকাংশ হিন্দু ধর্মাবলম্বী বলে জানা যাচ্ছে। বিজেপি ২০১৪ সালের নির্বাচনী প্রচারণার সময় 'অবৈধ বাংলাদেশিদের' নির্বাচনের পরদিনই বাংলাদেশে ফেরত যেতে প্রস্তুতি নিতে বলেছিল। তবে হিন্দু ভোটারদের মনোযোগ পাওয়ার জন্য তারা তাদের নাগরিক করার অঙ্গীকারও করেছিল। বিজেপির বিবেচনায় মুসলমানরা 'অনুপ্রবেশকারী' এবং হিন্দুরা 'উদ্বাস্তু'। এদিকে উদ্বাস্তুদের নাগরিকত্ব দেওয়ার সিদ্ধান্তে চরম বিরোধী অসমীয় জাতীয়তাবাদীরা। রাজ্যে কোয়ালিশন সরকারের অংশ আসাম গণপরিষদ কাউকেই নাগরিকত্বদানের বিরোধী। তাই ভারতের কেন্দ্রীয় সরকার নাগরিকত্ব আইনের সংশোধনী পাসের মাধ্যমে হিন্দু, বৌদ্ধ, শিখ ও পারসিদের নাগরিক হিসেবে মেনে নিতে চায়। অন্যদিকে বিজেপির নেতারা, কেন্দ্রীয় ও রাজ্যস্তরের- ভারতজুড়ে এনআরসি প্রণয়ন করতে চান। বিশেষ করে বাংলাদেশের সীমান্তবর্তী রাজ্যগুলো তাদের লক্ষ্যের ভেতর আছে। ভারতে ক্ষমতাসীন হিন্দু জাতীয়তাবাদী সরকার তার রাজনৈতিক এজেন্ডা বাস্তবায়নের ব্যাপারে যে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ, তা কাশ্মীর রাজ্যের মর্যাদাকে আনুষ্ঠানিকভাবে পরিবর্তন করে প্রমাণ দিয়েছে। এখন তাদের হাত আছে এনআরসির (যা কিনা উচ্চ আদালতের নির্দেশিত) মতো আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় বাস্তবায়ন করা এবং তা করতে গিয়ে বাংলাদেশ যে ক্ষতিগ্রস্ত হবে, তা নিয়ে কোনো সন্দেহ থাকা উচিত নয়।

অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়



আরও পড়ুন

×