গণতান্ত্রিক সংস্কৃতি ও সহিষ্ণুতা
এমাজউদ্দীন আহমদ
প্রকাশ: ২৯ ডিসেম্বর ২০১৯ | ১৪:৫৮ | আপডেট: ২৯ ডিসেম্বর ২০১৯ | ১৫:২৩
দেশে পারস্পরিক সুসম্পর্কের ক্ষেত্রে দেখা দিয়েছে এক ধরনের দুর্ভিক্ষ। সমাজে সব আছে, নেই শুধু সুসম্পর্কের সবুজ আচ্ছাদন। অসহিষ্ণুতার উত্তাপে চারদিক যেন খাঁখাঁ করছে। বাক্যবিনিময়ে নেই কোমলতার কোনো চিহ্ন। কথোপকথনে গালাগালের প্রাবল্য পীড়াদায়ক হয়ে উঠেছে। সমাজে সবসময় কিছু ব্যক্তি থাকে, যাদের কথাবার্তা দুর্গন্ধময়। সব কথায় তাদের ঝগড়ার গন্ধ। তারা এতদিন ছিল ব্যতিক্রম। এখন তারাই সমাজের স্বাভাবিক মানুষ। বাংলাদেশের এই রূপান্তর অত্যন্ত দুর্ভাগ্যজনক। এ দেশের মানুষ কিন্তু মিষ্টি কথা শুনতে অভ্যস্ত। ভালো কথার প্রতি তাদের দুর্বলতার অন্ত নেই। কারও বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ থাকলেও সেই অভিযোগ পেশ করা হয় গ্রহণযোগ্য প্রক্রিয়ায়। রুচিশীল ও শালীন কথাবার্তার মাধ্যমে। অশালীন উচ্চারণ সব সময় ঘৃণ্য বলে বিবেচিত। আজ সেই বাঁধন টুটেছে। এই পরিস্থিতি আমরা কাটাব কীভাবে? এই সমাজে কেউ একা থাকতে চায়নি। অনাত্মীয় পাড়া-প্রতিবেশীদের সঙ্গেও মনগড়া সম্পর্ক তৈরি করে সবাই বসবাস করেছেন।
দেশের শ্রেষ্ঠতম শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে সম্ভবত এই সনাতন ট্র্যাডিশনকে অনুসরণ করেই সম্বোধনের ক্ষেত্রে ভাই শব্দটি প্রয়োগ করা হয়। একজন অনুজতুল্য জুনিয়র সবসময় তার সিনিয়রকে তার নামের শেষে ভাই শব্দ প্রয়োগ করেই সম্বোধন করেছেন। আজও সেটা বহাল রয়েছে। মোট কথা, এই সমাজে আত্মীয়তার বন্ধনে আবদ্ধ হয়ে সবাই বেঁচে থেকেছেন শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে। অনাত্মীয়কে আত্মীয় করে, পরকে আপন করে, দূরকে কাছে টেনে, পরস্পরের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক-সূত্রে আবদ্ধ হয়ে সমাজ জীবনকে বাসযোগ্য করে তুলেছিলেন আমাদের পূর্বপুরুষরা। সৃজনশীলতা এ ক্ষেত্রে কাজ করেছে মূল্যবান মণি-মুক্তার মতো। কোমলতা ছিল কাঙ্ক্ষিত মূল্যবোধ। অপরের প্রতি শ্রদ্ধার ভাব ছিল সামাজিক সম্পদ। উত্তেজিত না হয়ে ধীরস্থিরভাবে বক্তব্য উপস্থাপন, কারও মর্যাদা ক্ষুণ্ণ না করে প্রতিবাদ করা, কারও বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ থাকলেও অতি সাবধানে সেটা পেশ করা বরাবরই এই সমাজে প্রশংসিত হয়ে এসেছে। কারও সঙ্গে প্রথম দেখায় সালাম, আদাব জ্ঞাপন এবং কুশলাদি জানার আগ্রহ ছিল সামাজিক শিষ্টাচার।
প্রাচ্যদেশে সামাজিক মূল্যবোধ যে ভূমিকা পালন করেছে, পাশ্চাত্যে সেই ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছে রাজনৈতিক মূল্যবোধ বা রাজনৈতিক সংস্কৃতি। ব্রিটেনে এটি সংসদীয় সংস্কৃতি নামে পরিচিত। আমেরিকায় সেটা প্রয়োগবাদ এবং পশ্চিম ইউরোপে যুক্তিবাদ নামে চিহ্নিত। সংসদীয় সংস্কৃতির মর্মমূলে রয়েছে এই ভাবনা- যা শুনে আমি ব্যথিত হই, সেটা অন্যের জন্য আমি উচ্চারণ করব না। যে কথা আমার জন্য অবমাননাকর, সে কথা আপনার জন্য আমি উচ্চারণ করব না। এভাবে শ্নীল-অশ্নীলের পার্থক্য রচিত হয়েছে- যা সুরুচিকর বা সুনীতি সমর্থিত তা-ই উচ্চারিত হওয়া প্রয়োজন। আমেরিকার উইলিয়াম জেমস, চার্লস পিয়ার্স, মার্ক টোয়েন প্রমুখ চিন্তাবিদের হাতে প্রয়োগবাদের সার্থক বাস্তবায়ন ঘটেছে। এই মতবাদে কোনো বক্তব্য বা উক্তি বা ধারণা বা নীতি মানবকল্যাণে কতটুকু প্রাসঙ্গিক, সেই মানদণ্ডে তার বিচার হয়। প্রয়োগবাদিতার এই প্রশ্ন তুলে ধরা হয়, আপনি যা বললেন, তা যে সত্য- তা প্রমাণ করুন। অসত্য উচ্চারণ পরিহার করুন। অরুচিকর বক্তব্য অগ্রহণযোগ্য। কোনো মানহানিকর কথা পরিত্যাজ্য। ইউরোপের যুক্তিবাদও খানিকটা এমনি। যুক্তিই কথা বলবে, তা যত মৃদুস্বরে উচ্চারিত হোক না কেন। ঝগড়ার কোনো প্রয়োজন নেই। আপনার বক্তব্যে যুক্তি থাকলে যুক্তির কষ্টিপাথরে যাচাই হয়ে তাই হয়ে উঠবে সত্যের সোনা। সুতরাং অযথা চিৎকার করবেন কেন? কেন বিশ্রী মুখ ব্যাদানে অপরকে বিব্রত করবেন? আপনি যুক্তির ভিত্তিতে অগ্রসর হোন, তা যতই ছোট হোন অথবা হোন প্রভাবশালী সম্রাট বা দিজ্ঞ্বিজয়ী মহাবীর।

রাজনৈতিক সংস্কৃতির মাধ্যমে তারা কাছাকাছি এসেছেন। তর্ক-বিতর্কে লিপ্ত হন বটে, কিন্তু শেষ পর্যন্ত হাসিমুখে হাতে হাত মিলিয়ে, একে অপরকে ধন্যবাদ জ্ঞাপন করে বিদায় হন। আমাদের দেশেও এমনি পরিবেশ বিরাজ করত সামাজিক মূল্যবাধের প্রভাবে। বর্তমানের নির্মমকালে সামাজিক মূল্যবোধের বড্ড বেশি আকাল পড়েছে। দুর্ভাগ্যের বিষয়, সমাজের উঁচু স্তরেই এই আকালের প্রকোপ বড্ড বেশি মনে হয়। রাজনীতিকদের কেউ কেউ মুখে যা আসে তাই বলেন। অ-কথা ও কু-কথার নাটক ছড়িয়ে দর্শক-শ্রোতাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করেন কোনো স্থানে কিংবা জনসভায়। পরবর্তী পর্যায়ে সেটা জাতীয় সংসদে প্রবেশ করে। যে কোনো অধিবেশনে অনুষ্ঠিত সংসদ বিতর্কের দিকে দৃষ্টি দিন, এর ভূরি ভূরি প্রমাণ মিলবে।
আমাদের জাতীয় নেতাদের সম্পর্কেও কোনো রাজনীতিকের অশ্নীল বক্তব্য চোখে পড়বে। সম্প্রতি সমাজের শীর্ষস্থানীয় ব্যক্তিবর্গের কণ্ঠে ধ্বনিত হয়েছে তেমনি অসংসদীয় বক্তব্য। সবাই সমাজে সম্মানীয়। তাদের কাছ থেকে সবার প্রত্যাশা অনেক বেশি। তাদের মুখে যা উচ্চারিত হয়েছে তা রুদ্ধদ্বার কক্ষে হলে কেউ তা জানতেন না। কেউ কিছু বলতেন না। কিন্তু জাতীয় দৈনিকের সংবাদ সংগ্রাহকদের ডেকে সব রকম প্রস্তুতি গ্রহণ করে প্রতিপক্ষকে শত্রু হিসেবে চিহ্নিত করে, শুধু ঘায়েল করার লক্ষ্যে যেসব শব্দ উচ্চারণ করেন, তা নিজেরা যদি আবার নিজ কানে শোনেন তাহলেই অনুভব করবেন অসহিষুষ্ণতার কোন পর্যায়ে আমরা উপনীত হয়েছি। সারা জীবন কাটিয়েছি ছাত্রছাত্রীদের মধ্যে। গালমন্দ খেয়ে। কোনো কোনো সময় ধমক দিয়ে, ধমক খেয়েও। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মধুর ক্যান্টিনে অনেক সময় তাদের দেখা মিলবে। বিভিন্ন দল-মতের অনুসারী তারা। একসঙ্গে চা খায়, তর্ক করে। কোনো কোনো সময় ঝগড়া করে। ঝগড়া থেকে হাতাহাতি। মাঝেমধ্যে রক্তারক্তিও ঘটে। কিন্তু মাত্র ক'দিনের মধ্যে আবার তারা একত্র হয়ে একসঙ্গে চা খায়। আবারও তর্ক করে। তাদের প্রতিপক্ষ রয়েছে। প্রতিপক্ষকে তারা কিন্তু শত্রু জ্ঞান করে না। স্থায়ী শত্রুরূপে তো কখনও নয়। এসব কারণেই তাদের দিকে তাকিয়ে আশান্বিত হই। উজ্জ্বল ভবিষ্যতের স্বপ্ন দেখি।
আমাদের গণতান্ত্রিক সমাজটা এখনও অনগ্রসর। অনেক ক্ষেত্রেই পশ্চাৎপদ। তাই এই সমাজে আলোর গতিটা যেমন কেন্দ্র থেকে প্রান্তে যায়; প্রান্ত থেকে কেন্দ্রে নয়, তেমনি অমাবস্যার নিকষ কালো অন্ধকারও কেন্দ্র থেকে প্রান্তে ছড়িয়ে পড়ে। আমাদের ভয়টা এখানেই। এ জন্যই আমরা ভীত হই, সন্ত্রস্ত হই। যাদের কাজকর্ম ও কথাবার্তা সামাজিক জীবনকে গভীরভাবে প্রভাবিত করতে পারে, যাদের শালীনতাবোধ এবং সহিষ্ণুতা সবার জন্য দৃষ্টান্তস্বরূপ হয়ে উঠতে পারে, তাদের একটু বেশি সতর্ক হওয়াই বাঞ্ছনীয় নয় কি? কোনো অভিযোগ করছি না। তবে অনুযোগ রইল। বাচ্চাদের ছেলেমানুষী উপভোগ্য। বুড়োদের ছেলেমানুষী নিছক বিরক্তিকর। অন্তত এই সমাজে সেটা কোনোক্রমেই কাম্য নয়। নিজেদের গবেষণার ফল বিবেচনার ভার অপরের ওপর ছেড়ে দিন। নিজেই নিজের কর্মের বিচারক নাইবা হলেন। সমাজে সহনশীলতার প্রয়োজন সবচেয়ে বেশি। প্রয়োজন অনেক বেশি ধৈর্যের; প্রচুর সমঝোতা ও রুচিশীলতার, পারস্পরিক হৃদয়তার। একত্রে পথচলার। মাথা ঠান্ডা রাখা, উত্তেজিত না হওয়ার সময় তো এটাই। আর এটাই হচ্ছে প্রকৃত গণতান্ত্রিক সংস্কৃতির সহিষুষ্ণতা। আর এটাই আমাদের বেশি প্রয়োজন।
রাষ্ট্রবিজ্ঞানী; সাবেক উপাচার্য, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
- বিষয় :
- সমাজ ও রাষ্ট্র
- এমাজউদ্দীন আহমদ
