সামাজিক বৈষম্যে বাড়ছে অপরাধ
ড. জিয়া রহমান
প্রকাশ: ১২ জানুয়ারি ২০২০ | ১৪:৩৮
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ধর্ষণের ঘটনায় যখন গোটা দেশ উত্তাল, তখন রাজধানীর ধামরাইয়ে বাসে ধর্ষণের পর তরুণীকে হত্যার ঘটনা ঘটল। একের পর এক ধর্ষণের ভয়াবহ খবর প্রশ্ন জাগায়- এ কোন অন্ধকার সমাজকে গ্রাস করছে। রাজধানীর রামপুরার একটি মেসে কর্মজীবী দুই তরুণী ধর্ষণের শিকার হয়েছেন। রোববার সমকালের শীর্ষ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দেশজুড়ে নারী-শিশুর ওপর নির্যাতন ও যৌন সহিংসতার ৫১ দশমিক ৬২ শতাংশই ধর্ষণের ঘটনা। ওই প্রতিবেদনেই বলা হয়েছে, এসব ক্ষেত্রে মামলাগুলোতে সাজার হার মাত্র ১১ দশমিক ২৬ শতাংশ। ধর্ষণের মতো ভয়াবহ অপরাধের ঝুঁকি সমাজে ক্রমেই বিস্তৃত হচ্ছে। বিশেষত গত ৫ জানুয়ারি রাজধানীর কুর্মিটোলা গলফ ক্লাবের সামনে যে ঘটনাটি ঘটেছে তা হৃদয়বিদারক ও জঘন্য। এর নিন্দা জানানোর ভাষা আমাদের জানা নেই। সমাজবিজ্ঞানী হিসেবে এ ঘটনাকে খুবই অস্বাভাবিক বলে মনে হয় না। সাধারণ মানুষের কাছে যেহেতু এ ধরনের ঘটনা বিশ্নেষণ করার মতো যথেষ্ট সুযোগ থাকে না, সে কারণে তারা যেভাবে ধাক্কা খায়; একাডেমিশিয়ান হিসেবে আমাদের সেভাবে ধাক্কা লাগে না। কারণ আমরা বুঝতে চেষ্টা করি, এ ধরনের ঘটনা সমাজের মধ্যে বিদ্যমান অস্থিরতা, অসমতা ও বৈষম্যেরই প্রতিফলন। যৌন সম্পর্ক সমাজের বাইরের কোনো বিষয় নয়।
কুর্মিটোলার ঘটনায় অভিযুক্তকে আটকের আগের দিন আমি আরটিভির গণতন্ত্র সংলাপ নামক টকশোতে অনেকটা উপযাচক হয়ে ভিকটিমের জবানবন্দির ওপর ভিত্তি করে একটি ভবিষ্যদ্বাণী করেছিলাম। আমি ধর্ষকের আর্থসামাজিক অবস্থান বা সে কোন ধরনের ধর্ষক তার একটি ধারণা দিয়েছিলাম। আমি সেখানে বলেছিলাম, ভিকটিমের জবানবন্দি অনুযায়ী এই ধর্ষক একজন সিরিয়াল রেপিস্ট, খুবই নিম্ন শ্রেণির একজন ব্যক্তি, মাদকাসক্ত এবং ভবঘুরে ধরনের হতে পারে। পরদিন তাকে গ্রেপ্তারের পর র্যাবের পক্ষ থেকে যে অফিসিয়াল বক্তব্য পেলাম, সেখানে আগের রাতে টকশোতে আমার বলা কথাগুলোর হুবহু মিল দেখি। কোনো সন্দেহ নেই যে, এই ধর্ষক মানসিক ভারসাম্যহীন। সে অগ্র-পশ্চাৎ বিবেচনা করার অবস্থায় নেই। দ্বিতীয় বিষয়টি হলো সামাজিক।
আমরা বারবার বলেছি, নতুন যে সমাজের দিকে আমরা যাচ্ছি তার প্রাথমিক স্তরের উন্নয়নে অসম চরিত্র বিদ্যমান। এটা সারাবিশ্বেই আছে। অর্থাৎ পুঁজিবাদী সমাজব্যবস্থায় কিছু লোক যখন তাদের ভোগবাদী চিন্তা থেকে লুণ্ঠন প্রক্রিয়ায় যুক্ত হয়, তখন সমাজের একটি বড় অংশ তাদের অধিকার থেকে বঞ্চিত হয়। এই সামাজিক বৈষম্যের কারণে আমরা যেমন একদিকে আপন জুয়েলার্সের মালিকের ছেলে বা সে ধরনের উচ্চ শ্রেণির মধ্যে অসংলগ্ন কার্যকলাপ দেখি, একইভাবে ছিন্নমূল শ্রেণিরও কেউ কেউ নানা অসহায়ত্বের কারণে একই দিকে ধাবিত হচ্ছে। এর ফলেই মূলত উন্নত বিশ্বের সেই কল্যাণ রাষ্ট্রের প্রয়োজনীয়তার বিষয়টি সামনে আসে। পৃথিবীতে যেসব কল্যাণ রাষ্ট্র আছে সেগুলোয় পুঁজিবাদের নানা বিধ্বংসী কর্মকাণ্ড নিয়ন্ত্রণ করার জন্য সাধারণ মানুষকে বিভিন্ন ধরনের সুবিধা দেওয়া হয়। যেমন তাদের বাসস্থান, বেকার ভাতাসহ বিভিন্ন সুবিধা দিয়ে সামাজিক অসমতা দূর করা হয়। উন্নত বিশ্বেও অপরাধ দমনে ব্যক্তিকে নিজের ওপর নির্ভরশীল হতে হয়। আমরা সিসিটিভি ক্যামেরার যে বিস্ম্ফোরণ ও সতর্ক সংকেত পদ্ধতির ক্রমবর্ধমান পরিসর দেখছি, তা কিন্তু বাণিজ্যিকীকরণের মধ্য দিয়ে সেই পুরোনো তত্ত্ব 'সারভাইভাল অব দ্য ফিটেস্ট'কে স্মরণ করিয়ে দেয়। অর্থাৎ ব্যক্তির নিরাপত্তা ব্যক্তিকেই নিশ্চিত করতে হবে। কাজেই বাংলাদেশকে যদি সামনের দিকে এ ধরনের দৃষ্টিতে দেখতে চাই তাহলে সামাজিক অসমতা দূর করার বিকল্প নেই।
উন্নত বিশ্বে অপরাধ দমনে কয়েকটি বিষয় খুব গুরুত্বসহ পর্যালোচনা করা হয়। যেমন অপরাধপ্রবণ এলাকাগুলোয় পুলিশি টহল কয়েকগুণ জোরদার করা, অন্ধকারাচ্ছন্ন এলাকায় পর্যাপ্ত লাইটিং করা এবং কোনো এলাকায় ঝোপঝাড় থাকলে তা কেটে একটি নিরাপদ পরিবেশ সৃষ্টি করা হয়। কুর্মিটোলার যে স্থানটিতে ধর্ষণের ঘটনা ঘটেছে, সেখানে অপরাধ দমনের এই কৌশলগুলো কতটুকু কার্যকর ছিল তা যথেষ্ট প্রশ্নসাধ্য। ঢাকাসহ সারাদেশে এ রকম অনেক স্থান রয়েছে, যেগুলোয় অপরাধ দমন কৌশল দারুণভাবে অনুপস্থিত। রেলস্টেশন ও বাস টার্মিনালগুলোয় নজরদারি কতটুকু? এসব এলাকায় মজনুর মতো ভবঘুরে, মলম পার্টি, অজ্ঞান পার্টি, ছিনতাই চক্রের সদস্যসহ নানা ধরনের অপরাধীর অবাধ বিচরণ থাকলেও তাদের ওপর খুব বেশি নজরদারি নেই। ফলে এসব জায়গায় সংঘটিত অপরাধের সংবাদ আমরা মাঝেমধ্যেই পেয়ে থাকি। আমরা তাত্ত্বিকভাবে যে 'প্রো-অ্যাকটিভ পুলিশিং'-এর কথা বলি, যদি এখন থেকে সেই ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে না পারি তাহলে ভবিষ্যতে হতাশা প্রকাশ করা ছাড়া আর কিছুই করার থাকবে না। কারণ একটি ঘটনা ঘটে যাওয়ার পর আমরা যদি শুধু তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নিয়ে ক্ষান্ত থাকি তাহলে তা দিয়ে ভবিষ্যতে অপরাধকে কমিয়ে আনা যাবে না। তাই উন্নত বিশ্বে অপরাধ দমনে যেসব কৌশল কার্যকর রয়েছে, আমাদেরও এ ধরনের আধুনিক কৌশল প্রয়োগ করতে হবে।

আমরা তিন-চার বছর ধরে ক্রিমিনাল জাস্টিস সিস্টেমের কথা বলে আসছি। আমাদের ক্রিমিনাল জাস্টিস সিস্টেমের মধ্যে ভিকটিমের রক্ষাকবচ আছে বলে মনে করি না। বিভিন্ন সময় আমরা মানবাধিকার সংগঠনগুলোকে অপরাধীদের অধিকার নিয়ে কথা বলতে দেখেছি। এটা থেকে বের হয়ে ভিকটিমের অধিকার সংরক্ষণে উন্নত বিশ্বে ভিকটিমোলজি নামে একটি বিভাগের যাত্রা শুরু হয়েছে। এই বিভাগের দাবি হলো, পুরো প্রসিকিউশন সিস্টেম থেকে শুরু করে সংশোধনাগার বা কারাগার পর্যন্ত ভিকটিমকে যেন সেবা দেওয়া হয়। এটি বাংলাদেশে একেবারেই অচল বললেই চলে। ফলে কোনো না কোনোভাবে বিচারহীনতার যে সংস্কৃতি তার অবসান ঘটছে না।
বিচারহীনতার শুরু পুলিশ থেকে। ভিকটিম প্রভাবশালী না হলে তার এফআইআর গ্রহণে গড়িমসি লক্ষ্য করা যায়, চার্জশিটেও বিভিন্ন ফাঁকফোকর রেখে দেওয়া হয়। দ্বিতীয়ত, প্রসিকিউশনের অদক্ষতা, অযোগ্যতা ও অনিয়ম বিচারহীনতার আরেকটি কারণ। তৃতীয়ত, কোনো কারণে রায় হলে অপরাধীদের কারাগারে নেওয়ার পর সেখানেও নানারকম নেতিবাচক কর্মকাণ্ড ঘটে থাকে। উন্নত বিশ্বে অপরাধীর মানসিকতা পরিবর্তনে আধুনিক জীবন কৌশলের সব উপাদানের সমন্বয়ে কারাগারকে সংশোধনাগার করা হয়েছে। কিন্তু আমাদের দেশে সংশোধনাগার না থাকায় অপরাধীরা কারাগার থেকে বের হয়ে আবার অপরাধে জড়িয়ে পড়ে। ফলে আমরা যদি এ ব্যবস্থাগুলো গ্রহণ করতে না পারি, তাহলে অবস্থার উন্নতি ঘটানো ক্রমেই কঠিন হবে।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ভিকটিমের অধিকার সংরক্ষণে যে বিষয়টি ঐতিহাসিকভাবে পর্যালোচিত হয়েছে, তা হচ্ছে সামাজিক আন্দোলন। পুরো ষাটের দশকে আমরা আমেরিকায় কৃষ্ণাঙ্গদের আন্দোলন, শান্তি আন্দোলন, নারী অধিকার আন্দোলন, পরিবেশ আন্দোলনসহ বেশ কিছু আন্দোলন দেখেছি। তারা যে জিনিসটি চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে তা হলো, পুরো ক্রিমিনাল জাস্টিস সিস্টেমের মধ্যে দুর্বলতা রয়েছে। অপরাধ দমনে যে আইন করা হয়েছে, তা মূলত অপরাধীদের পক্ষেই করা হয়েছে। সারাবিশ্বের কোথাও রাষ্ট্রকে উপযাজক হয়ে ভিকটিমের অধিকার নিশ্চিতে কোনো ব্যবস্থা গ্রহণ করতে দেখা যায়নি। এমনকি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর আমেরিকার মতো দেশে কৃষ্ণাঙ্গ, অভিবাসী ও পিছিয়ে পড়াদের অধিকার সুরক্ষায় রাষ্ট্র কোনো ভূমিকা পালন করেনি। ফলে মানুষকে রাস্তায় নামতে হয়েছে। আমেরিকায় যে বিষয়টি নিয়ে সর্বপ্রথম আন্দোলন হয়েছে, সেটিও একটি ধর্ষণের ঘটনা ছিল। এতে নারীরা রাস্তায় নেমে আসেন এবং পরবর্তী সময়ে এক ধরনের সামাজিক সমতা সেখানে প্রতিষ্ঠা পায়।
অনেকেই বলে থাকেন, বাংলাদেশ অনিরাপদ। আমি বলব, এটি অনেকাংশে একপক্ষীয় চিন্তা। পুরো পৃথিবীতেই আমরা এ ধরনের ঘটনা দেখছি। এটি মূলত পুরুষতান্ত্রিক মানসিকতার বহিঃপ্রকাশ। উন্নত বিশ্বেও এ ধরনের মানসিকতা দেখা যায়। সেখানেও নারীকে নানাভাবে ভোগ্যপণ্য হিসেবে উপস্থাপন করে এক ধরনের অসমতা টিকিয়ে রাখা হয়েছে। ভিকটিমের অধিকার সংরক্ষণে অগ্রগতির পেছনে কাজ করেছে সামাজিক আন্দোলন। এরই পরিপ্রেক্ষিতে আমি আশাবাদী হই, কুর্মিটোলায় ধর্ষণের ঘটনায় গত কয়েক দিন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে যে আন্দোলন হয়েছে তাতে আগামীর সম্ভাবনাময় বাংলাদেশ দেখতে পাচ্ছি।
তত্ত্বানুযায়ী, কোনো সমাজ যখন উন্নত থেকে উন্নততর হবে, তখন নতুন সামাজিক আন্দোলন দেখা যাবে। সহিংসতা ছাড়াই আন্দোলন দেখলাম। এই আন্দোলনের ফলাফল সুদূরপ্রসারী। তারা নানা কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে প্রতিবাদ জানিয়েছে এবং জাতির কাছে এক ধরনের বার্তা দিয়েছে। প্রথমবারের মতো সব শ্রেণিপেশার মানুষ দ্বন্দ্ব ভুলে এক কাতারে দাঁড়িয়ে আন্দোলন করেছে। আমরা আরেকটি বিষয় দেখেছি, এই ঘটনায় ভিকটিমকে ভিকটিম হিসেবেই বিবেচনা করা হয়েছে, তার নাম ও পরিচয় গোপন থেকেছে। এটিও এক ধরনের অগ্রগতি। আন্দোলনের পরিপ্রেক্ষিতে এক ধরনের চাপ সৃষ্টি হয়েছিল আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ওপর। তারা দ্রুত আসামিকে গ্রেপ্তার করতে সক্ষম হয়েছে। তাদের সাধুবাদ জানাই।
আরেকটি বিষয় লক্ষণীয়, কেউ কেউ মজনুকে নিয়ে সন্দিহান রয়েছেন; তাকে জজ মিয়া বলার চেষ্টা করেছেন। আমি এটাকেও খাটো করে দেখি না। আমি মনে করি, সত্য আজ বা কাল প্রকাশ হবেই। তবে ভিকটিমের বক্তব্য ও ধর্ষকের স্বীকারোক্তির আলোকে বিশ্বাস করতে চাই- মজনুই প্রকৃত ধর্ষক। এখন দরকার জবানবন্দির মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে বৈজ্ঞানিক উপায়ে তথা ডিএনএ টেস্টের মাধ্যমে বিষয়টি আরও স্পষ্ট করা। আমি মনে করি, অপরাধ দমনের জন্য উপযুক্ত পরিবেশ নির্মাণ করার পাশাপাশি ক্রিমিনাল জাস্টিস সিস্টেমকে ঢেলে সাজানো ও পুরুষতান্ত্রিক মানসিকতা থেকে বের হয়ে আসা দরকার। আমরা যদি প্রাত্যহিক জীবনের সব কার্যক্রমে নারীর ক্ষমতায়ন নিশ্চিত করতে পারি, তাহলে উন্নত বিশ্বের মতো আমরাও অপরাধ দমনে সফল হবো এবং সমতার ভিত্তিতে একটি কল্যাণ রাষ্ট্র গঠন করতে পারব।
সমাজবিজ্ঞানী; অধ্যাপক, অপরাধবিজ্ঞান বিভাগ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
- বিষয় :
- মুখোমুখি অবাধ্য সত্য
- ড. জিয়া রহমান
