করোনা ও আল্লাহর রহমতের প্রত্যাশা
ড. মোহাম্মদ বাহাউদ্দিন
প্রকাশ: ১৮ জুন ২০২০ | ১২:০০ | আপডেট: ১৮ জুন ২০২০ | ১৫:২৯
মহান আল্লাহ জগৎ সৃষ্টি করে সেরা জীব হিসেবে মানুষকে স্বীকৃতি দিলেন। 'লাকাদ খালাকনাল ইনসানা ফি আহসানি তাকভিম' অর্থাৎ অবশ্যই আমি মানুষকে সৃষ্টিকুলের সর্বাপেক্ষা অধিক সৌন্দর্য সহকারে সৃষ্টি করেছি। এরশাদ হচ্ছে, 'ওয়া ইন তাউদ্দু নেঅ্মাতাল্লাহি লা তুহ্সুহা' অর্থাৎ আমি কত নেয়ামত দিয়েছি তা গণনা করে শেষ করা যাবে না। মহান স্রষ্টা প্রদত্ত এই অজস্র নেয়ামত প্রাপ্তির পরিপ্রেক্ষিতে বান্দাদের জন্য করণীয় হচ্ছে- 'লাইন শাকারতুুম লাআযিদান্নাকুম ওয়ালা ইন কাফারতুম ইন্না আযাবি লাশাদিদ' অর্থাৎ আমার প্রদত্ত নেয়ামত লাভের পরিপ্রেক্ষিতে যদি তোমরা কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করো তবে তোমাদের ওপর আমার নেয়ামত আরও বৃদ্ধি করে দেব, আর যদি অকৃতজ্ঞ হয়ে যাও, তবে জেনে রেখ তোমাদের জন্য কঠিন শাস্তির ব্যবস্থা করে রাখা হবে- যা তোমাদের মোকাবিলা করতে হবে।
উপরিউক্ত আয়াতে কারিমাগুলোতে মহান আল্লাহ আমাদের প্রতি যেসব নির্দেশনা প্রদান করেছেন তার সারবত্তা হলো- জগতে মহান স্রষ্টার যোগ্য প্রতিনিধি মানুষ, যাকে সবদিক থেকে শ্রেষ্ঠত্ব প্রদান করে মহান রবের প্রতিনিধিত্বের মর্যাদা দেওয়া হয়েছে। স্রষ্টার অপার করুণা লাভের পরিপ্রেক্ষিতে সর্বদা শুকরিয়া জ্ঞাপন করলে খুশি হয়ে তিনি নেয়ামতরাজিতে আরও প্রবৃদ্ধি দান করেন এবং তার বিপরীতে যদি অবাধ্যতা প্রদর্শন বা সীমা লঙ্ঘন করা হয় তবে অনাকাঙ্ক্ষিত নানা ধরনের বিপর্যয় মোকাবিলা করতে হবে- যা বান্দার সহ্যসীমায় নাও থাকতে পারে; এমন দুঃসহ পরিস্থিতির বিষয়ই পরিব্যক্ত হয়েছে উপরিউক্ত সতর্ক-বার্তায়। সুরা রুমে বলা হচ্ছে- জলে ও স্থলে যা কিছু আপতিত বিপদ-মুসিবত সবই মানুষের হাতের কামাইকৃত। তাই বর্তমান করোনা মহামারির এই মহাবিপর্যয়ের দায় মানুষ হিসেবে কোনো মতেই আমরা এড়াতে পারি না। মানবতার মুক্তিদূত বিশ্বনবী মোহাম্মদ (সা.) ইরশাদ করেছেন- 'যখন কোনো জনপদে অশ্নীলতা, বেহায়াপনা জাতীয় কার্যক্রমের অবাধ ও প্রকাশ্য প্রদর্শনী হতে থাকে তখন তথাকার অধিবাসীদের ওপর মহামারির প্রাদুর্ভাব ঘটে। এতদ্ব্যতীত সেখানে এমন সব রোগব্যধির সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়ে যা তাদের পূর্বপুরুষরাও কখনও প্রত্যক্ষ করেনি।
বিশ্বব্যাপী করোনার করাল গ্রাসের এই মহাবিপর্যয়ের সময়ে প্রতিটি মানবসত্তা পুরো অস্তিত্ব দিয়ে তাদের উপলব্ধির জায়গাটিকে প্রশস্ত ও ক্রমাগত সম্প্রসারণের যথেষ্ট অবকাশ থেকে যায়। আজকে গোটা পৃথিবীজুড়ে যে অন্যায়, অনাচার, অত্যাচারের মাধ্যমে মানবতার ভিত্তিমূলে কুঠারাঘাত করা হচ্ছে, তার কি কোনোই প্রতিকার হবে না! দুর্বলের ওপর সবলের আঘাত আর মানবতাবিধ্বংসী কার্যকলাপের মধ্য দিয়ে আমরা কি 'আশরাফুল মাখলুকাত'-এর মর্যাদা ও অবস্থানকে অক্ষুণ্ণ রাখতে পেরেছি? মহান আল্লাহ কি বলে দেননি- মানুষ হিসেবে প্রকৃত দায়িত্ব পালনে ব্যর্থতার পরিচয় দিলে তার পরিণামে তাকে নামিয়ে দিই নিচ থেকে অনেক নিচে। বিশ্বব্যাপী পরিচালিত মানুষ নামের অমানুষদের জঘন্য ও অমানবিক কার্যকলাপের দরুনই মহান আল্লাহ এই মানব সমাজের ওপরে মহাবিপর্যয়ের গজব অবতীর্ণ করেন; যুগে যুগে বারংবার একই ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি ঘটেছে। আমাদের আজকের পরিণতি অনেকটা তাই, পুরো পৃথিবী করোনা নামক অদৃশ্য এই শত্রুর আক্রমণে দিশেহারা; স্বজনের বুকভাঙ্গা আর্তনাদ আর প্রতি মুহূর্তে মানুষের মৃত্যুর ফলে মানব-লাশের সারি দীর্ঘ থেকে দীর্ঘতর হচ্ছে। আমাদেরও কোরআনে বর্ণিত পূর্ববর্তী যুগের অবাধ্য ও নাফরমানদের ভাগ্যবরণ করতে হচ্ছে। আধুনিক বিশ্বের যাবতীয় আবিস্কার, আয়োজন, উদ্ভাবন আর প্রায়োগিক দক্ষতার কোনো কিছুই কাজে আসছে না; পৃথিবীর সব প্রচেষ্টার আন্তরিক প্রয়োগের পরও আজ আকাশপানে মহান স্রষ্টার কুদরতের দিকেই আত্মসমর্পণ করতে হচ্ছে। মহাশক্তিধর প্রভুর সাহায্য ব্যতিরেকে আসলে এই মহামারি পৃথিবী থেকে বিদায় নেবে না- এটি বুঝতে আর কারও বাকি নেই। বিজ্ঞান আর প্রযুক্তির উৎকর্ষের এই যুগে সমরাস্ত্রের বিপুল তাণ্ডবে দাম্ভিক রাষ্ট্রগুলোও আজ তাদের অসহায়ত্ব প্রকাশ করছে; সবাই আজ বিশ্ব-প্রভুর রহমতের মুখাপেক্ষী হয়ে প্রতীক্ষার প্রহর গুনছে।
ফিলিস্তিন, সিরিয়াসহ বিভিন্ন জনপদে মজলুম মুসলমানদের বুকফাটা আর্তনাদে আকাশ-বাতাস ভারি হয়ে ওঠে, অবুঝ নিপীড়িত শিশু নির্যাতনের ভয়াবহতা সইতে না পেরে নির্মম মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ে; আর সেই শিশুদেরই কেউ কেউ যখন বলে যায়, 'আমি আমার আল্লাহকে সব বলে দেব' তখনও মুসলিম শাসকরা হেরেমের ভোগ-বিলাসেই নিজেদের মত্ত রাখেন। করোনাকালের এ মহাবিপর্যয়ে আমাদের এ দুর্ভাগ্যজনক ভাবনাগুলো অমূলক নয়। এমতাবস্থায় পৃথিবীর মহান স্রষ্টা তার মহানুভবতার স্বর্গীয় দ্বার উন্মোচন করে আমাদের বারবার ডাকছেন- 'তুবু ইলাল্লাহে তাওবাতান্নাসুহা' অর্থাৎ তোমরা ফিরে আসো অনুতাপ-অনুশোচনা সহকারে, একনিষ্ঠচিত্তে তওবা করো। আর মহামারির এই মহাদুর্যোগেও তোমাদের পরম রবের অনুগ্রহের ব্যাপারে আশান্বিত থাকো। 'লা তাকনাতু র্মিরাহমাতিল্লাহ' অর্থাৎ কখনোই আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ হবে না। করোনার অবসান ঘটাতে গোটা পৃথিবীর তাবত আয়োজনই যখন ব্যর্থতায় পর্যবসিত, আমরা তখন মহান আল্লাহর রহমতের প্রত্যাশায় তারই নিকট মস্তকাবনত হই; তারই প্রদর্শিত পথে আত্মোৎসর্গ করি। এতেই হয়তো বিপর্যস্ত বিশ্বমানবের ওপর খোদায়ী রহমতের ফল্কগ্দুধারা প্রবহমান থাকবে।
লেখক ও গবেষক; অধ্যাপক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
